অবসরে শুয়ে বসে যা পড়ি তাই সাহিত্য। কিন্তু সাহিত্য নিছক বিনোদন আর অকেজো কিছু নয় এটা মানতে আমরা অভ্যস্ত নই। সাহিত্য যখন শাস্ত্র বা বিষয় হিসাবে পাঠ করি আমরা তখন প্রাচীন বা পুরনো অন্তত আজকের নয় এমন রচনা নিয়েই আলোচনা করি বেশি। বর্তমান নিতান্ত উপেক্ষিত থাকে। এজন্য সাহিত্য মানেই অকাজের পুরনো জিনিস এমন ধারণা বাংলাদেশের শিক্ষিতদের মধ্যে আছে। সাহিত্যে আগ্রহী মানে শতবর্ষ থেকে সহস্র পারলে দশ হাজার বছর আগের লেখা রসিয়ে পড়ে রস নিংড়ে নেয়াটাই যেন কাঙ্ক্ষিত। এ দেশে সাহিত্য মানেই যেন রবীন্দ্রনাথ নজরুল তিন বন্দ্যোপাধ্যায় পড়া চাই। অথচ যা সনাতন তাই কেবল সাহিত্য নয়। সাহিত্য কালের দর্পণ। সাহিত্যবোদ্ধা ও সমালোচকদের মধ্যে সমাদৃত বুদ্ধদেব সে যুগে ইংরেজিতে রেকর্ড নম্বর নিয়ে স্নাতক করেছেন। প্রাচীন ও বিশ্বসাহিত্যে তাঁর অসামান্য দখল ও অবাধ পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও তিনি লিখেছেন সমকালীন কবিদের কবিতার সমালোচনা করে ‘কালের পুতুল’। তাঁর রেকর্ডের জন্য বা আরো যত কীর্তিকাব্য উপন্যাস তাঁর জন্য যতটা না আলোচিত তাঁর চেয়ে কোন অংশে কম আলোচিত নন তিনি ঐ এক ক্ষুদ্র পুস্তকের জন্য। অথচ হাল আমলের সমালোচকদের নজর ঐসব জীর্ণ পুরনো পুঁথিপত্রের দিকে। তাতে সনদস্বীকৃতি এমনকি পদ পদবি জুটতে পারে। কিন্তু সমকালীন সাহিত্যের নির্মোহ বিচার এমনকি পাঠ করলেও জাতে ওঠা যায় না। অবশ্য সমস্যা কেবল সমালোচকের নয় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ত্রুটি আছে। সাহিত্য যে সংবাদপত্রের মত তাজা হয় সে বোধ আসেনি। আমরা গল্পের বই কেই কেবল সাহিত্য ভাবি। আর গল্পের বই বলতে উপন্যাস ছোটগল্প জীবনী এসবকে বুঝি। প্রবন্ধ সাহিত্যের ভিতর পড়ে আমাদের শিক্ষিত সমাজে বিষয়ভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ পড়ার অভ্যাস বা ঝোঁক থাকলেও ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধে আগ্রহ কম। আবার বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক রচনা ধরা যাক কাঠখোট্টা গাণিতিক তত্ত্ব বা ইতিহাসের বই বা সে বিষয়ক রচনা সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে। সেটা হতে পারে লেখকের গুণে। সেই রকম লেখক নেই তা নয়, বরং পাঠক তৈরি হয়নি। আর এসবই সাহিত্যকে করছে জীবনবিমুখ কল্পনানির্ভর। আজকের দিনে হুমায়ুন আহমেদ বা ইমদাদুল হক মিলনের কিছু বই আমাদের যুগের সঙ্গে খাপ খায় না। আর সেখানে সেই শরৎ রবীন্দ্রনাথ এর উপন্যাসের চরিত্র ও কর্মকাণ্ড বুঝে ওঠা উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা বা দারুণবোধশক্তি থাকলেও ঠিকমত বুঝতে পারা কঠিন, অসম্ভব বললে আবার কিছু লোকের আঁতে ঘা লাগে। তাতে সত্য আড়াল হয় না। বা মিথ্যে হয়ে যায় না।
অথচ এই ক’বছরে যেসব বই বেরিয়েছে তার সাহিত্যিক মূল্য আছে কিনা সেই প্রশ্নও তো চলে আসে। সেই রচনাগুলো কি সাহিত্যের গুণ ও মান বহন করে? যুগের আকুতি তারা ধারণ করছেন না নিজেদের মত করে একটা কিছু চাপিয়ে দিচ্ছেন সেইটা বিচার করতে হবে। শিল্পচ্যুতি বা অসারতাকে কেবল সমকালীন বলেই সাহিত্য বলে মেনে নিতে আমি বলি না। তবে কালের দাবিকে আর সময়ের আর্তিকে ধরতে না পারলে অন্যদিকে সাহিত্যের সমালোচনা ঠিকভাবে না হলে অচিরেই সাহিত্যের সাথে জাতির তথা দেশের শিক্ষিত মানুষের বড় অংশের বিচ্ছেদ ঘটবে। সমাজ,সময়,ভূগোল,পরিবেশ,আবহাওয়া,আর্থিক সঙ্গতির ভিত্তিতে যেমন সংস্কৃতি তেমনি সাহিত্য ও এর বাইরে নয়। কাজেই সাহিত্যে যেমন কালের দাবিকে জায়গা দিতে হবে তেমনি আবার যৌক্তিক পারম্পর্য ও‌ রুচিশীলতার নিরিখে বাস্তবানুগ রচনাকে চিনতে হবে। আমি চাই সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবিক ও জ্ঞানালোকিত মানুষে এদেশ ভরে উঠবে।
মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here