ফেমিনিজম বা নারীবাদ শব্দটার সাথে আামাদের সবারি কম বেশি পরিচয় আছে।কারো খুব প্রিয় শব্দ, কারো বা শুনতেই নাক কুচকে যায়।তর্ক বিতর্কের শেষ নেই। তবে আমরা কয়জন জানি ফেমিনিজম আসলে কি বলে?

ফেমিনিজম বা নারীবাদ বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভূত একটি দর্শন যা সভ্যতায় মানুষ হিসেবে পুরুষের তুলনায় নারীর সমতা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।প্রতিটি পদক্ষেপ যা নারীর জন্য কাজ করে,নারীর উন্নয়নে কাজ করে।

স্বাধীনতা মানে কি?

একটা ছেলে যদি সিগারেট খেতে পারে একটা মেয়ে কেনো না?

অবশ্যই এমন না।সিগারেট সে ছেলেই খাক বা মেয়ে, ক্ষতি ২জনেরই।যার ইচ্ছে সে নিজের ক্ষতি করুক এ দায় নারীবাদের না।তবে সারাদিন পর কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরেও যদি রান্নাটা,গৃহস্থালি কাজগুলো একা মহিলাকেই সামলাতে হয় তবে তা অবিচার, অসামঞ্জস্যতা।

নারীবাদ উগ্রতা শেখায় না বরং এই অসামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধে নারীকে অাওয়াজ তুলতে শেখায়।কিন্তু অামরা ফেমিনিস্টরা ভালা না টাইপ একটা কনক্লুশন এ আটকে আছি।

একবার পেছনে ফিরে দেখা যাক।উপমহাদেশে নারীদের ছিল করুণ দশা। নারী মানে ছিল ভোগ্য পণ্য। পুতুল খেলার বয়সে বিয়ে মানে কি বোঝার আগেই কোনে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে পড়ত তার স্বামী। বয়সের বিস্তর ব্যবধানের ফলাফল ছিল হয় ওই অল্প বয়সে সতি হও নাহয় সারাজীবনের জন্য জীবনের সব রং বিসর্জন দিয়ে মরার জন্য বেঁচে থাকা। না ছিল জোর গলায় কথা বলার অধিকার। পড়াশোনা তো অনেক পরের ব্যাপার।

সেই সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন, নারী শিক্ষার প্রচলন এগুলো কি সহজ ছিলো? সেই সমাজেরই কিছু বিবেকবান মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম এ প্রতিষ্ঠিত হয় নারীর অধিকার। বলা যায় মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার। এগুলোর মাধ্যমে নারীর যে অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা সমাজের ওপর কি প্রভাব রেখেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য এখানে প্রতিফলিত হয়েছে সত্যিকার নারীবাদ। তখনকার সমাজের ওই খুব স্বাভাবিক অবস্থাও এখন অনেক বেশি অস্বাভাবিক। আজও আমরা রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর,বেগম রোকেয়া কে শ্রদ্ধা ভরে স্বরণ করি সামাজিক উন্নয়নের পথিকৃৎ হিসাবে।অথচ বর্তমান সমাজে নারী উন্নয়নে কাজ করা, গরীব নারীদের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করা,নারী নির্যাতন থামানো,বল্যবিবাহ রোধ,নরী পুরুষের সমান অধিকার,পিরিয়ড বিষয়ক ট্যাবু ভাঙা,চলাফেরার স্বাধীনতা এগুলো নিয়ে কথা বলা নাজায়েজ হয়ে গেছে।

অনেকের ধারণা ফেমিনিস্ট কেবল মেয়েরাই হয় এবং তারা সমগ্র পুরুষজাতিকে দেখতে পারে না।তারা পোলার আইসক্রিম আছে, মাইয়ার আইসক্রিম নাই কেন এমন সব বিষয়ে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে লেগে যায়। হয়ত কিছু উগ্র নারীবাদীরাই দায়ী এমন অবস্থা সৃষ্টির জন্য। কিন্তু কোনো আদর্শ সম্পূর্ণ না বুঝে বিরূপ ধারণা করাও ব্যতিক্রম না।

আবার, পুরুষ মাত্রই কি এন্টি-ফেমিনিস্ট?

