বই পড়া ভালো অভ্যাস। প্রথম বাক্যের ঋণ স্বীকার না করলেও প্রমথ চৌধুরীর কথা অনেকের মনে পড়বে। বাক্যাংশকে বাক্য করায় তা মৌলিক হয়েছে এমন দাবিও যৌক্তিক নয়। চার্লস ল্যাম্বের একটি উদ্ধৃতি আমরা বিভিন্ন বইয়ে মুদ্রিত দেখি তাতে জানা যায় যে, যেই ব্যক্তি বই পড়তে ভালোবাসে তার শত্রু কম। কিন্তু বই যদি জ্ঞানালোকের উৎস হয় তাহলে তো বই পড়লে অজ্ঞতার অন্ধকারের অপনোদনে অনেক অরির(শত্রুর) দর্শনধন্য হওয়ার সুযোগ বাড়বে বই কমবে না! যদি বই পড়ে নতুন চিন্তা মগজে জাগে তাতে নতুন শত্রু খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ার কথা। তবে বই পড়লে অন্যের শত্রুতার হাত থেকে কি বাঁচা যাবে? তাই বা কীভাবে ধরে নিই। দেশ ও দশ কিংবা সভ্যতার শত্রু যারা তারা বই লেখেন প্রকাশ করেন এবং পড়ানোর ব্যবস্থাও‌ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব খলনায়কোচিত বা নেতিবাচক নাম আমরা চেষ্টা সত্ত্বেও ভুলতে পারি না তাদের অনেকে বই লিখেছেন বা প্রকাশ করেছেন, যদি তা নাও করে থাকেন বই পড়ার অভ্যেস তাদের ছিল। বই পড়া মানুষদের তালিকায় ঘৃণ্য মানুষদের আমরা খুব কম সংখ্যায় পাবো না! তাদের নামগুলো বিশেষত বাংলাদেশের বইপড়া নষ্টবুদ্ধিজীবীদের রেখে আপাতত হিটলার ও গোয়েবলস এর নাম মনে করি। আরেকটা নাম না নিলেই নয়, দীন ই ইলাহির উদ্যোক্তা বা তাত্ত্বিক নির্মাতা আবুল ফজল ও বাংলাদেশের জাতীয় বিবেক শিখার প্রাণপুরুষ আবুল ফজল । নাম একটাই নিয়েছি ব্যক্তি পেয়েছি দু’জন। এমন আরো উদাহরণ কম নয়। তবে প্রসঙ্গান্তরের আশঙ্কায় আর দীর্ঘায়িত না করাই উত্তম।
বই পড়া মানুষদের ভালো লাগে বলে মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করি আপনি কী পড়ছেন এখন। আমি অলস ওঅজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও আমি কী বই পড়ি তাও জানতে চান অনেকে। সে জিজ্ঞাসা আমি খুব পছন্দ করি। এতে বই পড়ার একটা প্রেরণা আসে অনেকের ভেতরে। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন এখন কী বই পড়বো? কোন বই পড়া উচিত। সম্ভবত প্রশ্নকর্তাদের অনেকেই নিজ দায়িত্বে ওষুধ পথ্য কিনে সেবন-গ্রহণ করেন। তখন পরামর্শ ফি এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শের তোয়াক্কা করেন না! কিন্তু বই পড়ার বেলায় এত পরামর্শ খোঁজেন কেন? ভাবখানা এমন পাঁচটা বইয়ের নাম দিলেই গ্রন্থবিক্রয়কেন্দ্র থেকে কিনে সকাল সন্ধ্যায় নিয়ম করে পাঠ করে জ্ঞান ও আনন্দে জীবনকে মধুর করে ফেলবেন। তা উনারা কি জানেন এদেশের অজপাড়াগাঁয়ের ঔষধের দোকানে ওষুধ যত সুলভ জেলা শহরের দোকানগুলোতেও সব ধরনের বই তত সুলভ নয়। বই বলতে ধর্মীয় কিছু বই, আর নোট-গাইড, কিছু নিতান্ত পাঠ্য(পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত বই) কিছু ডাইজেস্ট, টেস্ট পেপার, প্রশ্নব্যাঙ্ক, আর কিছু ভারতের বাংলা বইয়ের নকল আর বড়জোর দুএকটা বই লেখকদের নাম উল্লেখ করা বাহুল্য বোধ করি। তাহলে এমন পরামর্শ চান কেন? আর যদি কাকতালীয়ভাবে সেই বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায় তখন তো ঠিকই নাক উঁচিয়ে পিডিএফ আমি পড়ি না বলেন। প্রশ্নের কারণ কী হতে পারে? কৌশলে এটা বলা আপনার কাছে কিছু বই থাকলে দিন। পড়ি কিছুদিন। তা পান বটে। এদেশে বই পড়ার এই নিয়ম এর ওর কাছ থেকে নিয়ে বই পড়তে হয়। কিছু লোক নির্ধারিত দিনে শেষ না করে হলেও ফেরত দেন, আর তাদের কেউ কেউ সাথে যোগ করেন পড়াই হলো না, যেন বইটা দেয়াই দোষ ছিল, ঘ্রাণ শুকিয়ে অভুক্ত রেখে বইদাতাই অপরাধ করেছেন। অথচ বই নিলে এমন হয় হাতে একাধিক থাকায় একটা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়। সময় পার হয়ে যায়।
