দেশ বিভাগ নিয়ে আমার আগে থেকে আগ্রহ ছিল। এটা কে আগ্রহ না বলে আফসোস বললে যথার্থ হয়৷ এই লকডাউনে সূযোগও চলে আসে। পড়ে যা বুঝলাম তা সহজ ভাষা লিখার চেষ্টা করেছি

শত শত বছর ধরে বিশাল ভারতবর্ষে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কোটি কোটি লোক বাস করে আসছে। একসাথে থাকার কারণে সংস্কৃতির আদান প্রদান ঘটেছে। কখনও মুসলিম, হিন্দু অথবা বৌদ্ধ দ্বারা শাসিত হয়েছে এই ভারতবর্ষ । কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্রিটিশ পূর্ব এরকম চোখে পড়েনি কখনো । প্রায় ৬০০/৭০০ বছর মুসলিমরা ভারতবর্ষ শাসন করেছিল, এসময় অধিকাংশ যুদ্ধই হয়েছে মুসলমান মুসলিমানের সাথে। আবার অনেক যুদ্ধে উভয়পক্ষে হিন্দু মুসলিম ছিল। অনেক শক্তিশালী মুসলিম শাসকদের সেনাপতি ছিল হিন্দু। এ থেকে বোঝা যায় ভারতবর্ষে আগে সাম্প্রদায়িকতা চর্চা হত না। কি এমন ঘটেছিল যে ভারত বিভাগ হয়েছিল। যা শুধু একটি দেশের বিভাগ না ঐক্যের বিভাগ হয়েছিল, শক্তির বিভাগ হয়েছিল।

১৮৫৭ সালে ভারত উপমহাদেশে সিপাহি বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশদের ভিত্তি নড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে হিন্দু মুসলিম সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নেমেছিল। তাই বিচক্ষণ ব্রিটিশরা বুঝতে পারে হিন্দু মুসলিম এক থাকলে তারা উপমহাদেশে বেশিদিন শাসন করতে পারবে না। রয়েল কমিশনের সামনে লর্ড এলফেনষ্টোন বলেছিলেন যে “হিন্দু – মুসলিম মিলিত সৈন্য বাহিনীর জন্য সিপাহিদের বিদ্রোহ করা সহজ হয়েছিল”। তাই তারা স্থির করল এদেশে যেহেতু তারা শাসন করবে, শোষণ করবে, বাণিজ্যও করবে, তা দীর্ঘস্থায়ী করা প্রয়োজন। তখন তারা বিভিন্ন কুপ্রচরণার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার বিষ নিষ্ঠার সাথে ছিটিয়ে দিতে থাকে। এবং ব্রিটিশদের রোপণ করা বিষ বৃক্ষের ফল ভারতবর্ষের লোকজন এখনও যে ভোগ করছে তা আজকাল খবরের কাগজে চোখ রাখলেই বুঝা যায়।

যেহেতু ইংরেজরা ক্ষমতা নেওয়ার সময় মুসলিমদের থেকে দখল করেছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ইংরেজরা প্রথমে মুসলিমদের অবিশ্বাস করতে থাকে,দূরে সরিয়ে রাখে। রাগে ক্ষোভে মুসলিমরাও ইংরেজদের পরিহার করে,ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা সব কিছু বর্জন করে পিছিয়ে পড়ে। হিন্দুদের জন্য তখন ইংরেজ শাসন হল অনেকটা প্রভু পরিবর্তনের মত। আগে মুসলিমরা তাদের শাসক ছিল, এখন ইংরেজরা। তাই ইংরেজ শাসন তারা স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে শিক্ষা দীক্ষায়, বাণিজ্য, চাকুরীর সব কিছুতেই দ্রুত উন্নতি লাভ করতে থাকে। সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রেও হিন্দুরা এগিয়ে যায়। মুসলমানদের পশ্চাৎমুখিতা ও গোঁড়ামি তাদের পিছিয়ে পড়ার কারণ।

১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হয়। যদিও প্রতিষ্ঠার সময় কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের সহযোগিতা করা কিন্তু সময় গড়াতেই এটিই ভারতবর্ষের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। দাবী আদায়ের জন্য তারা অহিংসর পাশাপাশি অনেক সময় সশস্ত্র রুপ নেয় কংগ্রেস। কংগ্রেস ছিল অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন। ভারতবাসীরা যতই কংগ্রেসের নেতৃত্বে আন্দোলন করতে থাকে ইংরেজরা ততই মুসলমানদের উপর ঝুঁকে পড়ে। বিভাজন পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে সচেষ্ঠ হয় এবং তারা মুসলিম লীগকে কাজে লাগায়।

