মেয়েটি চলে গেলে প্রান্তিক বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো মিনিটখানেক।। তারপর লাইব্রেরির ভেতরে গিয়ে লাইব্রেরিয়ানকে মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করলো। কিছুক্ষণ আগে লাইব্রেরিয়ান আর ঐ মেয়েটির কথোপকথন এর ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল তারা পূর্বপরিচিত।মেয়েটি হয়ত এখানে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে।

নাম জানতে চাওয়ার কারণে লাইব্রেরিয়ান মহোদয় প্রান্তিক এর দিকে অত্যন্ত রাগী দৃষ্টি হানলেন এবং তাকে অত্যন্ত বেয়াদব ও অভদ্র ছেলে হিসেবে আখ্যা দিলেন। রাস্তায় নেমে এসে প্রান্তিক কিছুক্ষণ মনে মনে হাসলো। ছোটবেলা থেকে আত্মীয়স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে “ভদ্র ছেলে” হিসেবে পরিচিত প্রান্তিক মাহমুদ আজ লাইব্রেরিতে এসে দুজন মানুষের কাছে অভদ্রতার জলজ্যান্ত প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হলো।

ডাক্তার ইকবাল মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী ডাক্তার মিলি রাহমানের পরিচয় হয়েছিল মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে।ইকবাল সাহেবের বাবা তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন, ডাক্তার হতে না পারলে তাঁকে পিতৃগৃহ ছাড়তে হবে।সে হুমকির কারণে তিনি এতোটাই নার্ভাস ছিলেন যে ঠিকমতো পড়ালেখাই করতে পারেননি। বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হবে এই কথা নিশ্চিতভাবে জেনেই তিনি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু হলে গিয়ে মিলি নামের এক মেয়ের সাথে দশ মিনিট কথা বলে কী জানি কী হলো, তাঁর মনের সব ভয় কর্পূর এর মতো উড়ে গেলো। তারপর ইকবাল সাহেব চান্স পেলেন এবং তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হলো না। কিন্তু তাঁর মনে হল ডাক্তার হয়েই বা লাভ কী! মিলির সাথে যোগাযোগ এর কোন রাস্তা নেই।সে চান্স পেলো কি না তাও জানা নেই।এ জীবন তো অর্থহীন। তারপর যখন পড়তে গিয়ে দেখলেন মিলি নামের সেই তরুণী তাঁর সহপাঠীনি- তখন তিনি কিছুদিন অতি আনন্দে ঘুমাতেই পারেননি।

ইকবাল সাহেব বর্তমানে নিজের ছেলেকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। এমবিবিএস শেষের দিকে।অথচ সে এখনো কাউকে জোটাতে পারেনি।এরপরে যখন আরো ব্যস্ত হয়ে পড়বে তখন কি এসব নিয়ে ভাবার সময় পাবে!! ইকবাল সাহেব অবশ্য পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, নিজের পাত্রী নিজে খুঁজবি। আমাদের আশায় থাকলে সারাজীবন চিরকুমার হয়েই থাকিস। বিয়ে করতে হবে না।

রাতে খেতে বসে মিলি প্রান্তিককে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ লাইব্রেরিতে যাবি বলেছিলি। গিয়েছিলি?”

“হ্যা।” “বই যেটা খুঁজছিলি সেটা পেয়েছিস?”

প্রান্তিক বই খোঁজার তেমন সুযোগ পায়নি। লাইব্রেরিতে ঢোকার দুই-তিন মিনিট পরেই তার ফোন বেজে ওঠে। তারপর সেই মনযোগী পাঠিকার চক্করে সব গণ্ডগোল হয়ে গেছে। “না বই পাইনি। তবে একটা মেয়েকে পেয়েছিলাম। তার সাথে কথা বলতে গিয়েই তো আর বই খোঁজা হলো না।” বলেই সে বাবার দিকে তাকালো।

ইকবাল সাহেব উৎসাহী ভাবে বললেন,“মেয়েটার সাথে কী কথা হলো?”

প্রান্তিক দুঃখিত স্বরে বললো,“কথা আর হলো কই।সে তো আমাকে পাত্তাই দিলো না।উল্টে আমাকে অভদ্র, অসভ্য, ইতর, ছোটলোক এসব বললো।”

ইকবাল সাহেব স্ত্রীকে বললেন, “আমি আগেই জানতাম তোমার ছেলে একটা অপদার্থ। এর দ্বারা কিচ্ছু হবে না।নিশ্চয়ই উল্টাপাল্টা কিছু বলেছে। যার কারণে এসব শুনেছে।”

এবারে মিলি ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ”তুই খেতে বসে এতো মিথ্যা কিভাবে বলিস?” আর স্বামীকে বললেন,“অপদার্থ ও না। অপদার্থ হচ্ছো তুমি।ছেলে যা বলে তাই বিশ্বাস করতে হবে? মানুষ একটা কথার ভাবেও তো বুঝে সেটা সত্যি না মিথ্যা। আশ্চর্য!!”

ইকবাল সাহেব অগ্নিদৃষ্টিতে প্রান্তিক এর দিকে তাকিয়ে আছেন। মিলির খাওয়া শেষ, তিনি এক্ষুণি উঠে পড়বেন। তিনি উঠলে ইকবাল সাহেব অনিবার্যভাবে প্রান্তিক এর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। প্রান্তিক খাওয়া অসমাপ্ত রেখেই মানে মানে কেটে পড়লো।

চলবে…..

আতিকা খান ইরা
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড রিসার্চ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here