১৯৩৯ সালে ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরু হয়। ইংল্যান্ড, ব্রিটিশ সরকার এবং ভারত সরকারের পক্ষে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এতে কংগ্রেস নেতা কর্মীরা খুবই ক্ষুব্ধ হন কারণ কংগ্রেসের সহিত আলোচনা না করেই যুদ্ধে ভারতকে ঢুকিয়ে দিয়েছ। ফলস্বরূপ ১৯৩৯ সালের নভেম্বরের ২২ তারিখে কংগ্রেসের মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। আর এই সুযোগে জিন্নাহ প্রচার করেন হিন্দুদের শাসন, শোষণ, অত্যাচার থেকে মুসলমানরা বেঁচে গেল। জিন্নাহ ২২ নভেম্বরকে মুক্তি দিবস বলে ঘোষণা করেন। ব্রিটিশ -জিন্নাহ মিলিত হয়ে কংগ্রেসের আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করতে থাকে। ফলে জিন্নাহর ভারতীয় রাজনীতিতে উত্থান দ্রুত হতে থাকে।
১৯৪০ সালের ২২ ও ২৩ মার্চ পাকিস্তানের লাহোরে মুসলিম লীগের বিরাট সম্মেলন হয় এবং এখানে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের পক্ষে মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবী করেন। এর পেছনে কংগ্রেস নেতাকর্মীদের কিছু অদূরদর্শীতা আছে। ১৯৩৭ এর নির্বাচনে হক সাহেবের দল ছিল কৃষক প্রজা পার্টি। বাংলায় যা বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করে। এঅবস্থায় মুসলিম লীগ – কংগ্রেস উভয়েই প্রজা পার্টির সাথে কোয়ালিশন করতে চেয়েছিল। হক সাহেব কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন করতে সম্মত হয় কিন্তু সামান্য মতবিরোধের জন্য সেটা আর হয়ে ওঠে নি, যা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কংগ্রেসের এই অদূরদর্শীতার জন্যও হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক আরো খারাপ হয়েছে, হক সাহেবকে জোর করে মুসলিম লীগের সহিত কোয়ালিশন করা লেগেছে। কৃষক প্রজা পার্টি কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন করলে হয়ত ভারতে ইতিহাস অন্য ভাবে লিখা হত এমনকি বাংলার কৃষক প্রজারা কংগ্রেসের প্রতি আস্থাশীল থাকতেন, মুসলিমলীগ মুখী হতেন না।
কংগ্রেসের কিছু ভুল সিদ্ধান্তও মুসলিম লীগকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধাচারণ করতে সাহায্য করেছিল। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের নেতা খালেকুজ্জামান উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে চেয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস এমন কিছু শর্ত দিয়েছিল যা মুসলিম লীগের জন্য অপমানজনক। তাই কোয়ালিশন করা সম্ভব হয় নি। অবশ্য তখন কংগ্রেসের প্রাদেশিক পরিষদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল। কংগ্রেস জিতেছিল ১৩৪ টি আসন আর লীগ ২৭ টি।
আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কংগ্রেস ইংরজদের সহযোগিতা না করে তখন “ভারত ছাড়” আন্দোলন শুরু করে। তখন ভারতবর্ষের বক্ষ্রপ্রদেশ (বর্তমান মায়ানমার) জাপানীরা দখল করে আগাতে থাকে। এতে করে ইংরেজরা কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ হয় এবং মুসলিম লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। ব্রিটিশরা ভাবে জাপানি কর্তৃক ভারত আক্রমণ কংগ্রেসের একটা চাল। সে সময় কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতা করলে হয়ত ভারতে ইতিহাস অন্য ভাবে লিখা হত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৬ সালের দিকে যুক্তরাজ্যের সরকারি অর্থ ভান্ডার একদমই শেষ হয়ে গেছিল। আর সে সময় সদ্য নির্বাচিত ব্রিটিশ সরকার মনে করেন ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠা ভারতবর্ষের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনি এতে আন্তর্জাতিক কোন সহায়তা পাওয়াও দুস্কর হবে। তাই ১৯৪৭ সালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন অ্যাটলি ঘোষণা করেন ১৯৪৮ সালের সালের জুনে ভারত স্বাধীন করে দিবেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে নিযুক্ত ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে ব্রিটিশ বাহিনী অক্ষমতার কথা চিন্তা করে তা ৯ মাস আগেই স্বাধীন করে দেন। অক্ষমতার পেছনের কারণ হচ্ছে ব্রিটিশ শাসন কর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন অচিরেই ক্ষমতা হস্তান্তর হবে তাই তারা আর আগের মত দ্বায়িত্বতার সাথে কাজ করতেন না।

