ভাষা নিয়ে কথা হয়! সেটাও একটা ভাষায় একটা ভাষাকে নিয়ে তবে তা কথার কথা বলে উড়িয়ে দেয়ার মত কিছু নয়। বাংলা ভাষা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিতে পারলে লাভ আছে, কিন্তু বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে তেমন কোন লাভ হয় কি? আজ বাংলা একাডেমিকে ধুয়ে দিলে আত্মিক সুখ হয় , অবশ্য তার চেয়ে বেশি হয় রক্ষা, কারণ কাল পরশুর post অথবা অন্য কোন formal writing এ বানান-ভুল হলে তা কেবল মুদ্রণপ্রমাদ, অসচেতনতা, অসতর্কতা, অজ্ঞতা বলে দায়ী না হয়ে বরং বাংলা একাডেমিকে বলির পাঁঠা অথবা নন্দ ঘোষ প্রতিপন্ন করার সুযোগ নেয়া যায়। হ্যাঁ, বহু বাঙালির বানান ভুলের বড় কারণ অজ্ঞতা। অযত্ন অবহেলায় ভাষা শিখলে। ভাষাকে অবজ্ঞা করলে বানান ভুল হবে এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

এখন নিজের ভাষিক অজ্ঞতা আড়ালে একটি কাজ খুব ভালো মুক্তি দিতে পারে। যে ভাষায় অজ্ঞতা তাকেই ত্রুটিযুক্ত ঘোষণা করা! আর সেই হালে পানি পেতে একদল অন্ধ অনুসারক হলে তো সোনায় সোহাগা। “প্রমিত বাংলা একটা কৃত্রিম আরোপিত অস্তিত্বহীন অব্যবহার্য অচল ভাষা” এই উদ্ধৃতি দিতে পারলে নিজের যাবতীয় ভাষিক অজ্ঞতা আড়ালে তো পড়েই প্রমিত বাংলা বিষোদগারে খিস্তি করার মত দহরম-মহরম করার মত সখা-সখীও জুটে যায় মুহূর্তেই। কারণ অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলা ভাষা অবহেলিত। ‘বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র’ লিখে এ ভাষা শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে টিকে গেছে বলে গৌরব করে আর সাম্রাজ্যবাদের কারণে ঝুঁকিতে এটুকু জানিয়ে কিন্তু প্রখ্যাত ভাষাবিদ হুমায়ুন কবীর (হুমায়ুন আজাদ) দায়মুক্ত হয়েছেন। সংকট উত্তরণে পথ নির্দেশের দায়সারা চেষ্টা করেন নি তা নয়। তবে তা ঐ মন্দের ভালো বড়জোর। তবু তাঁর কাজ তিনি করেছেন। আরেকটা বড় কাজ করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানানরীতি অনুসরণের পাশাপাশি প্রমিত বাংলার চর্চা করেছেন , গদ্যে ও‌ কবিতায়। তাঁর সাধ্য কি ছিল না বিক্রমপুরের ভাষাকেই খাঁটি বাংলা বলে জোর করে প্রমিতের উপর চাপিয়ে দেয়ার?

প্রমিত বাংলা বহুল চর্চিত একটা ভাষা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে। প্রায় একশ বছর ধরে এর প্রচলন। সবুজপত্রে এর স্বীকৃতি, আজও চলছে দাপ্তরিক কাজ কর্মে, প্রথমে কৃত্রিম সাধুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, কিন্তু এখন ইংরেজিকে সঙ্গীতের মত অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে posh people এর সদ্ব্যবহার করছেন। যাতে করে এর গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হ্রাস পায়। আর রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ইংরেজিকে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।

বাংলাদেশে উর্দু, ফার্সি, ফরাসি, ডয়েচ, ডাচ, সংস্কৃত, পালি, প্রভৃতি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা হয়। সারা বিশ্বে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ানো ও শেখানোর জন্যে এদেশে সযত্নে ইংরেজির চর্চা করা হয়। প্রতিবছর ইংরেজির অধ্যাপক রপ্তানি করা হয়! এতে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ে তাই না? বিদেশের লোকদের জন্যেই সম্ভবত অচিরেই কেন্তম শতম চর্চাও আরম্ভ হবে। বাংলাকে বিলুপ্ত করলেই চলে।

ব্রিটিশ শাসনের স্তবগান আজও চলে, বঙ্গীয় তথাকথিত রেনেসাঁ নিয়েও গর্ব করা হয়, সেই সব আত্মবিস্মৃত সুবিধেবাদী মনীষীদের স্তবস্তুতি তোতাপাখির মত আওড়ালে বাহ্বা মেলে পাশাপাশি খাম ও জোটে (ভেতরে ভরা উষ্ণসুখপ্রদ কাঁচা টাকা) । সে তো দোষের না, কিন্তু আত্মবিস্মৃতির স্থায়িত্বকাল বৃদ্ধিতে অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়।

