আমার স্বল্পদিনের দীর্ঘ জীবনে একটা উজ্জ্বল কাজ শেষ করেছি। এই কাজের ভ্রমণটা আমার সেদিন থেকে শুরু যেদিন টের পেতে শুরু করলাম ঈশ্বরের বানানো কোনো সঙ্গীই আমায় টানেনা। আমার কল্পনার সাথে ঈশ্বরের এই ব্যবধানে সত্তাগত একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আমার বন্ধুরা যখন রেডিমেড সঙ্গী নিয়ে ভ্রমণ করে, তখন আমার ভেতর জানতে চাইতো, ঈশ্বর ওদের কল্পনা বোঝে অথচ আমার সাথে তার বিরোধ কোথায়! ধীরে ধীরে ওদের ক্রমাগত বহুগামিতা দেখে- আমার ভাবনায় বোধের ফুল ফুটলো। সে ফুলের সুবাসে টের পেতে থাকি- মূলত ওগুলো সবই ঈশ্বরের একক কল্পনার অবয়ব এবং বহুগামি চিন্তার ছায়া। সেদিন থেকে আমি কল্পনা করতে থাকি আমি কেমন সঙ্গী চাই; নিজের করে। শিল্পী হিসেবে সেদিনই আমার আত্মযন্ত্রণার জার্নি শুরু হয়েছে। সে জার্নির প্রথম ধাপ শেষ হলো। রঙের শেষ আচড়ে এঁকেছি পায়ের গোড়ালিতে একটি ডিবডিবে কালো তিল।

আমার মন চোখকে সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে; ঘুরছে ফিরছে মৃৎ শিল্পীদের হাতে হাতে। অবশেষে চোখ আটকায় পূর্ব পরিচিত এক মাটি প্রেমিকের হাতে, নাম পুরোহিত। মাটির উপর তার যথেষ্ট দখল আছে।

আমার দীর্ঘ কল্পনার সব বলে যাচ্ছি, আর পুরোহিত চোখবুজে গোগ্রাসে সব গিলছে। পুরোহিত নিরবতাকে একটু আলাদা করে রেখে আমাকে বললো- ঠিক আছে কাজটা আমি করবো। আমার মগজে চিন্তা পরিণত হতে সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে। এর পর একটা নকশা এঁকে তোমাকে পাঠাবো। আমি বললাম ঠিক আছে পুরোহিত। আমি আমার দিকটা পরিষ্কার করে বলি দেখেন ঈশ্বরের সাথে আমার বিরোধের জায়গাটা এ প্রজন্মের প্রায় সকলে জানে- আপনিও নিশ্চয়। এটা নিয়ে কাজ করতে হলে আপনাকেও অঈশ্বরের মতো নির্লোভ-নির্লিপ্ত হতে হবে। এর কোনো হেরফের যাতেনা হয়। পুরোহিত চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।Related image

এখন আমি চুপ। নিজেকে পৃথিবীর প্রথম মানুষ মনে হতে থাকে যার সঙ্গীর প্রয়োজনে যে শিল্পী হয়ে ছিলো। তার কল্পনার কার্বন কপি ঈশ্বরকে আরো একটি শিল্প বানানোর যোগান দিলো। কল্পনা প্রসূত শান্তিতে আমার ভেতর একটি ঠাণ্ডা হওয়া দৌড়াদোড়ি করছে। একদলা অন্ধকারে আমরা ঝাপটা ঝাপটি টের পাচ্ছি। দূরে কোথাও আলো নেই যা ভেতর থেকে কেবলই বেরিয়ে গেলো। আলোর দূরত্ব সাত দিনের; পুরোহিতের বলা সে সাত দিন। এই দীর্ঘ সাত দিনের অবসরে আমার গলিতে প্রশ্নজাগে কেনো শিল্পী তার নিজের আলোয়ে ছায়া সাজায় আলোর দলায়? কেনো তড়পায় কল্পিক ছায়ায় সঙ্গীর কপালে চুমু আঁকতে কিংবা পায়ের গোড়ালির তিল দেখতে! আমি উত্তর খুঁজে নিজেকে ক্লান্ত করতে চাইনা। এবার প্রশ্নের আনন্দে ডানা মেলে পুরোহিতের হাতে চোখ রাখার সময় ঘনিয়ে আসছে।

সপ্তা পেরুতেই পুরোহিত একটা ছবি মেইল করেছে। চমৎকার টানটুন; মানে আমার কল্পনার প্রতিটি পিক্সেল কাগজে সেঁটে দিয়েছে। আমি দৌড়ে পুরোহিতের কাছে গেলাম।বললাম নেন কাজ শুরু করেন। মাটি আর বিশেষ কিছু অঙ্গে তুলা ব্যবহার করার কথা আগেই পুরোহিতকে বলা আছে। তার এ ধরণের কাজ এই প্রথম, তারপরেও আমার বিশ্বাস সে পারবে। ভেতরে প্রশ্ন জাগছে যে কবে শেষ হবে কাজ! মুখে প্রশ্ন আসার আগেই পুরোহিত বললো যে তোমার চেহারায় অস্থিরতা কেনো! কবে শেষ হবে সে তাড়াই তো! একটু সময় লাগবে, অন্তত পনেরো দিন।