See the source image
১৯৪৬ সালে ২২ জুলাই বড়লাট ওয়াভেল নেহেরু ও জিন্নাহকে জানায় যে তিনি ১৪ জন সদস্য নিয়ে একটি অন্তবর্তী মন্ত্রীসভা গঠন করতে চায়। কংগ্রেস হতে ৬, মুসলিমলীগ হতে ৫, শিখ হতে ১ ও ২ জন অন্যান্য হবে। নেহেরু বড়লাটের কোন ভেটো থাকবে না শর্তে তা মেনে নেয়। কিন্তু জিন্নাহ দাবী করে কংগ্রেস – মুসলিম লীগ ৫ – ৫ হবে এবং দুই জন অন্যান্য, এমনকি কংগ্রেস কোন মুসলমান নেতার নাম দিতে পারবে না!!
নেহেরু সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন -” we are not bound by a single thing expect that we have decided to go into the constitutent assembly “.
জিন্নাহ নেহেরুর বক্ত্যবের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়, কেবিনেট মিশন নাকোচ করে দেয়। এমন কি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ( direct action) শুরু করেন।
১৯৩৭ সালে নির্বাচনের সময় হতে জিন্নাহ উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকেন। তার চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ ঘোষিত মুসলিম লীগের প্রতক্ষ সংগ্রাম (direct action)। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু আগে মুসলিম লীগের নেতারা বিশেষ করে জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান,নাজিমুদ্দিন উত্তেজনাকর ও প্ররোচনপূর্ণ বক্তব্য দিতে থাকেন। তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী প্রত্যক্ষ সংগ্রামকে সমর্থন করেন এবং সেই দিন ছুটি ঘোষনা করেন। সোহরাওয়ার্দী ও নাজিমউদ্দীন প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় যে তাদের সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নয়। নেতাদের এরকম উসকানিমূলক কথায় বোঝার আর বাকী থাকে না জিন্নাহর ” প্রত্যক্ষ সংগ্রাম “( Direct Action) আসলে কি। যার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয় এবং হাজার হাজর লোক নিহত হয়। দাঙ্গা চলে প্রায় ৪/৫ দিন। এসময় শুধুমাত্র কলকাতাতেই প্রায় ১৬ হাজার মানুষ মারা যায়, আহত লক্ষাধিক এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট ও নষ্ট হয়। লীগ বিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা সৈয়দ নওশাদের বাড়ী লুটপাট হয় এবং তার বাড়ীকে মুসলিম লীগের দপ্তর লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয় । কলকাতার দাঙ্গা সারাদেশে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ে৷ তবে সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায়। এখানে একতরফা ভাবে হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালায় যা ১৫ দিন স্থায়ী ছিল। এই কদিনে ব্যাপক হত্যা, লুন্ঠন, মন্ডির ধ্বংস, ধর্ষণ, হিন্দুকে জোর করে মুসলিম করা ইত্যাদি চলে। এসব থামাতেই মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে গেছিলেন। বাংলার এই দাঙ্গার জন্য মৌলানা আকরাম আলী খান সোহরাওয়ার্দীকে দোষারোপ করেন। এছাড়া সারা ভারতবর্ষে হাজার হাজার লোক মারা যায়। তখন দেশবাসীর মনে হয় দেশ ভাগ না করে উপায় নেয়। কিন্তু এটা যে বিচক্ষণ জিন্নাহর চাল তা বুঝা বাকী থাকে না। অথচ এই দাঙ্গা টা যদি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে হত তাহলে ভারতবর্ষে অনেক আগেই স্বাধীন হয়ে যেত।
কংগ্রেসের পক্ষে সর্বপ্রথম সর্দার প্যাটেল পাকিস্তান প্রস্তাব মেনে নেন, এমনকি ভারত বিভাগ দরকার এতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তিনি অনেকটা হতাশা,রাগ আর আত্মসম্মান রক্ষাতেই এই কাজ করেছিল। কারণ অন্তর্বতীকালীন সরকালের আমলে প্যাটেল সরাষ্ট্র দপ্তর নেওয়ার জন্য অর্থ দপ্তরটি মুসলিম লীগের প্রতি হাত ছাড়া করে দেন। ফলে প্যাটেলের যে কোন প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী লিয়াকত আলী ভেটো দিত। অর্থ দপ্তরটি ছেড়ে দেওয়ায় যে পরিণতি হয়েছিল তা দুঃখজনক। এবং তা হয়েছিল সর্দার প্যাটেলের গোঁড়ামির জন্যই। এর ফলে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ভারত বিভাগের একটা সুযোগ পেয়ে যান।
সারা ভারতবর্ষে যখন মারামারি হানাহানি তখন নেহেরু ঘোষণা দেন – “সন্তোষজনক মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব না হলে দেশ ভাগ করতে হবে”৷ অর্থাৎ নেহেরু জিন্নাহর দাবী মানতে বাধ্য হয়। অথচ নেহেরু ছিল দেশ ভাগের প্রবল বিরোধী। এব্যাপারে মওলানা আজাদ বলেছেন -” নেহেরু মানুষ হিসেবে নিজস্ব নীতির প্রতি আস্হাশীল হলেও মাঝে মাঝে প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে তাকে নমনীয় হতে দেখা যেত”।সুতরাং নেহেরু যে সর্দার প্যাটেল ও ভাইসরয়ের চাপে পড়ে এবং এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে লীগ সদস্যদের আচরণ দেখে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা বুঝতে বাকী থাকে না। এসময় মওলানা আজাদ নেহেরুকে বলেছিলেন ” আমরা যদি দেশ বিভাগ মেনে নিই, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবেন না “।

 

Shahinul Islam Polash

Department of Fisheries,

University of Dhaka

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here