কংগ্রেস নেতা মওলানা আজাদ দেশ ভাগের প্রবল বিরোধিতা করেন। সহকর্মীদের বুঝিয়েও কোন লাভ হয়নি। ওল্টা সর্দার প্যাটেল হিন্দু মুসলিম কে দুইটা আলাদা জাতি বলে বেফাঁস মন্তব্য করেন। শেষে মওলানা আজাদ গান্ধীজির স্মরনাপন্ন হন। গান্ধীজি বলেন “দেশবিভাগ যদি করতেই হয় তবে তা আমার লাশের উপর দিয়ে করতে হবে, আমি বেঁচে থাকতে এটা কখনোই হতে দিব না”। অথচ দুঃখের বিষয় সর্দার প্যাটেল গান্ধীজীকে প্রভাবিত করে তার মত পাল্টে দেন।

গান্ধীজি এসময় আরেকটা বিকল্প সমাধানও দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ভারতবর্ষে জিন্নাহকে সরকার গঠন করতে দেওয়া উচিত। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজী হন এবং এতে দেশভাগ করার সিদ্ধান্ত পরিহার করবেন জানান। কিন্তু সর্দার প্যাটেল ও নেহেরুর বিরোধিতায় তা কার্যকর হয়নি।

এসময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী স্বাধীন, সার্বভৌম যুক্ত বাংলা গঠনের প্রস্তাব করেন, জিন্নাহ এতে সায় দেয়। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ও হিন্দুমহাসভায় শ্যামাপ্রসাদ যুক্ত বাংলার বিরোধিতা করেন এবং প্রাদেশিক ভোট বিভাগের পক্ষেই যায়। তাই আমাদের বাংলাও ভাগ হয়ে যায় এবং কলকাতা সহ পশ্চিম বঙ্গ চলে যায় ভারতের ভিতরে।

নতুন প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণের জন্য ডাকা হয় স্যার সিরিল র্্যাডক্লিফকে। তিনি ইতিপূর্বে কখনো ভারতবর্ষে আসেন নি। তাকে ভারত পাকিস্তান সীমানা নির্ধারণের জন্য মাত্র ৫ সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। র্্যাডক্লিফ সাহেব এমন মানচিত্র তৈরী করলেন যেন পরবর্তীকালে দুইদেশের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। মজার বিষয় এই যে র্্যাডক্লিফ সাহেব বঙ্গপ্রদেশের মানচিত্র টেবিলে রেখে লাল কালি দিয়ে দাগ টেনে বাংলাকে ভাগ করে দেয়। যার ফলে দেখা যায় এমনও পরিবার আছে যার শোবার ঘর পড়েছে পূর্ব পাকিস্তানে আর রান্নাঘর পড়েছে ভারতে, বাড়ীঘর পড়েছে ভারতে আর কৃষিজমি পড়েছে পাকিস্তানে।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পাওয়া গেল ঠিকই কিন্তু তা দেশ বিভাগের মূল্য দিয়ে। ভারতবর্ষ নব্য স্বাধীনতার যে মুকুট পেয়েছিল তাতে ছিল দুঃখের ভার। কারণ দেশ ভাগ হওয়ার পরই দেশের বিরাট অংশে রক্তের নদী বয়ে গেছিল৷ জনগণ ছিল দেশবিভাগের বিপক্ষে এটা তারা আগে না বুঝলেও ভাগের পর ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। বিশেষ করে হিন্দু ও শিখরা দেশ ভাগ মেনে নিতে পারেন নি। শুরু হয় ভারতে মুসলিম ও পাকিস্থানে হিন্দু নির্যাতন, লুটপাট। সে সময় অনেক হিন্দু মুসলিম ইচ্ছার বিরুদ্ধেই দেশ ত্যাগ করে। যে সকল মুসলিম ভারত থেকে পাকিস্তানে যায় তারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে পরিচয় পায়। তখন জনগণ বুঝতে পারে দেশ বিভাগের জন্য তারা কত বড় ক্ষতি করে ফেলেছে।