আজ রাতে তারাদের সাথে আড্ডা দেয়ার ক্ষণ, সাথে সেই চিত্র যার পায়ের গোড়ালিতে ডিবডিবে কালো তিল। আজরাতে, ঘুমে কিংবা জাগরণে যেনো তিলেতিলে আমার আঁধারের ছটপটানিতে আলোক রেণু উড়াউড়ি করছে। শৈল্পিক যন্ত্রণা এতো মধুর কী করে হয়! এ যেনো স্বর্গ তার ভেতরে একাকিত্ব। আমার ভেতরে একাকিত্ব থেকে মুক্তির তাড়া। এসব স্বর্গটর্গ আমার সয়না।আমি হতে চাই স্বর্গ বিতাড়িত একগুচ্ছ অন্ধকারের কোলে নিক্ষিপ্ত প্রান। যে অন্ধকার কালো তিলের ক্রমাগত-স্বাধীনতার সঙ্গী। যেখানে ঠোঁটের উল্টা পিঠে লেগে থাকা ঠোঁট দেখে শামুক ভেবে ফিরেও চাইবেনা নীল চোখ কোনো।

জীবনের দীর্ঘ তম যন্ত্রণার পথ ঠেলে পৌঁছাই অপেক্ষার দুয়ারে; বলি পৌছে দাও নিকটবর্তী কারো কাছে। আমার নিজস্ব আলোর কাছে নিয়ে চলো, যার পাশে পুরোহিতের আনাগোনা। সময় আর কতো ধীরে বইবে বলো! এমন করে একে একে পনেরোটি রাত হেলে পড়ে সকালের কোলে।আমি ছুটে যাই পুরোহিতের কাছে। সে নির্বিকার। তার গড়ি মসি ফিরিয়ে দেয় আমাকে; আমি ফিরে আসি নতমুখে, লাল চোখে। আবার যাই, কোনো প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনা। তেমন কোনো কথাও নেই মুখে। আমি চিন্তায় পড়ি, চুল টানি, বাসায় ফিরি। রাতে চোখ বন্ধ করতে পারিনা; পুরোহিতের লাল চোখ দুটো ভেসে উঠে।নানান রকম চিন্তা করা যায় এ সময়ে, আমি তাই করি ইতিবাচক, নেতিবাচক কোনোটাই বাদ যাচ্ছে না।চিন্তা করার অবসর আপনাদেরও আছে, ভাবুন না প্লিজ!

এতো কিছুর পরেও রাতে কোকিল ডাকলে আমার মনে পড়ে কালো তিলের কথা। আমি ভীষন একা হয়ে যাই।শিল্পীর মতো উসকু খুসকু একা।
আমাকে আবার যেতে হয়। রেগে মেগে আগুন রঙা চোখ নিয়ে পুরোহিতের কাছে যাই। শান্ত-ধীর গলায় রাঙা চোখ নিয়ে জিজ্ঞেস করি কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? আমার চোখের খোঁচায় কিছুটা কেঁপে উঠে পুরোহিত চোখের কোণে, তার আগুন বেড়ে চলছে। আমি জানিনা, এই আগুন প্রেমের নাকি ক্রোধের! হতে পারে ব্যর্থতারও। আমিআরো দু’কদম এগিয়ে ফের প্রশ্ন করলাম। শুধু আঙুলের ইশারা বলেছে, ঐদিকটায় যেতে। আমি এগিয়ে যায় সুন্দর কাপড়ে ঢাকা বস্তুটি লক্ষ্য করে। কাপড়ের ফাঁকগলে দেখা যাচ্ছে পায়ের গোড়ালির কালো তিল।আমার হাত পা কাঁপছে। ধীরে ধীরে কাপড় সরিয়ে দিচ্ছি আর মুক্ত হচ্ছে আলো। বাহ পুরোহিত দারুণ বানিয়েছে। আমার পাশেই যেনো কেউ একজন জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে, আমার শরীরে বিঁধে যাচ্ছে।আমার নিজস্ব আলো আমার সামনে দাঁড়িয়ে তুলতুলে ঠোঁট জোড়া কাছে ডাকছে আমায়। আমি আরো এগিয়ে যাই, বুকের সাথে কান লাগাই। নিশ্বাসের শব্দ প্রকোট হয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে। আমি এসব কানে তুলিনা। আমি শুধু আমার ঠোট জোড়া ঠেলে দেই আরো কাছে আরো গভীরে। ঠিক সে সময়ে আমার পিঠে ঘ্যাচ করে ঢুকে গেলো ধারালো কিছু, হয়তো চাকু। চোখ বন্ধ হয়ে আসার আগে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি পুরোহিতের লাল চোখ, একটানা চেয়ে আছে ঈশ্বর।

মারুফ কামরুল

লেখক