১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়। ১৯০৯ সালে মুসলিম লীগের দাবীতে ভারতে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধদের জন্য আলাদা আলাদা নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। এমনকি ১৯৩২ সালে হিন্দুদের নিম্নবর্ণ ও উচ্চবর্ণের আলাদা নির্বাচনের চেষ্টা করেন কিন্তু মহাত্মা গান্ধী তা হতে দেয়নি। এখানে মজার বিষয় হচ্ছে মুসলিম লীগের কোন নেতা কিংবা উপনেতা ব্রিটিশ আমলে এক ঘন্টার জন্যও কারাগারে যায়নি, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কখনও কোন আন্দোলন করেননি। এমনকি ১৯০৯ থেকে ১৯৪৬ নির্বাচন পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচন ব্যবস্থা চালু থাকা সত্বেও একটা নির্বাচনেও জিতে নি। এজন্যই মুসলিম লীগের নেতা ও পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন – তিনি পাকিস্তান অর্জন করেছন কেবল তার সেক্রেটারি ও টাইপরাইটারের সাহায্যে।

জিন্নাহকে পাকিস্তানের জনক বলা হয়। জিন্নাহ একই সাথে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাথে জড়িত ছিলেন কিন্তু ক্রমেই তিনি মুসলিম লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। কারণ বিচক্ষণ জিন্নাহ বুঝতে পেরেছিলেন কংগ্রেসে থাকলে তার নেতা হওয়ার সম্ভাবনা কম কারণ কংগ্রেসে গান্ধী, নেহেরু, সর্দার প্যাটেল, মাওলানা আজাদ এর মত ঝানু রাজনীতিবিদরা কংগ্রেসে ছিল। কিন্তু তার নেতা হওয়া চায়। আবার গান্ধী, নেহেরুর সাথে তার মতেরও অমিল ছিল।

জিন্নাহ বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক সাপ নেউলের মত করে দিয়েছিল। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে জিন্নাহ শুধু পারিবারিক ভাবেই মুসলমান ছিল। তিনি শুক্রবার ছাড়া কোনদিন মসজিদ যেত না, শুকরের মাংস খেত। এমনকি তিনি ৪০ বছর বয়সে তার এক অমুসলিম বন্ধুর ১৫/১৬ বছরের মেয়েকে বিয়ে করেন।

জিন্নাহ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনো জেলে যায় নি, এমনও তা ১ ঘন্টার জন্য না। কারণ তিনি তো ব্রিটিদের বিরুদ্ধে তিনি কখনও টু শব্দ করেননি। এমনকি তিনি গান্ধীর “ভারত ছাড়” আন্দোলনের তীব্র নিন্দা করেছিলেন এবং বলেছিলেন এটা হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পায়তারা মাত্র । এজন্য তার পিঠে কোনদিন লাঠি পড়েনি, দাবী আদায়ে করতে হয়নি অনশন, দিতে হয়নি মিছিলে নেতৃত্ব। অথচ পৃথিবীর মহৎ নেতারা শোষণের বিরুদ্ধে ছিল সোচ্চার, আপসহীন। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা ৩০ বছরের অধিক সময় কারাগারে ছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৪ বছরের অধিক সময় জেলে ছিলেন, জওহরলাল নেহেরু ব্রিটিশ জেলে ছিলেন ৯ বছর, গান্ধীজিও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ করেন, ভগং সিং কে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, কত জনকে আন্দামানে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল, সর্দার প্যাটেলকে স্বাধীনতা আনদোলনের সময় পুলিশ এমন আঘাত করেছিল যে তিনি কখনো আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন নি। কিন্তু জিন্নাহ কেবল সাম্প্রদায়িক বক্তৃতা, বিবৃতি, সভা, জনসভা করে পাকিস্তান দাবী করেছিলেন এবং তা আদায়ও করেছিলেন। চতুর জিন্নাহ বুঝতে পেরেছিলেন কংগ্রেসের আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশরা একসময় ভারত ছাড়বে তাই তিনি ইংরেজদের বিরোধিতা বদলে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়ে ইংরেজদের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছিলেন এবং বাচ্চাদের মত একের পর এক দাবী করেই গেছেন এবং তার শেষ দাবী পাকিস্তান।

১৯৩৭ সালে নির্বাচনে জিন্নাহ মরিয়া হয়ে নির্বাচনী প্রচরণায় লিপ্ত হয় এবং উসকানি মূলক উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেন। কিন্তু মুসলিম লীগ নির্বাচনে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়। এসময় মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা খালেকুজ্জামান বলেছিল – “মুসলিম লীগ মুসলমানদের সংগঠন কিন্তু মুসলমানদের সমর্থন ছাড়া”। মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনেও মুসলিম লীগ জিততে পারেনি অথচ এই মুসলিম লীগই ১০ বছর পর পাকিস্তান কায়েম করে নেয়৷ সুতরাং পাকিস্তান সৃষ্টিতে ব্রিটিশদের ভূমিকাও যে অনস্বীকার্য তা বুঝতে বাকী থাকে না।

চলবে……
Shahinul Islam Polash
Department of Fisheries,
University of Dhaka

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here