আব্দুস সাত্তার কচি, জীবনের ৬টি দশক পার করেছেন ক্রিকেটের সাথে। শুরুতে ছিলেন খেলোয়াড়। এরপরে পালাক্রমে কোচ কিংবা পরামর্শকের ভূমিকায় ছিলেন খুলনাসহ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। পরিচিতি পেয়েছেন কচি ওস্তাদ নামে। সর্বশেষ খুলনা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ১৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে।
অবশেষে জীবন সায়াহ্নে এসে ক্রিকেট থেকে নিলেন ছুটি। ৭৭ বছর বয়সী ক্রিকেট পাগল এই মানুষটা গত বছর জানুয়ারি মাসে অবসরে গিয়েছেন। এক বছরেরও বেশী সময় মাঠের ক্রিকেট থেকে সরাসরি দূরে তিনি। ক্রিকেটকে ভালোবাসার পর থেকে এতটা সময় এই খেলা থেকে দূরে থাকতে হয়নি তাকে। এখনও ক্রিকেটকে ভালোবাসেন প্রচন্ডভাবে। তাইতো মাঠের ক্রিকেটের কোনো অংশে অবদান রাখতে না পারলেও টেলিভিশনে পুরোনো খেলা দেখেই কাটান সময়। খবর রাখার চেষ্টা করেন বাংলাদেশ দলেরও।
এদিকে ঘরে থেকেও ভুলেন না নিজের প্রিয় শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম। বিভিন্ন জনের মাধ্যমে খোঁজ রাখেন স্টেডিয়ামটির। নিজ হাতে তিলে তিলে গড়া খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের বেহাল দশা নিয়ে দুঃখ আছে তাঁর।
সাধারণ মাঠ থেকে যে মাঠকে তিনিই দিনে দিনে টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদায় আনতে ভূমিকা রেখেছেন সেই স্টেডিয়ামকে দেখতে চান আবারও গর্বিত চেহারায়। ক্রিকেটাঙ্গনের পরিচিত মুখ আব্দুস সাত্তার কচি মুখোমুখি হয়েছিলেন। নানা আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ক্রিকেট নিয়ে তার ভাবনার কথা, আবু নাসের স্টেডিয়াম তৈরির ইতিহাস, দীর্ঘ ৬০ বছরের ক্রিকেট থেকে তার পাওয়া না পাওয়ার কথা। পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো তারই চৌম্বক অংশ..
প্রতিবেদক: করোনার এই সময়ে চারদিকে গুমোট মেরে আছে। বয়স্কদের নিয়ে আছে ঝুঁকি। এমন অবস্থায় আপনি শারীরিকভাবে কেমন আছেন ? অবসর জীবন কেমন কাটছে?
আব্দুস সাত্তার কচি : ভালো আছি আলহামদুল্লিাহ। করোনায় দেশ লকডাউন হওয়ার কিছুদিন আগে ওমরাহ করে এসেছি। এখন পরিবারের সাথেই সময় কাটছে। স্ত্রীকে রান্নার কাজে সহায়তা করি। ভালোই আছি।
প্রতিবেদক: ক্রিকেটে আপনার প্রেমের শুরুতে তো খেলাটিতে ক্যারিয়ার গড়ে শুরু করেছেন। আপনার সেই ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে যদি কিছু বলেন।

আব্দুস সাত্তার কচি : আমি ১৪ বছর বয়স থেকে খুলনায় ক্রিকেট লিগ খেলি। ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় লিগ থেকেই খুলনা বিভাগীয় ক্রিকেট দলে খেলেছি। শুরু থেকেই আমি ছিলাম পেস বোলার। টানা ১২ বছর খুলনা জেলা দলের খেলোয়াড় ছিলাম। ঢাকায় প্রথম বিভাগ ক্রিকেটেও খেলেছি নিয়মিত।
প্রতিবেদক : কোনো স্মরণীয় স্মৃতি?

