একটা কথা অনেককেই বলতে শুনি, রাজনীতিবিমুখ একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। এই দুহাজার সালের পর থেকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে বা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে তাদের রাজনীতির প্রতি এক ধরনের ঘৃণা আছে। তার জন্য এই প্রজন্মকে রাজনীতিবিমুখ ভাবা বা বলা ঠিক নয়।

রাজনীতির কথা দূরে থাক, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা কতটুকু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের দিতে পারছে সেটা একটা ভাবার বিষয়। কেবল শিক্ষাব্যবস্থাই নীতিনৈতিকতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে তা নয় , পরিবার, সমাজ, পরিপার্শ্বও নীতিনৈতিকতার শিক্ষা দেয়। চুল পাকা বৃ্দ্ধ বা চুলহারানো লোকগুলো নিজেরা কতটা নীতিনৈতিকতার পরিচয় দেন সেটাও দেখতে হবে। পরিবারব্যবস্থায়, সমাজে যে ভাঙন বা অবক্ষয় ঘটে গিয়েছে তা বুঝতে তো বেশি মাথা খাটাতে হয় না, সহজেই বোঝা যায়।

সদ্যস্বাধীন হওয়া দেশে সরকার একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী নির্মাণে মনোযোগ দেয়। সে সুযোগে কিছুটা সামাজিক গতিশীলতা থাকে । আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কিয়দংশকেও উচ্চবিত্ত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। সে সুযোগ সীমিত সময়ের জন্যই । সমস্যা হ’ল, আঙুল ফুলে কলাগাছ বা নিম্নবিত্ত থেকে হঠাৎ ধনকুবের হওয়াটা খুব বিরল দৃষ্টান্ত। ব্যতিক্রম উদাহরণ হতে পারে না! অথচ চোখের সামনে সেইসব রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া লোকদের এত বেশি তুলে ধরা হয় যে, কেবল তরুণরা নয়, সমাজের অধিকাংশ লোক তাদেরকে আদর্শ ভাবতে থাকেন।

তরুণদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারকা হয়ে যাওয়া। মোড়ে মোড়ে তাদের ছবি ঝুললে তারা সুখী বোধ করে। এ সুযোগ যদিও সীমিত। তবুও আগ্রহী অধিক। সমাজে বড় মানুষ হওয়ার মানে কেবল আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া নয় , এ সত্য আমরা কোথাও শিক্ষা পাই না বা, সেটা দেয়া হয় না।

রাজনীতি নিঃস্বার্থ ও গণমুখী হবে এ কথা অনেকেই বিশ্বাস করেন না! বরং সুবিধে আর ক্ষমতার জন্যই লোকে রাজনীতি করবে এই সত্যই আজ প্রতিষ্ঠিত। সুবিধেবাদীদের সঙ্গী জুটতে পারে, তবে তাদের লোকে ভালোবাসে না( আধুনিক কালের স্বার্থান্ধ জৈবিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন প্রেম-সম্পর্ক ধর্তব্য নয়), আর এই ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা বিস্তৃত পরিসরে রাজনীতিবিমুখতা তৈরি করে।

অথচ জনগণের ভাগ্য বদলাতে রাজনীতির বিকল্প নেই। রাজনীতিতে নামলে আর সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা থাকলে তা হিতকর হবে ক্ষতিকর নয়। হয়তো ভুল মত ও পথের রাজনীতি করতে করতেই সত্যের সন্ধান পেয়ে যাবে, যদি সে ভণ্ড না হয়, নীতিনৈতিকতার বোধ সামান্যও থাকে। তারপরও মগজধোলাইয়ে বিভ্রান্ত হয়ে বিপথগামী হওয়ার খানিকটা ঝুঁকি থাকে, যদি ব্যক্তির ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা না থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যখন বোধসম্পন্ন আর জ্ঞানসমৃদ্ধ মানুষ রাজনীতিবিদ্বেষী হয়ে ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অযোগ্য আর ধান্দাবাজ লোকের দ্বারা রাজনীতি সরগরম হতে থাকে। রাজনীতি আশীর্বাদ নয় অভিশাপ হিশেবে কাজ করতে থাকে।