সুইসাইডের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এবার কিছু হিসেব মেলানো বাকি সঙ্গে খুঁজতে হবে কিছু উত্তর। মৃত্যু ভয়কে জয় করতে পারলে পৃথিবীতে অনেক কাজই সহজ হয়ে যায়। আর তাই ভবঘুরের মতোই রাস্তায় রাস্তায় আজ পুরো ৩ দিন পার হয়ে গেলো নন্দিনীর। কি সহজেই সাজানো জীবনটা বদলে গেলো না সেদিন! তার জন্মের আগেই তার বাবা চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। মায়ের মুখে গল্প শুনেছে, তার বাবা ছিলেন একজন সৎ, আদর্শবান এবং নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসার। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে তিনি কখনও আপোষ করেন নি। একদিন এক ঝড়বৃষ্টির আঁধার রাতে তার বাবাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে বাড়ির সামনেই ফেলে রেখে যায় সন্ত্রাসীরা। মায়ের মুখে এসব গল্প শুনে কান্নায় তার চোখ ভিজে যেত। বাবার আদর স্নেহ যে কিরকম তা বোঝার সৌভাগ্য তার কখনও হয়নি। তার বাবাকে সে বাবা বলে ডাকার সুযোগ পায়নি। একদিন সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, সে বড় হয়ে বাবার মতো পুলিশ অফিসার হবে। আর তার বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে নিজ হাতে হত্যা করবে।
বাবার মৃত্যুর পরে অল্প কিছুদিন তার চাচা এবং মামারা তাদেরকে কিছুটা সাহায্য করেছিলো। কিছুদিন পর থেকে তারাও খোঁজ খবর নেওয়া বন্ধ করে দেয়। স্বামীর পেনশনের সামান্য কিছু টাকা দিয়ে মা মেয়ের সংসার সামলাতে না পেরে তার মা অনেক কষ্ট করে একটি সেলাই মেশিনের ব্যবস্থা করে। পেনশনের কিছু টাকা আর সেলাই মেশিন চালিয়ে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তাদের সংসার মোটামুটি ভালোই চলতে থাকে।
হঠাৎ একদিন নন্দিনীর মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন সে ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে মাত্র। অনেক কষ্টে মাকে সে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার বলেন তার মায়ের স্ট্রোক হয়ে গেছে এবং তাঁর শরীরের ডান সাইড পুরোটা প্যারালাইজড হয়ে গেছে। সেই সাথে তিনি কথা বলার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। ডাক্তারের পরামর্শ মতে নন্দিনী তার মাকে নিয়ে বাসায় চলে আসে।

এমতাবস্থায়, মায়ের চিকিৎসা, নিজের পড়ালেখা আর সংসারের অন্যান্য খরচ তার একার পক্ষে চালানো পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার চারদিকে অন্ধকার নেমে আসে। এখন সে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। সে সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাস নাইনে সে আর ভর্তি হবে না। পড়ালেখা ছেড়ে দিবে। দিন যত পার হতে থাকে তার মায়ের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে।
এভাবে চলতে চলতে একদিন তার বাবার পেনশনও বন্ধ হয়ে যায়। তখন নন্দিনী একদম দিশেহারা হয়ে পড়ে।
নন্দিনী তখন ঠিক ১৬ বছরে পা দিয়েছে। ধীরে ধীরে তার চেহারার মাধুর্য বাড়তে থাকে। সে লাবন্যময়ী হয়ে ওঠে। তার গায়ের রঙ দুধে আলতা, এলো কেশ, চোখদুটি টানা টানা। তার এলাকার বখাটে ছেলেরা তাকে বিভিন্নভাবে উত্তক্ত করার চেষ্টা করে, কুপ্রস্তাব দেয়৷ একদিন একজন খারাপ প্রকৃতির লোক এসে তাকে একটা কাজের প্রস্তাব দেয়। সে বলে,” নন্দিনী তোর কষ্ট আমি বুঝি। তোর কষ্টে আমারও কষ্ট লাগে। তুই চাইলে আমি তোরে একটা কাজ জোগাড় করে দিতে পারি”। নন্দিনী তার মায়ের দিকে তাকায়। দেখে তার মায়ের চোখে পানি। তিনি হয়তো বুঝতে পারেন নন্দিনীকে কি ধরনের কাজ করতে হবে। বুঝেও তাঁর কিছু করার সাধ্য নাই, কিছু বলারও সাধ্য নাই। সবকিছু ভেবে নন্দিনী লোকটার প্রস্তাবে রাজি হয়। সে অবশ্য তখনও বুঝতে পারে না তাকে কি করতে হবে।
রাতে মাকে ভাত, ওষুধ খাওয়ানোর পর ঘুম পাড়িয়ে সে বেরিয়ে পড়ে কাজের উদ্দেশ্যে। সে চলে যাবার পর তার মা আরো ছটফট কর‍তে থাকে। লোকটি নন্দিনীকে নিয়ে যায় একজন মহিলার কাছে। মহিলা তাকে দেখে লোকটাকে বলে,” বাহ! মালটা তো ভালোই এনেছিস। সুন্দরী আছে। এরে দিয়েই ব্যবসা জমবে। কাস্টমারদের কাছ থেকে যত ইচ্ছা কামানো যাবে।” নন্দিনী তখন কিছুটা বুঝতে পেরেছে তাকে কি কাজ করতে হবে। অনেক অসহায় বোধ হচ্ছিলো তার। মনে হচ্ছিলো, এক দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে। সেই মূহুর্তে তার অসুস্থ মায়ের চেহারাটা ভেসে ওঠে তার সামনে। তাই সবকিছুই স্বাভাবিকভাবের মতোই মেনে নিতে বাধ্য হয় সে। কিছু সময় পর লোকটি সেখান থেকে বিদায় নেয়। নন্দিনীকে একটি রুমে নিয়ে গিয়ে সুন্দর একটি শাড়ি আর কিছু সাজগোজের সামগ্রী দেয় মহিলাটি আর বলে,” নে এগুলা পরে সুন্দর করে রেডি হ। প্রথম প্রথম কষ্ট হলেও পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর শোন, কাস্টমারকে খুশি করতে না পারলে কিন্তু একটা টাকাও পাবি না।”