আব্দুস সাত্তার কচি : ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সফরে আসে এমসিসি দল। ওই সময়ে যশোরে বাংলাদেশ দক্ষিণাঞ্চল দলের সাথে একটি তিনদিনের ম্যাচ খেলে তারা। ওই ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়েছিলাম আমি।

প্রতিবেদক : খেলোয়াড় থেকে কোচিংয়ে আসলেন কী করে ?
আব্দুস সাত্তার কচি : যখন থেকে আমি ক্রিকেট খেলি, তখন থেকেই কিন্তু আমি ক্রিকেট শিখাতাম। খুলনাতে আমিই প্রথম ক্রিকেট একাডেমি চালু করি। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে ওই সময়ের এই উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম ভারতের পাতিয়ালা থেকে ক্রিকেট কোচিংয়ের উপর ইন্দিরা গান্ধী স্কলারশীপ নিয়েছিলাম। দেশেও লেভেল ওয়ান কমপ্লিট করি। জাতীয় ক্রিকেট লিগে ২০০০-২০০১ মৌসুম থেকে টানা তিন বছর খুলনা বিভাগীয় দলের কোচ ছিলাম।
প্রতিবেদক: কোচ হিসেবে সফলতা বলতে কী কী অর্জনের কথা মনে পড়ে?
আব্দুস সাত্তার কচি : ২০০৩ সালে আমার হাত ধরেই প্রথমবারের মতো জাতীয় লিগের লংগার ভার্সনে শিরোপা ঘরে তোলে খুলনা। একই বছর জাতীয় লিগের ওয়ানডে ফরমেটেও রানার্স আপ হয়েছিলো খুলনা। এর আগে ১৯৯৭ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত জাতীয় যুব ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয় খুলনা। ওই দলটিরও কোচ ছিলাম আমি। তবে আমার নিজের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে হয় সেরা সব ক্রিকেটার আমার হাত ধরে উঠে আসাকে। বিভিন্ন টুর্নামেন্ট থেকে আমার হাত দিয়ে উঠে এসেছে শেখ সালাহ উদ্দিন, মানজারুল ইসলাম রানা ও সেলিমের (সাবেক উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান) মতো ক্রিকেটাররা।
প্রতিবেদক : এরপরেই তো শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের দায়িত্ব পেলেন? এই মাঠটি শুরুতে কেমন ছিল? কিভাবে এই মাঠের সংস্কার কাজের শুরু হলো ?
আব্দুস সাত্তার কচি : তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আলী আসগর লবী একদিন আমাকে ডেকে বলেছিলেন, আপনাকে এখন থেকে আর কোচিং করাতে হবে না। আপনি বরং খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের দায়িত্ব নেন। এরপরই আমি স্টেডিয়ামটির ভেন্যু ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেই।
আমি দায়িত্বে আসার পরপরই অল্প দিনের মধ্যে মাঠ ও প্যাভিলিয়ন যতটুকু সম্ভব সংস্কার করে ২০০৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত করলাম। বাংলাদেশ দলের ভেন্যু খুলনাতে না হলেও এখানে শুরু থেকে প্রতিটি ম্যাচেই পুরো গ্যালারি পরিপূর্ণ থাকতো। এরপর ২০০৬ সালে স্টেডিয়ামটি ওয়ানডে ম্যাচের জন্য স্বীকৃতি পায়। ওই বছর মার্চে কেনিয়ার সাথে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। একই বছর নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের সাথে এই মাঠে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। যে ম্যাচটি বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচও ছিল। তবে এসব অর্জন মোটেও সহজ ছিলো না। প্রতিটি স্বীকৃতির আগে আইসিসির প্রতিনিধি দল মাঠ পরিদর্শনে এসেছিলো। স্টেডিয়াম, মাঠ, গ্যালারি, প্যাভিলিয়ন সবখানেই তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হয়েছে।
প্রতিবেদক: টেস্ট ভেন্যু হিসেবে তো অনেক পরে স্বীকৃতি পায় মাঠটি। এখানে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্ট ম্যাচের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে?

