বইয়ের নামঃ স্বপ্ন,মৃত্যু, ভালোবাসা

লেখকঃ এরিক মারিয়া রেমার্ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা এ উপন্যাসটি প্রথমে বিক্ষিপ্তভাবে ফ্রন্টলাইনের বেশ কয়েকজন সৈনিককে নিয়ে শুরু হলেও কিছুদূর যাবার পর আর্নেস্ট গ্রেবার নামক একজন সৈনিকের উপর ভর করে এগিয়ে চলে কাহিনী। আদতে সব সৈনিকের গল্পগুলোই মোটামুটি একই রকম। ফ্রন্টের জীবন বলতে শুধু বেঁচে থাকা আর অন্যকে মারার চিন্তা।ঘুম কিংবা খাবার জন্য অতিরিক্ত ভাবনা করা এখানে বিলাসিতা। এখানে লাশের হিসাব হয় সংখ্যা দিয়ে৷ হার জিতের হিসাব লাশের সংখ্যা দিয়ে।ক্বচিৎ কদাচিৎ যদি একটু ভিন্ন চিন্তার অবকাশ পাওয়া যায়,তাহলে স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে বিগত জীবনের নিরুপদ্রব, নিস্তরঙ্গ, শান্তিময় সময়ের সোনালী সুখস্মৃতি। বাড়িতে পরিবার কি অবস্থায় আছে, এ চিন্তা করার অবকাশও এখানে অল্পই পাওয়া যায়। কিন্তু এ যুদ্ধ কি? যুদ্ধ কাদের জন্য? কতিপয় রাষ্ট্রপ্রধানের আগ্রাসী নীতি আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সাথে সাধারণের মানুষের চাওয়া-পাওয়া আর চিন্তাভাবনার কতটুকু সাদৃশ্য? প্রজাপতিগণ তাদের নিজেদের চেয়ারে বসে যুদ্ধের ঘোষণা দিল আর অমনি দেশগুলোর সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীগুলো মেতে উঠলো একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায়! যে লড়াইয়ে কেউ জিতে না। মাঝখানে শেষ হয়ে যায় লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বপ্ন। একেকটা মৃত্যুর সাথে অসমাপ্ত এপিটাফের মত লেখা থাকে একেকটা স্বপ্ন আর ভালোবাসার গল্প।

এর মাঝেও নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখে আর্নেস্ট গ্রেবার। দীর্ঘ বছরগুলোর ব্যবধানে বহুল আরাধ্য ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরে যায়। যেখানে আছে তার বাবা,মা। যেখানে মিশে আছে তার স্বপ্ন আর ভালবাসা। কিন্তু যে প্রতিপক্ষ দেশের ধ্বংস করতে তারা মত্ত ছিল তারা ই বা তাদের ছাড়বে কেন! ফলে বাড়ি এসে দেখে তার দেশেরও লণ্ডভণ্ড অবস্থা। তার জার্মানি আর রাশিয়ার মধ্যে সে কোন তফাৎ খুঁজে পায় না। যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিভীষিকা দুই দেশকে এনে একই বিন্দুতে দাঁড় করায়। আশৈশব পরিচিত নিখুঁত শান্তিময় নীড়ের সাথে বর্তমান বিধ্বস্ত কাঠামোর কোন মিল খুঁজে পায় না। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ যে নিজের নিশ্বাস শুনে নিজেই নিজেই চমকে উঠতে হয়। মেঘের গর্জনকেও মনে হয় কামানের গোলার শব্দ। মূলতঃ “যুদ্ধ কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না” এই চিরাচরিত আপ্তবাক্যকে ধারণ করে উপন্যাসটির জন্ম। যেখানে লেখক যুদ্ধকালীন জীবনযাত্রার চালচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার আপাত নির্মোহ বর্ণনা, অনুপম ভাষা ব্যবহার আর সেই সঙ্গে লেখকের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশীল জীবন দৃষ্টি বইটিকে করে তুলেছে অসাধারণ।

 

হুসাইন মুহাম্মদ সিদ্দিকিন
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়