মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার কোন বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হয় না। সারা জীবন মনের ভেতর এক দ্বিধা থেকে যায়, যা দেখেছিলাম তা কি আদৌ ঘটেছিলো, নাকি পুরোটাই ছিলো ভ্রম? আমার জীবনেও এসেছিলো ঘটেছিলো সেরকম এক ঘটনা, আজ সেটাই বলবো।

সময়টা ছিলো ২০০৭, আমার বয়স তখন ১৪ বছর। আষাঢ়ের মাঝামাঝি হলেও, বৃষ্টির দেখা সচরাচর পাওয়া যাচ্ছিলো না। আমার আব্বা ছিলেন স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক আর আম্মা গৃহিণী। আষাঢ়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে আব্বা এক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চলে যান আমাদের বিভাগীয় শহরে, বাড়িতে তখন কেবল আমি আর আম্মা। একদিন মধ্যদুপুরে আমি যখন বসে আছি ঘরের বারান্দায়, তখন হঠাৎ করেই ১২-১৩ বছর বয়সী এক ছেলে প্রবেশ করে আমাদের বাড়ির উঠোনে। মলিন পোশাক পরা ছেলেটাকে দেখে খানিকটা বিভ্রান্ত মনে হচ্ছিলো। আমাদের বাড়ির চারপাশে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে আমি ঘর থেকে বের হয়ে তার দিকে এগিয়ে যাই।

“কে তুমি? কাকে চাও?” কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করি আমি।

“তুমি কে? তোমাকে তো আগে দেখিনি কখনো।” বিষ্মিত হয়ে উত্তর দেয় ছেলেটি।

“আমি নীরব। এটা আমাদের বাড়ি। তোমাকেই তো আগে কখনো দেখিনি!”

“তোমাদের বাড়ি? এটা তো সাবুদের বাড়ি!” বিষ্ময়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায় ছেলেটার।

“সাবু! সাবু আবার কে? আর তুমি কে সেটা বলছো না কেন?” – বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করি আমি।

“সাহাবুদ্দিন, আমার বন্ধু, সাবু বলেই ডাকি ওকে। আর আমি কলিমুদ্দিন, যদিও সবাই আমাকে কালু ডাকে।”

এবারে আমি অবাক হয়ে যাই। সাহাবুদ্দিন আমার বাবার নাম। তার বয়স প্রায় ৩৫ হবে, আর ১২-১৩ বছর বয়সী এক ছেলে কিনা বলছে সে আমার বাবার বন্ধু! বুঝতে পারলাম ছেলেটা নিশ্চয়ই ফাজলামো করছে। 

“ফাজলামো করছো, ইঁচড়েপাকা কোথাকার। আমার বাবা তোমার বন্ধু তাইনা। বাড়ি কোথায় তোমার, হ্যা? তোমার বাবার কাছে নালিশ দেবো আমি।” – রাগতস্বরে জবাব দিলাম আমি।

আমার কথা শুনে আরো অবাক হয় ছেলেটি।

“তোমার বাবা! সাবু কিভাবে তোমার বাবা হয়! কাল বিকালেও ও আর আমি একসাথে আম চুরি করলাম, আর আজ কিনা ও বাপ হয়ে গেছে! আর আমার বাড়ির কথা বলছো তো-” এখানে এসে হঠাৎ চুপ করে থেমে গেলো ছেলেটি।

“কি হলো বলো, থামলে কেনো। বাড়ি কোথায়?”

“তোমাদের বাড়ির ডানদিকে আরো ২ বাড়ি পেরিয়ে ছোট খালটার দক্ষিণ পাশের বাড়িটাই আমাদের।” 

“ওহ আচ্ছা, এরপর বলবে যে তুমি আসলে ভুত। ২০-২৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত বাড়িতে তুমি আস্তানা গেড়েছো, তাইনা? উজবুক কোথাকার।” 

“দেখো, আমি যা বলছি সবই সত্যি। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কি হলো হঠাৎ করে। আমিও একটু আগে বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আসলাম, দেখলাম কেউই নেই। তাই সাবুর কাছে ছুটে আসলাম। আজ সকালে খালের পাড় ধরে উত্তর দিকের জঙ্গলটাতে গিয়েছিলাম, সেখানে হঠাৎ কি যেন একটা অনুভব করলাম, একটা ছোটখাটো ভূমিকম্পের মত। তারপর থেকেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে।” – শীতল এবং ভয়ার্ত কন্ঠে বললো ছেলেটি।

