লাইব্রেরির পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে যখন তীব্র শব্দে প্রান্তিকের ফোন বেজে উঠলো তখন চারপাশের সবাই তার দিকে তাকালো।লাইব্রেরিয়ান এর তাকানোর ভঙ্গিতে তার মনে হলো প্রাচীন যুগের সাধুরা এই দৃষ্টিতেই পাপীদের ভস্ম করে দিতেন। প্রান্তিক নিজেও হকচকিয়ে গেছে।শব্দটা যে তার পকেটেই হচ্ছে এটা বুঝতেই তার বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেছে। সে অতিদ্রুত ফোন বের করে কল কেটে দিলো। কে তাকে এই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে তাও খেয়াল করলো না।
প্রান্তিক আশেপাশে চোখ বোলালো।মোটামুটি সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে।তাদের চোখে স্পষ্ট বিরক্তি। শুধু কোনার এক চেয়ারে বসা এক তরুণী পাঠিকার চোখ বইয়ে নির্বদ্ধ।সে একবার ও প্রান্তিক এর দিকে তাকায়নি। হয়তো সে ফোনের শব্দ শুনতেই পায় নি।কারণ তার মুখ দেখে প্রান্তিকের ধারণা হলো মেয়েটির সম্পূর্ণ মনযোগ বইয়ের দিকে। মেয়েরা সাধারণত কোন উপন্যাস এতো মনযোগ দিয়ে পড়ে। কিন্তু এই মেয়েটি পড়ছে ইউভাল নোয়া হারারি-র “সেপিয়েন্স”নামের বই। প্রান্তিক ও এই বই পড়েছে।মানুষ এর ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধ। তার কাছে খুব একটা ভালো লাগেনি। কিন্তু মেয়েটা অত্যন্ত আগ্রহ করে পড়ছে।
একটা মেয়ে খুবই মনযোগ দিয়ে বই পড়ছে এই দৃশ্য দেখতে প্রান্তিক সাত মিনিট কাটিয়ে দিলো। এবং মেয়েটিকে চিনতে পারলো। একে সে আগে কয়েকবার ক্যাম্পাস এ দেখেছে।তার জুনিয়ার, সম্ভবত থার্ড ইয়ারে পড়ে।তবে প্রান্তিক কিছুতেই নাম মনে করতে পারলো না।তার মনে হলো সে কখনো মেয়েটার নাম কখনো শোনেইনি। এই মেয়ে শুধুই তার মুখচেনা।

দেখতে দেখতে মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো। বইটা হাতে নিয়ে সে লাইব্রেরিয়ান এর কাছে গেলো। নিচুগলায় খানিকক্ষণ কথা বলার পরে সে বেরিয়ে গেলো। প্রান্তিক কিছু না ভেবেই তার পেছনে গেলো। বাইরে সিঁড়ির মাথায় গিয়ে মেয়েটিকে ডাকলো। “এই যে শোনো।” মেয়েটি ফিরে তাকালো।বিস্মিতভাবে বললো,“আপনি আমাকে ডেকেছেন?” প্রান্তিক হালকা হেসে বললো,“হ্যা তোমাকেই ডাকছি।এখানে তো আর কেউ নেই।” “হ্যা বলুন, কী বলবেন।” ঝোঁকের মাথায় ডেকেছে ঠিকই, কিন্তু কী বলবে তা সে সে নিজেই জানে না।কিছুক্ষণ ভেবে বলার কিছু না পেয়ে বললো,“কেমন আছো তুমি?” মেয়েটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রান্তিক এর হঠাৎ মনে হলো এভাবে পেছনে চলে আসাটা এবং ডাকাটা খুবই বোকামি হয়েছে।সে মনে মনে বলার মতো কথা খুঁজতে লাগলো। মেয়েটি তখন শীতল গলায় বললো,“অপরিচিত মানুষজনকে আপনি বলে সম্বোধন করা একটা সাধারণ ভদ্রতা, এটা কি আপনি জানেন?” প্রান্তিক রীতিমতো বোকা বনে গেলো। ক্যাম্পাসের কোন জুনিয়র এর কাছ থেকে এরকম কথা সে একদমই আশা করে নি। যদিও এখন তারা ক্যাম্পাসের বাইরে আছে….তবুও। সে অপ্রতিভভাবে বললো,“আসলে আপনি আমার ক্যাম্পাসের জুনিয়র তো,তাই আপনি বলেছি। বুঝতে পারি নি আপনি রাগ করবেন।” মেয়েটি দারুণ অবাক ভাবে বললো,“ক্যাম্পাসের জুনিয়র মানে? আপনি আমাকে চেনেন?” এবার প্রান্তিক মনে মনে হাসলো।সে ভাবলো এই মেয়েটি তাকে চিনতে পেরে ইচ্ছা করেই ভান ধরেছিল। বেচারি বুঝতে পারেনি প্রান্তিক ও তাকে চিনে ফেলেছে। প্রান্তিক কৌতুক এর স্বরে বললো, ”জ্বি আমি আপনাকে চিনি।আশা করি আপনি ও আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এ আপনার দুই ব্যাচ সিনিয়র।” মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,“জনাব হবু ডাক্তার, আপনার একটা ভুল হয়েছে।আমি মেডিকেল এর স্টুডেন্ট নই।” বলে এক মুহূর্ত ও অপেক্ষা না করে চলে গেলো।

চলবে…..

আতিকা খান ইরা
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড রিসার্চ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here