প্রচুর রচনা বেরোচ্ছে বাংলা ভাষায়, প্রবন্ধ, প্রতিবেদন ও পদ্যের সংখ্যা অজস্র, সেবাগ্রাহক বা পাঠক সে তুলনায় সন্তোষজনক বোধ করি না আমি। বাংলাভাষায় জ্ঞানচর্চা কেমন হচ্ছে? উচ্চশিক্ষার অধিকাংশ বিভাগের অনিবার্য ভাষা ইংরেজি। আজও বাংলা ভাষায় উন্নত যুগোপযোগী পাঠ্যপুস্তকের অভাব ঘোঁচেনি। আমি বলছি না যে, বাংলাভাষায় অভিসন্দর্ভ, গবেষণাপত্র অথবা ভালো মানের তথ্যবহুল পুস্তক লেখা হচ্ছে না। তবে অনুবাদের নামে যে বইগুলো পাওয়া যায়, অন্তত তার চেয়ে মূল ভাষায় না পড়া গেলেও ইংরেজির ন্যূনতম জ্ঞান নিয়ে ইংরেজিতে পাওয়া বইগুলো পড়ে সহজে বোঝা যায়। ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হলে সেটা গর্ব করে বলা যায়। এমনকি বিভিন্ন public university গুলোতে English accent এ বাংলা বলা শিক্ষার্থীর সংখ্যা শুধু বাড়ছেই না। তাদের সমাদর করা হচ্ছে । উল্টো যদি কেউ বাংলায়, আবারও উল্লেখ করি, বাংলায় কথা বলে, তাদেরকে নিয়েই বিদ্রূপ করা হচ্ছে । এই বিদ্রূপকে বৈধতা দিতে কিছু ‘জ্ঞাননির্মাতা’ বিদেশ থেকে কিছু শব্দ , পদ , বা জটিলতাকে আমদানি করেছে, যেমন, কিছু ‘পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থী’ জনসমক্ষে নির্দ্বিধায় ঘোষণা দেন যে, বাংলা আমার মাতৃভাষা নয়! আমার মা যা বলেন, তাই আমার মাতৃভাষা! কিছুই না , আমদানি করা জটিলতামাত্র, নিজের অপারগতা, অজ্ঞতা আর শঠতাকে আড়াল করার কৌশল। বরং এই প্রশ্ন অধিকতর সঙ্গত যে, আমাদের রাষ্ট্রভাষা কি বাংলা ? বাংলা জানলে পথের ধারের সব দোকান কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম পড়া যায় না, চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে বাংলা কষ্টে খুঁজে পাওয়া যায়, এমনকি কিছু জানতে চাইলে সেটার জন্যেও অন্তত ইংরেজি শিখতে হয়। ভাষা প্রশ্নে প্রবন্ধ বহুদিন ধরে লেখার প্রয়োজন বোধ করছি। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের কদর নেই, তার চেয়ে বরং গেলা-উগলানো অর্থাৎ বমি করা-দেখানোকে বেশি কৃতিত্ব দেয়া হয়। এদেশে অভিসন্দর্ভের খুব কদর। যত উদ্ধৃতি তত মূল্য, যত বেশি উৎস থেকে উদ্ধৃতি তত কৃতিত্ব , কিন্তু সংকট আমার আজকের, তা কি অন্যের অন্য সময়ের কথায় সমাধান করা যাবে? না আমাকে আগে আমার মূল সমস্যাটা খুঁজে বের করতে হবে? ভণ্ড, ভণ্ডতর,ভণ্ডতমতে ভরে উঠেছে দেশটা। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের কাব্যগ্রন্থের যে নাম , ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, আজ তেত্রিশ বছর পর সত্যিই সব কিছু তেমন নয়? যাই হোক ‘বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র’ হুমায়ুন কবির (হুমায়ুন আজাদ ছদ্মনামেই সমধিক প্রখ্যাত) তার গ্রন্থে বেশ ভালোভাবেই শনাক্ত করেছেন। এ দেশে সংস্কৃত , পালি পড়ানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, কিন্তু হিব্রু পড়ানো হয় না, এর উত্তরটা আমাদের কাছে যেটা আছে, তা হলো বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত ও পালির নিবিড় সম্পর্ক আছে। কিন্তু হিব্রু না থাকলেও ফার্সি এদেশের কিছু ‘উন্নাসিক’ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরের বিভাগ হিশেবে খুলে রেখেছে, ফার্সিতে মহাকাব্য আছে । তাদের সাহিত্য এত সমৃদ্ধ যে তা মেনে নেয়া চলে । কিন্তু উর্দু? জানি , অসম্ভব সুন্দর কিছু গযল আমার কানে এসেছে এছাড়া তাদের সাহিত্য সম্ভার অনুপেক্ষণীয়। কিন্তু সে হিশেবে ফার্সি সংস্কৃতের ধারে কাছেও উর্দু নেই! যদিও সাহিত্যের তুলনা বা শিল্পের তুলনা এভাবে করা চলে না! তবে মোটা দাগে স্পষ্ট পার্থক্য ফুটে উঠলে সেটা উপেক্ষা করা শিল্পসমালোচকদের দায় এড়ানোমাত্র আমাদের দেশে কিছুদিন আগেও চলচ্চিত্রের হাতে আঁকা পোস্টার পাওয়া যেতো, এমনকি রিকশার পেছনে ছবি আঁকা থাকতো ,‌সেসবের চিত্রশিল্পীর হস্তনৈপুণ্য অতুলনীয় হলেও নিশ্চয় পল গঁগা বা ভ্যান গখের masterpiece এর সঙ্গে তাদের তুলনায় আপনি বাঁধ সেধে বলবেন না যে দু’টো শিল্পের তুলনা হয় না! না, উর্দু মোটেও বাংলার শত্রু নয়! এমনকি ১৯৫২ তেও ‘পাক ছার জামিন ছাদ বাদ’ গাওয়া বাঙালিরা যে, না বুঝে ভূতের মন্ত্র আওড়ায় এটা করাচি বা ইসলামাবাদের রাজনীতিবিদগণ কল্পনাও করতে পারতেন না! কেননা অনেক পূর্ব পাকিস্তানি নেতা পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের সাথে দিব্যি উর্দু তে কথা বলতেন। আপনাকে দুর্বল করে দেয়ার সবচে প্রধান পথ হ’ল আপনার ভাষাকে আঘাত করা। গ্রামের মানুষ সচরাচর দিব্যি তাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, শহরে এসে যেই ধোপদুরস্ত কেরানিদের সংসারে দাঁড়ায় , লক্ষ্য করে তার ভাষার কারণে উপহাসের স্বীকার হচ্ছে। দক্ষিণ পূর্বের কোন জেলার লোকজন যে প কে ফ বলেন এই নিয়েও How funny ! Funny নিয়ে আমি কি করবো ? বলে অবশিষ্ট বাংলার লোক উপহাস করেন। এভাবে ভাষাকে আক্রমণ করেই কিন্তু মানুষকে হীনমন ও দুর্বল করা যায় আবার উত্তরবঙ্গের ভাষা বুঝলেই ‘মঙ্গা এলাকা থেকে এসেছো?’ বা মনে মনে তোমার মগজ তো চতুষ্পদ প্রাণীর মত ভেবে নেয়াতেও ভাষার ভূমিকা ব্যাপক। যে লোকগুলো গ্রাম ভুলে শহুরে হন, তাদের ভাষা কিন্তু রীতিমত তার ঐ গ্রামের বা অঞ্চলের আঞ্চলিকতার প্রায়প্রভাবমুক্ত হয়ে ওঠে। এদেশে বিদেশি খাবার আর পোশাকের এত কদরের অনেক কারণ হতে পারে তার বৈদেশিক নাম! আমাদের ভাষার মানোন্নয়নে প্রায় দুশ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে কেবল এটা জানানোর জন্য কিছু বুদ্ধিজীবী কলাম লিখে দায়মুক্ত হতে পারেন। কিন্তু বাংলাভাষার মূল শত্রু যে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বায়ন তার সমাধান কী করে হবে? যদি অন্যের কাঁধে চড়ে ছুটে চলার সুযোগ থাকে , তবে কে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইবে? এখনকার যত ক্ষতি হয় হোক কষ্ট করে একবার সর্বস্তরে বাংলা চালু করা গেলে আর উচ্চ মাধ্যমিকের পর বাংলা ভাষা সহযোগেই উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা গেলে তাতে কেবল বাংলা ভাষার লাভ হবে না। জাতি হিশেবে বাঙালিদের অনেক উন্নতি আসবে । তবে সেটা দীর্ঘমেয়াদে প্রথমদিকে কিছু ত্যাগ বা কষ্ট স্বীকার করে নিতে হবে।

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here