না, এক বই নিয়ে অনেকে পড়া খারাপ নয় মোটেও, তবে সমস্যা হলো বই ধারণাটা আমাদের সম্ভবত স্পষ্ট নয়! আবার বইকেনার অভ্যাসটাও সেভাবে তৈরি হলো না! বই পড়তে হয় নিজের মত করে নিজের রুচিতে। নিজের মত পোশাক যারা পরতে চান তারা নিজের গায়ের মাপেই পোশাক কেনার চেষ্টা করেন। ছোটবড় বা মানানসই না হওয়ার ঝুঁকি নেন না। আর বই পড়তে গেলেও তো মনের মত বই সহজে পাওয়া কঠিন নিজের মত করে নিজ দায়িত্বে তা খুঁজে নিতে হবে। তবে জুতোর মাপে পা কাটার সুযোগ থাকলে তো আর বিভিন্ন মাপের জুতো লাগতো না। কিন্তু মাপমতো জুতো না পড়ে হোঁচট খেলে বিপদই বাড়ে লাভ হয় না!
বই পড়ার জন্যে গ্রন্থাগার জরুরি যাতে বইয়ের ভিড়ে নিজের উপযোগী বই বের করা যায় সহজেই, তারপর দরকারমত বই বা বইগুলো নিয়ে পড়ে জমা দিলেই হলো। কিন্তু গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে নতুন বইয়ের সংযুক্তি বা অন্তর্ভুক্তি কম দেখা যায়। কারণ গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা ও সংগৃহীত প্রাচীন ও দুর্লভ গ্রন্থের দিকে কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব থাকে বেশি। আর নতুন বইয়ের মজা না পেলে ঠিক বই পড়ার আনন্দ পাওয়া যায় না। কিন্তু যেহেতু পাঠক কম, ক্রেতা তার চেয়ে বেশি কম, অতএব বইয়ের দাম বেশি। আর এই‌ চক্র চলতেই থাকে।
আপনার কোন বই ভালো লাগবে তা নির্ভর করে আপনার জীবনাভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বের উপর। আপনি কোথায় কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন আপনার পূর্বসূরিদের পেশা ও সামাজিক অবস্থান, আপনার পরিবারের সদস্যসংখ্যা, পরিবারে আপনার অবস্থান আপনার সামাজিক ও আর্থিক শ্রেণি প্রভৃতি বিষয় আপনার পাঠরুচি তৈরি করতে পারে । এক্ষেত্রে দুটো ব্যাপার ঘটতে পারে আপনি যেমন, তেমন বই আপনাকে টানতে পারে, আবার আপনি যেমন নয়, অর্থাৎ বিপরীতধর্মী বই আপনাকে টানতে পারে। তবে কাজের পড়ার ক্ষেত্রে তো আপনার দরকারটাই মুখ্য থাকে। সেক্ষেত্রেও আপনার জন্যে কিছু বই হবে সহায়ক কিছু প্রতিকূল। অনেকে কাজের কথা সংক্ষেপে সহজে পেতে চান। কেউ কেউ চান কাজের কথাগুলো যথেষ্ট বিশদভাবে জানতে, যাতে কাজের সময় সেই বিষয়ে কোন সঙ্কটে না পড়তে হয়। তবে কাজের বই পড়ার চল এ দেশে কমই‌। আর কাজের বই কেমন-কী ভেবে দেখার মানসিকতাও কম। পড়তে হবে তাই পড়ি এমন একটা মনোভাব থাকে, যার কারণে আস্বাদনের আনন্দ বঞ্চিত পাঠক পুরোপুরি একাত্ম হতে পারে না। আর এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাভাষায় আর বাংলাদেশে বিষয়ভিত্তিক সুপাঠ্য প্রামাণ্য অনন্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের ঘাটতি দেখি।
আর বইকেনার অনভ্যস্ততা আর দাম বেশি থাকায় নতুন বই, নতুন লেখক কিছুটা উপেক্ষিত থাকে, এতে ভাল মানের সাহিত্য বা সাহিত্যিকের চেয়ে সামর্থ্যবান বা মদদপুষ্ট সাহিত্যিক ও বাজারি সাহিত্যের রমরমা তৈরি হয়। আর এমন অবস্থার ভেতর প্রশ্ন আসে যে, “কোন বই পড়বো?”