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর জিন্নাহ বলেছিলেন “এতো সহজেই যে পাকিস্তান পেয়ে যাব তা কখনও আমার জীবন দশায় ভাবিনি “। স্বাধীন হওয়ার এক বছর পরেই জিন্নাহ শারীরিক অসুস্থতায় মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে তার ব্যক্তিগত ডাক্তারকে তিনি বলেছিলেন পাকিস্তান আদায় করা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ।

যুক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীও পাকিস্তান সৃষ্টিতে কম অবদান রাখেনি। কিন্তু স্বাধীনতার পর খাজা নাজিমুদ্দিনই পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। তখন সোহরাওয়ার্দী ভারতে গিয়ে গান্ধীজীর সাথে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা থামাতে আত্মানিয়োগ করেন। ১৯৪৮ সালে সোহরাওয়ার্দী বাংলায় আসেন কিম্তু তাকে দেশে ঢুকতে দেয় নি। তাকে ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে আখ্যায়িত করে মুসলিম লীগের নেতারা।১৯৪৯ সালে তিনি কলকাতা থেকে করাচী চলে যান। ওই সময় পাকিস্তান সরকার তার গন পরিষদের সদস্য পদও বাতিল করেন। কারণ হিসেবে বলেন তিনি ভারতের চর। পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার পক্ষপাতীত্ব করেন।

গান্ধীজি ভারতের জনক। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবী অনশন করে আদায় করে নিয়েছেন। গান্ধীজি ছিলেন দেশ বিভাগের প্রবল বিরোধী, এমনকি বলেছিলেন দেশ ভাগ করতে হলে তার মৃতদেহের উপর করতে হবে। অথচ পরে তিনি প্রভাবিত হয়ে যান৷ তিনি যদি দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে অনশনে যেতেন তাহলে হয়ত আজোও বর্তমান এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থাকত না, ভারতবর্ষ পৃথিবীর বুকে এক অন্যন্য শক্তিশালী দেশ হিসেবে থাকত। এমনি গান্ধীজি যদি নাঠুরামের গুলিতে না মরে এই অনশনেও মরতেন তাহলে তার সম্মান শতগুণে বৃদ্ধি পেত।

ধর্মের ভিত্তিতে আসলে কখনো দেশ হতে পারে না। ধর্মের ভিত্তিতে যেমন ইতিহাস লিখা হলে তা পূর্ণাঙ্গ হয় না ঠিক তেমনি ধর্মের ভিত্তিতে কখনো জাতিও হয় না,সমাজ ও হয় না। যার প্রমান পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। সাম্প্রদায়িকতা একটি ক্ষনস্থায়ী সমস্যা কিন্তু দেশ ভাগ একটা চিরস্থায়ী ক্ষতি। দেশ বিভাগের দ্বারা সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হয় না বরং সাম্প্রদায়িকতা আরো বাড়ে। দেশবিভাগের দ্বারা ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক প্রীতি যে চিরতরে বিদায় নিয়েছে তা আর নতুন করে বলা লাগে না। যার ফলাফল ভারত পাকিস্তান বিরোধ আজও বর্তমান। সুতরাং বলাই যায়, সেসময় কিছু নেতা ও ইংরেজদের বিষের বাঁশির সুরে প্রলয়নাচন নেচেছিল ভারতবর্ষের মানুষ।

দেশভাগ শুধু সম্প্রদায়গত বিভাজনই নয়, স্বাধীনতা ও মানবিক চেতনা বিভাজনেরও এক অমানবিক ইতিহাস। দেশ বিভাগের উত্তর প্রভার যার পরিচয় বহন করে চলেছে ৷ একটা দেশের আসল সমস্যা হল অর্থনৈতিক সমস্যা। সাম্প্রদায়িকতা কোন মূখ্য সমস্যা না। জনগণের মাঝে যদি কোন বৈষম্য থেকে থাকে তা হচ্ছে ধনী-গরীব বৈষম্য, ধর্মের বৈষম্য না। সুতরাং দেশ একবার স্বাধীন হলে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ শিখ সবাই বুঝতে পারত তাদের আসল সমস্যা কোনটা।

Shahinul Islam Polash
Department of Fisheries,
University of Dhaka