আজ সন্ধ্যায় জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে শফিক। তবে মুক্তির আনন্দ তার মধ্যে কাজ করছে না। অথচ গত ২ বছর ৭ মাস ১৩ দিন যাবত প্রতিটা প্রহর সে এই সময়ের অপেক্ষা করে গেছে।একটা দিন পার করেছে আর সেলের দেওয়ালে একটা করে দাগ কেটেছে। সেল পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তাঁর গণনা থেমে থাকে নি। প্রতিটি দিন সে পার করেছে কঠিন তপস্যায়। প্রতিটি রাতের প্রশান্তিময় স্বপ্নকে পুড়িয়ে তিল তিল করে নিজেকে টেনে এনেছে আজকের এই রাত পর্যন্ত। ঠিক রাত পর্যন্ত নয়; আজকে বিকাল পর্যন্ত। তার বিরুদ্ধে আনা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা পর্যন্ত। নিজের পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এম্নিতেই সন্তানকে হারিয়ে শোকে কাতর ছিল। এর মধ্যে যখন পুলিশ তাকেই হত্যার দায়ে গ্রেফতার করল, তখন তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল। অনেকভাবে সে পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, নিজেকে নির্দোষ দাবী করেছে৷ কিন্তু পুলিশ তার কথা বিশ্বাস করে নি। এমনকি তাঁর দীর্ঘ দশ বছরের সুখ দুঃখের একমাত্র সঙ্গী,তার স্ত্রী অনন্যা পর্যন্ত অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে ছিল। আর বিশ্বাস করেই বা কি করে! তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণের লিস্ট টা যে অনেক লম্বা ছিল। যদিও সবগুলো প্রমাণই ছিল পারিপার্শ্বিক এবং পর্যালোচনা সাপেক্ষ । মোটিভ নিয়েও বিস্তর মাথা ঘামাতে হয়েছে প্রসিকিউশনকে। নেহাৎ কোমর বেঁধে লেগেছিল বলে শেষ পর্যন্ত একটা থিওরির উপর মোটিভকে দাঁড় করিয়েছিল পাব্লিক প্রসিকিউটর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই ধোপে টিকে নি। তার পক্ষের ডিফেন্স ল’ইয়ার হয়তো এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিল। তা না হলে বেকসুর খালাস পাওয়া হয়তো তার পক্ষে সম্ভব হতো না। কিন্তু এর মধ্যে ঘোলা জলে বয়ে গেছে বহু সময়; ২ বছর ৭ মাস ১৩ দিন। উঁহু আরো বেশি ; ঘড়ির হিসেবে নাতিদীর্ঘ এই সময়ে তার জীবনটাই আস্তে আস্তে শেষ হয়ে গেছে। পায়ের নিচের শক্ত জমি খুব ধীরে ধীরে তাঁর পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। চোখের সামনে অতি পরিচিত, চেনা মুখগুলো সব আস্তে আস্তে কেমন যেন অচেনা হয়ে গেল। দক্ষ চিত্রকরের দীর্ঘ সময়ে অতি যত্নে তৈরি রঙিন ক্যানভাস যেন ধীরে ধীরে রঙ হারাতে লাগলো। মাঝে মাঝে অনন্যা তাঁর সাথে দেখা করতে আসতো।কিন্তু তাঁর চোখে যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল সে দেখত, তা সর্বদা তাঁর বুকে কাঁটার মত বিঁধত। আর শুনানির সময় আদালতে তাঁর অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের তীব্র অবিশ্বাস আর প্রচ্ছন্ন ঘৃণার যে অভিব্যক্তি দেখেছে,তা সে জীবনে ভুলতে পারবে না।