এই নিরীহ প্রশ্নের সদুত্তর আর থাকে না! কারণ সময়ের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বইটি হতে পারে বা হয়ে থাকে দুর্লভ, অন্যদিকে একশ বা অর্ধশত বছর আগের বই সুলভ, এখন নিজের পাণ্ডিত্য দেখাতে বইয়ের নাম বলে দায়মুক্ত হলে তো হয় না। বইটা পড়ার সুযোগ দিয়ে পাঠককে সন্তুষ্ট করার কথা ভাবতে হয়। তারপরও এমন হতে পারে ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত, অভিজ্ঞতা,পেশা, মন-মর্জি বিচার করে কোন পরামর্শক বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছে আর তা পড়ে পাঠক যন্ত্রণামুক্ত হয়ে আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। আর তালিকার বইগুলো এত সহজলভ্য যে মোড়ে মোড়ে পাওয়া যাচ্ছে। দেশের মানুষ সকাল সন্ধ্যা নিয়ম করে বই পড়ছে। কেউ পরামর্শ ছাড়া কোন বই পড়ছে না। পড়ছে আর উপকৃত হচ্ছে। এভাবে সামাজিক সমস্যা সমাধান হয়ে যাচ্ছে।
যদিও অবান্তর লাগছে, তবে তা হলে খারাপ হতো না। অনেক মানুষকে চিনি যারা সময়মত মূল বই না পড়ে ভুল বই পড়েছে। আর তাতে এমন হয়েছে যে অসময়ে বুঝতে বা শিখতে পারেনি, সময়ে গিয়ে পড়া জিনিস আবার পড়তে পারেনি অথবা পড়তে গিয়ে গ্রাহ্য কিছু নতুন করে নিতে পারেনি। ফলে লেখকের শ্রমের কিছু অংশ তাকে লাভবান করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাতে লেখকের যদিও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু কিছু ভ্রান্তধারণার উদ্ভব হয়ে লেখককে পাঠক অবমূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়েছে। আর এমন অবমূল্যায়ন দেশের জন্য কল্যাণ আনে না। উল্টো সমাজকে পিছিয়ে যেতে সাহায্য করে।
শিশুরা গল্পের বই পড়বে কখন? - বিবিধ ...
বইপড়ার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থালয় দরকার। কিন্তু নামসর্বস্ব দালানকোঠা আর আসবাবপত্র দিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানো হয়, অন্যদিকে বইয়ের আয়নায় নিজেকে দেখার বদলে আত্মবিস্মৃতির সহায়ক হিসাবে বই পড়ার পথ বেছে নেয় অনেকে। গ্রন্থাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় দরকার। তবে যদি তা করতে আমরা নাও পারি বেশ রসিয়ে রসিয়ে বই পড়া দরকার। অর্থাৎ সানন্দে ও রীতিমত বুঝেবুঝে বই পড়া দরকার। আর এমন অভ্যাস অনেক পাঠকের তৈরি হওয়ামাত্র চাহিদার যোগান দিতে কিছু লেখক তৈরি হবে। তারা কেবল বাগাড়ম্বরে সিদ্ধহস্ত না হয়ে মননমগজের পরিচর্যায় পারদর্শী হবেন। আর পরিচর্যিত মগজের লোকেরা সমাজ তথা রাষ্ট্রের কল্যাণে এগিয়ে আসবেন। আর এর ফলে গ্রন্থাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় এর অভাবটা ঘুঁচে যাবে। তবে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোকের অভাব নেই। তবে সদিচ্ছার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। কেননা যেমন চলছে তাতে তো বইয়ের ব্যবসা আর বইপড়া উটপাখিদের কোন ক্ষতি হচ্ছে না বরং লাভের পাশাপাশি প্রশংসা সমাদর জুটছে।
নিরীহ প্রশ্নের সদুত্তর আর থাকে না! কারণ সময়ের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বইটি হতে পারে বা হয়ে থাকে দুর্লভ, অন্যদিকে একশ বা অর্ধশত বছর আগের বই সুলভ, এখন নিজের পাণ্ডিত্য দেখাতে বইয়ের নাম বলে দায়মুক্ত হলে তো হয় না। বইটা পড়ার সুযোগ দিয়ে পাঠককে সন্তুষ্ট করার কথা ভাবতে হয়। তারপরও এমন হতে পারে ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত, অভিজ্ঞতা,পেশা, মন-মর্জি বিচার করে কোন পরামর্শক বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছে আর তা পড়ে পাঠক যন্ত্রণামুক্ত হয়ে আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। আর তালিকার বইগুলো এত সহজলভ্য যে মোড়ে মোড়ে পাওয়া যাচ্ছে। দেশের মানুষ সকাল সন্ধ্যা নিয়ম করে বই পড়ছে। কেউ পরামর্শ ছাড়া কোন বই পড়ছে না। পড়ছে আর উপকৃত হচ্ছে। এভাবে সামাজিক সমস্যা সমাধান হয়ে যাচ্ছে।
মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়