সমগ্র বাংলাদেশ একশক্তির শাসনাধীন ছিল কি ব্রিটিশদের আসার আগে? শাসক আলাদা ছিল, সংস্কৃতি ও ভাষায় ও কিছু পার্থক্য ছিল। কলকাতায় যখন নগরায়ন হলো, আধুনিকতা পাখা মেললো তখন সারা বাংলা ছিল কলকাতামুখী চিলাহাটি বা সৈয়দপুর থেকে কলকাতা পর্যন্ত যাওয়ার জন্যে ছিল রেলের রাস্তা! আর বর্তমান উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার নিবিড় যোগাযোগ ছিল তাও নিতান্ত অবান্তর নয়, কিন্তু ঢাকা-কলকাতা বিদ্বেষ আরও পড়ে আসে। ঢাকার লোকেরা কলকাতার ভাষা বা উত্তরবঙ্গের ভাষার প্রতি কটাক্ষ করেনি, এমনকি হয়তো তা একাত্তরের পরেও। কিন্তু এ কথা সত্য যে প্রমথের জন্ম পাবনায়, সে সময় সিলেটে বা চট্টগ্রামে পাবনার ভাষার মত ভাষা ব্যবহৃত হতো না, এও হয়তো সত্য আজকের রাজশাহীর লোকেদের মত টেনে টেনে কথাও বলতেন না তারা! পাবনা নদীয়া যশোর কলকাতার ভাষা বহুলাংশে প্রভাব ফেলেছিল সেদিনের প্রমিত বাংলায় এটা মেনে নিতে হয়।

তবে এও তো সত্য ভাষা এক ধরনের সংক্রমণ ঘটায়। আপনার খুব কাছের কোন মানুষের ভাষা থেকে আপনি কিছুটা গ্রহণ করবেন। তাহলে এই একশ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কেন প্রমিত কে গ্রহণ করতে পারলেন না? কারণ সদিচ্ছার অভাব ছিল , আর গ্রহণ করতে পারেনি এ অভিযোগ আংশিক সত্য!

আজকের দিনে প্রমিত বাংলাকে নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করতে পারলে কাল এর প্রতি বিরূপতা তৈরি করা যাবে, পরশু একে পরিত্যাগ করা যাবে। তখন ইংরেজিই হবে এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ভাষা!

অথচ যদি মানুষ যখন ভাষাটা শেখে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি কিংবা একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভাষা শিক্ষা বিষয়টা একটু গুরুত্ব পেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তখন শিক্ষিতদের জনৈক কে জৈনোক কিংবা গ্রিশশোঁ কে গ্রিশমো উচ্চারণ করতে শোনা যাবে না। আমরা ধরেই নিই গণিত আর ইংরেজি শেখাটা জরুরি তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু নিজেদের ভাষাও যে চর্চার আর ভালোভাবে শেখার মত কিছু তা প্রায়ই ভুলে যাই। আবার নিম্নমানের বই আর ভুলভাল বানানের বিজ্ঞাপন বা নামগুলো আমাদের বানানভুলের কারণ হতে পারে। কিন্তু একটু যত্নশীল হলে এ সমস্যা কাটানো যায়।

প্রমিত বাংলা নিয়ে যারা আপত্তি করেন তারা ঠিকই আঞ্চলিক উচ্চারণ বা বাচনভঙ্গি নিয়ে উপহাস করেন। আবার সাধুচলিতের পার্থক্যটাও সবার কাছে স্পষ্ট নয়। চলতি বাংলায় সংস্কৃত তৎসম শব্দ ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু পার্থক্য মূলত ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদে। সেই জায়গাটা স্পষ্ট না থাকায় গুরুচণ্ডালি দোষ দেখা যায় অনেকের কথায় বা লেখায়।

আর ভাষার স্বাভাবিক প্রবণতা বা পরিবর্তন সাদরে গ্রহণ করা গেলেও আরোপিত পরিবর্তন বা পরিবর্তনের জন্যে সক্রিয় প্রয়াস কাঙ্ক্ষিত নয়। শেষকথা এটা বলা যায় ভাষা সংস্কৃতি এসব গুরুত্বপূর্ণ এটা যদি নষ্ট হয় তাতে জাতির ক্ষতি হয় তা যত সামান্যই হোক। এটুকু বুঝলে সম্ভবত আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতা আমাদের ভাষিক চর্চাকে সুন্দর করতে পারে।

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়