আব্দুস সাত্তার কচি : টেস্ট ভেন্যু স্বীকৃতির জন্য অনেক বেশী কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাদের। যদিও ২০১০ সালে বিশ্বকাপের বিকল্প ভেন্যু হিসেবে ব্যাপক সংস্কার হয় স্টেডিয়ামের। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে এই ভেন্যুটি টেস্ট ভেন্যুর স্বীকৃতি পায়। আমি কখনো কল্পনাও করিনি আমার এই মাঠে একদিন টেস্ট ম্যাচ হবে। ওইদিন বোধহয় আমি পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ ছিলাম। তবে স্টেডিয়ামটি কখনও ম্যাচ আয়োজনে ধারাবিহকতা ধরে রাখতে পারেনি। খেলা শুরুর পর থেকে এক বছর বা দুই বছর কোন আন্তর্জাতিক সূচি থাকে তো পরের চার বছর কোন কারনে আর কিছু থাকে না। এখনও তো আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই অনেক দিন হতে চললো।

প্রতিবেদক: নিজের হাতে গড়া এই স্টেডিয়ামের এখন যে অবস্থা, তাতে তো বড় সংস্কারের আগে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হওয়ার সুযোগ নেই..
আব্দুস সাত্তার কচি : এটাই আমার সব থেকে বড় আক্ষেপ। একটি টেস্ট ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামটি যেভাবে সাজানো ছিলো, নিজের অবসরের আগে স্টেডিয়ামকে সেভাবে সাজানো দেখে যেতে পারলে হয়তো দু:খটা থাকতো না। ২০১৬ সালে এপ্রিল মাসের এক ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় স্টেডিয়ামটি। আমি অবসরে যাওয়ার আগে অন্তত ১৭টি চিঠি দিয়েছি বিসিবি ও এনএসসিতে। কিন্তু কাঙ্খিত সংস্কার হলো না। তবে আমি অবশ্যই স্টেডিয়ামকে পুনরায় টেস্ট ম্যাচের উপযুক্ত দেখতে চাই যত দ্রুত সম্ভব। সম্ভব হলে মাঠে বসে, না হলে টিভিতে হলেও আমি আবু নাসের স্টেডিয়ামে আবারও টেস্ট ম্যাচ দেখতে চাই।
প্রতিবেদক: অবসরের পর আবু নাসের স্টেডিয়ামে কি যাওয়া হয়? বা খোঁজ খবর রাখেন ?
আব্দুস সাত্তার কচি : খোঁজ তো অবশ্যই রাখি। এখন যারা সেখানে কাজ করছে তারা সবাই আমার স্নেহধন্য। সবাই খুবই আন্তরিক, হয়তো তাদের মাধ্যমেই মাঠ ও স্টেডিয়াম আবার নিজের পুরোনো চেহারা ফিরে পাবে। তবে স্টেডিয়ামে যাওয়া হয় না এখন আর। সবাই আমাকে হয়তো ভালোবাসে না। এজন্যই যেতে চাই না স্টেডিয়ামে।

প্রতিবেদক: করোনা পরবর্তী সময়ে ক্রিকেটারদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে ?
আব্দুস সাত্তার কচি : কেউ সাঁতার একবার শিখে ফেললে, কিংবা সাইকেল চানালো শিখলে কিন্তু ১০ বছরেও ভুলে যায় না। তেমনি ক্রিকেটাররা তাদের স্কিল বা ব্যাটিং-বোলিং কৌশল বা সামর্থ্য কিন্তু হারিয়ে ফেলবে না। হ্যাঁ, ক্রিকেটে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ফিটনেস। এই সময়টাতে যদি তারা ফিটনেস ধরে রাখতে পারে তাহলে রিকভার করা খুব একটা কস্ট হবে না।