সে রেডি হবার কিছুক্ষণ পর একটা মাতাল লোক রুমে প্রবেশ করলো। তারপরের স্মৃতিটা তার জীবনের সবথেকে দুর্বিষহ স্মৃতি। কষ্টে তার বুকটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। সে চিৎকার করে কাঁদতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো। মাতাল লোকটি রুম ছেড়ে বাইরে গিয়ে মহিলাটিকে বললো,” জব্বর জিনিস দিছো আপা, জব্বর জিনিস। একদম ফ্রেশ। খুশি করে দিছে আমাকে। হা হা হা”। নন্দিনী একরকম তার জীবনের বাস্তবতাকে মেনেই নিলো। তার মাকে সুস্থ করে তুলতে হবে। সেজন্য সে যেকোনো ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে নন্দিনী সেখান থেকে বের হলো মায়ের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বের হবার আগে মহিলাটি তাকে কিছু টাকা দিলো আর বললো,” অনেক ভালো কাজ করছিস, কাস্টমার খুশি আর আমিও খুশি। এইনে ধর কিছু টাকা। কালকে আবার আসিস আরো বেশি টাকা পাবি।” কিছু ওষুধ আর খাবার নিয়ে নন্দিনী বাড়ি এসে পৌছালো। অনেক হাসিখুশি মনে সে তার মাকে ডাকলো। মা কে সে বুঝতে দিতে চায়না তার জীবনে কি ঘটে গেছে। বার বার সে তার মাকে ডাকে অথচ মায়ের কোনো উত্তর নেই। সে তার মায়ের কাছে এসে তার শরীরে হাত দিতেই দেখে শরীরটা হিমশীতল হয়ে আছে। পরোক্ষণেই সে টের পেলো, তার মা আর নেই। পৃথিবীতে তার একমাত্র আপনজনও আজ চলে গেলো চিরদিনের মতো। সর্বহারা নন্দিনী তখন হাসতে শুরু করলো, দেখে মনে হতে পারে সে দুনিয়ার সব থেকে সুখী মানুষ। তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো স্মৃতিতে ভাসছে। আর সে হাসছে আর হাসছে। সেই হাসিতে আনন্দ, উৎসবের সুর বাজে না, ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে কষ্টের করুণ সুর।
তার পর থেকেই নন্দিনী ঘর ছাড়া। রাস্তায় রাস্তায় পুরো ৩ টা দিন পার করে ফেলেছে। তার বাবার মতো পুলিশ অফিসার হবার স্বপ্নটা আজ দুঃস্বপ্ন। জীবনটা তার কাছে অর্থহীন। তার জীবনের একটা হিসেব নেওয়া বাকি শুধু। বাবার হত্মাকারী সেইসব পাষণ্ডদের নিজ হাতে হত্যা করে সব হিসেব শেষ করতে চায় সে।

তারপর সুইসাইড করবে নন্দিনী, তার কাছে অর্থহীন এই দুনিয়াটা ছেড়ে চলে যাবে অজানা শহরের পানে চিরদিনের জন্য।

রাজন হোসেন
জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here