সংজ্ঞা খুব সীমিত একটা বিষয়, বাঁধনে বেঁধে দখল করা জমি রক্ষা করা যায়, কিন্তু সব বিষয় ধরে ফেলার মত বাঁধন কোথায়? কেবল কথায় কি ধরা যায়, কত কথা লোকে বলে দিনভর তার কটা কাজের? আর কটায় বা পরেরদিন পর্যন্ত মনে থাকে , কিছু কথা তো আমরা বলে কিছুক্ষণ পরই ভুলে যাই, তবুও লোকের কথা শুনতে আমরা ছুটে যাই, দুটো কথা বলতে না পারলে ছটফট করে মরতে থাকি, এই সমাজে যে বেঁচে আছি সমাজের যে সুতোয় গেঁথে আছি সবাই সেই সুতো যোগাযোগের, ভাব বিনিময়ের। কিন্তু কত কাহিনি আছে কত গল্প আছে মানুষের কত অজানা জিজ্ঞাসা তো শেষ হয়না! তাহলে সাহিত্যের সংজ্ঞা খোঁজা কি সোজা? কথায় ধরতে হবে আবার বাঁধনে বাঁধা যায় না। আবার ঐ বেঁধে নেয়ার সুতো যেই ভাব বিনিময় তাই তো সাহিত্য।

মানুষ যখন নিঃসঙ্গ হয় অথবা সঙ্গের মাঝে চায় অধিকতর কিছু তাকে যার কাছে হাত পাততে হয় সেতো সাহিত্য। গান আমরা শুনি প্রিয় কারও শূন্যতায় তেমনি পাশে প্রিয় কাউকে পেলেও গান চাই, মুহূর্তটাকে স্থায়ীত্ব দিতে। গানের কথা সাহিত্য গানের প্রেক্ষাপট সাহিত্য গানে ব্যবহৃত কাহিনিও হয়তো সাহিত্য । সাহিত্য নেই কোথায়? কেবল কাগজে লিখে বা মলাটে মুড়ে ছেপে দিলেই কি সাহিত্য হয়ে যাবে। আমরা যা বলি যা ভাবি। সেইসব স্বগতোক্তি কি সাহিত্য নয়। তখনই আসে আরেক প্রশ্ন আসলে শিল্পের উদ্দেশ্য কি , সুন্দরতম করে তোলা সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হৃদয়ের আকুতি। আর এই সুন্দরতম সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা কথা কাহিনিই সাহিত্য । যদি প্রয়াসটা সুন্দর ও অনুভূতির না হয়ে হয় অসারতায় মোড়া তাতে সাহিত্য হয় না। এইখানে সত্য চলে আসে। একটা সাহিত্য কখন মহৎ হয়? যখন একজন লেখক নিজেকে মেলে ধরতে পারেন। তাতে তিনি নিতে পারেন চরিত্র কাহিনি রূপকের আশ্রয় কিন্তু নিজের বোধকে তো তিনি রূপায়ন করবেন। কিন্তু যদি তিনি নিজে না বুঝে অন্যের অনুভূতির অনুমিত বয়ান দেন তাতে আমাদেে পরের মুখে ঝাল খাওয়া বা অন্ধ হয়ে সাদ বক খুঁজতে যাওয়ার মত দশা হয়। একজন লেখক তার অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকেই লিখবেন। আরোপিত কোন বিষয়কে অবলম্বন করতে গেলে লেখকে গোঁজামিল দিতে হবে। আর সাহিত্য তো মানুষই করেছে। আমরা নিশ্চিত নই , তবে এ পর্যন্ত অন্য কোন প্রাণির চর্চিত সাহিত্য পরিদৃষ্ট হয়নি। কাজেই অনুভূতি মানবিক হবে আর সমাজে বাস করায় সামাজিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব অবশ্যই ঘটবে সাহিত্যে। মানুষের রুচি অভ্যাস প্রভৃতি সহিত্য গড়ে তুলতে পারে। বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি নাড়িয়ে দিতে পারে। এমনকি বিশ্বাস গড়ে দিতে পারে।

লেখক কেন লিখবেন? কারণ তার ভাবনাকে ধরে রাখার ইচ্ছে হবে। এই যে মানুষের অগ্রযাত্রা তা তো আসলে চিন্তা ভাবনার এগিয়ে চলা যখন দেখলো দরকার ব্যবহার শুরু করলো পাথর, আরেকটু এগিয়ে ধাতু , এরপর কত কী! আবিষ্কার হয়েছে চিন্তার প্রবাহ থাকাতেই, একটা শিকারী বাঘ তার জঙ্গলে সারা জীবন আধিপত্য করলো সেই জঙ্গলে আগন্তুক হাতিকে হত্যা করলো, শিকারী মানুষদের হত্যা করলো, ধরা যাক, সিংহকেও ঢুকতে দিল না ঐ জঙ্গলে। কিন্তু তার কৃতিত্ব কোন বাঘ জানে না! জানতে পারে না। মৃত্যুতে সেই কৃতী বাঘ বিস্মৃতির পথে পা বাড়ায় অথচ মানুষ লিখে রাখে তার অতীত । নিজে না লিখলে অন্য কেউ লিখে দেয়।

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়