তবু তাঁর একরোখা জেদি মনোভাব দুর্ভেদ্য দুর্গের মত ডিফেন্ড করে গেছে সবকিছুকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ যেন তাঁর সমস্ত শক্তি লোপ পেয়েছে। যে দু’টি পায়ে সে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা যেন তার নয়। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর স্ত্রীর সাথে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল সে। তাঁর বাড়ি,তার একমাত্র ঠিকানা। কিন্তু কোনকিছুতেই সে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল না।এমনকি ঘরের আসবাবগুলোও যেন তার দিকে কেমন করে চেয়ে ছিল। এজন্যই হয়তো মনীষীগণ বলেন, “The same person doesn’t come back from battle field.” পৃথিবীর সমগ্র সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য মানুষ। সৃষ্টিকর্তা তাঁর প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিশীলতা দিয়ে আপন হাতে পৃথিবীর সবকিছুকে তৈরি করেছেন মানুষের জন্য। তবে বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য প্রাণী যদি সংখ্যায় কমে যায়, তাহলে পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হলেও মানুষের সংখ্যা যদি মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ কমে যায় তাহলে বোধহয় পৃথিবীর তেমন কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। প্রতিদিনই তো শয়ে শয়ে মানুষ মরছে। কেউ পানিতে ডুবে, কেউ আগুনে পুড়ে, কেউ রোড একসিডেন্টে৷ আবার কেউ বা নিছক রোগে ভুগে। আবার হয়তো হাজারে হাজারে মানুষ জন্ম নিয়ে সে অভাবকে পুষিয়ে দিচ্ছে। এই যে শফিকের দীর্ঘ অনুপস্থিতি, অকৃতকর্মের অপরাধ, নিরপরাধ কারা ভোগ এগুলো কাউকে প্রভাবিত করেছে কি? মনে তো হয় না। একমাত্র তাঁর স্ত্রী ছাড়া হয়তো আর কেউ তার অভাব বোধ করে নি। তাও কাবিন নামায় তাদের জীবন ২ টা স্বাক্ষরে বাঁধা ছিল বলেই।

সে যাই হোক, শফিকের জন্য পৃথিবীর কিছু হোক বা না হোক, পৃথিবীর জন্য সে কোন টান অনুভব করছে না। তাঁর পৃথিবী অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।কিন্তু শুধুমাত্র আজকের দিনটি দেখার জন্যই সে বেঁচে ছিল।বেঁচে ছিল লৌকিকভাবে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে দেখার জন্য। কিন্তু সুর কেটে গেছে। এখন আর নতুন করে সবকিছুর সাথে সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি নিজ বাড়িতেও সে ঠিক welcomed বোধ করছে না। অথচ রবার্ট ফ্রস্টের কি যেন একটা কথা আছে না–“Home is the place, where if you want to go there……?”

তাই ভবিতব্যকে মেনে না নিয়ে সে রাতের খাবারের পর গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছে শহরের বাইরের এই নির্জন মাঠে। হেমন্তের এই সময়টায় এদিকে বেশ শীত পরে৷ তাই লোকজনের আনাগোনাও নেই বললেই চলে। গাড়ি থেকে নেমে এল প্রায় নিঃশব্দে। কোন তাড়াহুড়ো নেই। বেশ নরম, মোলায়েম কুয়াশা পরেছে চারদিকে। তার উপর আজ বোধহয় শুক্লার চতুর্দশী টশী হবে; আকাশ ফাটা জোছনায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। শফিক একটা জারুল গাছের নীচে এসে দাঁড়ালো। তার হাতে এক গাছা দড়ি। চাঁদের আলো থাকায় বেশ সুবিধেই হয়েছে তাঁর। সহজেই বেশ মোটাসোটা একটা ডাল খুঁজে বের করতে পারল। জারুলের ডাল শক্ত নাকি নরম হয় সে জানে না৷ তবে রিস্ক নেওয়া যাবে না। কারণ, ব্যর্থ আত্মহত্যার চেষ্টা মৃত্যুর চেয়ে বেদনাদায়ক। কথায়ই তো আছে, “An unsuccessful suicide is more painful than suicide itself.” আরেকটু খুঁজে গাছের গাছের সম্ভাব্য সবচেয়ে শক্ত ডালটা বের করল। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে লুপটা বানিয়ে ফেলল প্রায় নিখুঁতভাবে। এবার ডাল থেকে ঝুলিয়ে দিল সেটা। তারপর ফাঁকা মাঠে একটু হাঁটলো। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁর অবশিষ্ট জীবনীশক্তির সবটুকু শুষে নিয়ে উচ্চারণ করলো সেই কথাটা,যা সে গত তিন বছরে জজ সাহেবের চোখে চোখ রেখে বহুবার বলেছে; “আমি শফিকুর রহমান, সম্পূর্ণ নির্দোষ।” তারপর আবার ফাঁসির দড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। শিউলি ফুলের মত তারা ছিটানো আকাশের নিচে শেষবারের মত নিঃশ্বাস নিতে নিতে সে ভাবলো, “জীবনের এতগুলি দিন কি সে এই মুক্তির অপেক্ষাতেই ছিল?

হুসাইন মুহাম্মাদ সিদ্দিকিন
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়