নারীরা কি এন্টি-ফেমিনিস্ট হয় না?

সমস্যা তখন হয় যখন আমরা ভারসাম্য বজায় রাখি না।

অনেক স্বামী আছে যারা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই স্ত্রী এর মতামত মূল্যায়ণ করেন,অনেক ছেলেই আছে যারা নারীকে কেবল নারী না মানুষ হিসেবে মূল্যায়ণ করে ও প্রাপ্য সম্মান দেয়।

আবার অনেক মা খাবারের বড় ভাগ ছেলেকে দিয়ে মেয়েটাকে কম খওয়াটাই নিয়ম এমনটা শেখায়। অনেক মেয়েই আছে যারা একটা রেপ কেসে মেয়েটারই দোষ খুজতে নেমে যায়।পোশাক ঠিক ছিল? একা কেন বের হলো? ও, ছেলে বন্ধু আছে টাইপ প্রশ্ন তোলে যেখানে এগুলো ঠিক থাকায় কেবল নিরাপত্তা না।সব ঠিক থাকলেও অন্যায়টা যে তার মত যে কোনো মেয়ের সাথেই হতে পারে তা ভুলে যায়।

অসলে নারীবাদ নারী আর পুরুষের ভেদাভেদ তৈরি করার জন্য না।বরং সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এই সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সমান অধিকার শেষ কথা না। বরং প্রয়োজন সাম্যতা যা একসময় সমতা প্রতিষ্ঠা করবে।সাম্যতা মানে অধিকার সমান সমান ভাগ করা না বরং যে যেখানে পিছিয়ে আছে সেখানে তাকে এমন সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া যেন সেও বাকিদের সাথে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারে।

তুমি ছেলে তুমি কাদতে পারবা না, তোমার অবেগ, অনুভূতি, কষ্ট দেখতে পারবা না, অসহ্য হওয়ায় নারী নির্যাতনে রূপ নিলেও দোষ নাই,সরকারী চাকরি না পেলে কোনো বাবা তোমাকে মেয়ে দিবে না,পরিবারের ঘানি একা তোমাকেই টানতে হবে। এগুলোই আমাদের এই আধুনিক সমাজের স্বাভাবিকতা। অথচ তা কতজনের জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে আমরা জানতেও চাই না। বুঝতেই চাই না এটাও অসামঞ্জস্যতা।

অসম্পূর্ণতা কেবল নারীর একার না। আমরা নারী-পুরুষ আলাদা ভাবে উভয়ই অসম্পূর্ণ। একসাথে আমাদের সম্পূর্ণতা।কিন্তু এক পক্ষকে জোর করে দিনের পর দবিয়ে রাখাই তো সমাধান না।এক পায়ে বেড়ি পড়ে ব্যক্তি যেমন খুব বেশি পথ অতিক্রম করতে পারবে না, সমাজের এক অংশ কে দাবিয়ে রেখেও খুব বেশি পথ অতিক্রম করা সম্ভব না।এই অংশকে মুল স্রোতে এনে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নারীবাদের।

সর্বোপরি এতো আধুনিক হওয়ার পরেও নারী মুক্তি,নারী স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে মনে হয় না।ধর্ষণ, হয়রানি, বাল্যবিবাহগুলো আজও দেখিয়ে দেয় লক্ষ বহুদূর। এই জ্ঞান বিজ্ঞান এর যুগে নারী নিপিড়ন হয়ে পড়েছে আগের থেকে অনেক বেশি সহজ।অথচ ২-১ টা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ভর দিয়ে সমাজ ইতোমধ্যে নারীবাদকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

নিধি শেখ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here