“দেখো, তোমার আষাঢ়ে গল্প শুনে আমি মোটেও পটে যাবো না বুঝেছো। কোত্থেকে এমন বাঁদরামো শিখেছো কে জানে। বুঝেছি নিশ্চয়ই পুব পাড়া থেকে এসেছো, ওখানকার শয়তানের চ্যালা।”

“দেখো, আমি তো বললামই আমি যা বলছি সবই সত্যি। এর ভেতর এক বিন্দুও মিথ্যে নেই। আচ্ছা, সাবু যদি তোমার বাবা হয়, তাহলে তাকে ডাকোতো একটু, তার সাথেই কথা বলি।”

“বাবা বাড়ি নেই। থাকলেও তোমার মত মিথ্যুক ছোড়ার সাথে কথা বলতো না” – কন্ঠে আগুন ঝড়িয়ে বললাম আমি।

অসহায় ভাঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো ছেলেটা। এরপর জিজ্ঞেস করলো,

“আজ ২৭ এপ্রিল না?”

“হ্যা, আজ ২৭ এপ্রিল, ২০০৭। এখন আবার বলোনা যে তুমি টাইম ট্রাভেল করে ভবিষ্যতে আসছো।”

“২০০৭! সত্যিই?” – চমকে উঠলো ছেলেটা।

একরাশ বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। কোন উত্তর দিলাম না। 

“জানি তুমি আমার কোন কথাই বিশ্বাস করছো না। তবে আমি যা যা বলেছি তাতে একবিন্দুও মিথ্যে নেই। তোমার বাবা আসলে তাকে জিজ্ঞেস করে দেখো। আর এই বইটা সাবুকে দিও, এটা ওরই” পকেট থেকে একটা প্রচ্ছদ ক্ষয়ে যাওয়া ছোট বই বের করে আমার কাছে দিলো ছেলেটা।

“আমাকে এক গ্লাস পানি এনে দিতে পারো?” – ক্লান্ত মনে হলো ওর গলা।

কিছু না বলে পুরনো বইটা হাতে নিয়ে ঘরে চলে আসি আমি। দুয়েক মিনিট পর এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে দেখি ছেলেটা নেই। ছেলেটার প্রস্থানে আমি মনে মনে খুশিই হলাম, যদিও রহস্য কিছুটা থেকেই যাচ্ছিলো। ওর দেয়া বইটা পড়তে নিলাম, আশির দশকের একটা ছোটগল্পের বই। বইয়ের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “সাহাবুদ্দিন”। হাতের লেখাটা দেখে মনে হলো না যে এটা আব্বা লিখেছেন। ভাবলাম, বোধহয় ওই ছেলেটা নিজ থেকে লিখে আমাকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলো। 

এই ঘটনার তিনদিন পরই আব্বা বাড়ি চলে আসেন। আমিও এর মধ্যে বেমালুম ভুলে যাই সেদিনের কথা। আম্মাকেও আর জানানো হয়নি সেই আলাপচারিতার ব্যাপারে। কয়েকদিন পর এক বিকেলে আব্বা হঠাৎ আমার টেবিলে সেই ছেলেটার দেয়া বইটা দেখতে পান।

“এই বই তুই কোথায় পেলি নীরব?” – বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন আব্বা।

“আর বলোনা। সেদিন এক ফাজিল ছেলে আসছিলো আমাদের বাড়ি, কালা না কালু কি যেন নাম। ও দিয়ে গেছে এইটা।”

“কালু! কি বলিস, কে এসেছিলো, খুলে বলতো সব।” – বিষ্ময়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায় আব্বার।

তারপর আব্বাকে খুলে বললাম সেদিন দুপুরের সব ঘটনা। পুরোটা সময় নীরবে শুনে গেলেন আব্বা। আমি বলা শেষ করতেই জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় চলে গেছিলো ও? তুই পিছু পিছু যাসনি?”

“নাহ, কোথাকার কোন বাঁদর কে জানে! আমি খামোখা পিছু নেবো কেন!”

এরপর হঠাৎই ঘর থেকে বের হয়ে যান আব্বা। ত্রস্তপায়ে ছুটে যান ছেলেটা যে বাড়ির কথা বলেছিলো সেই দিকে।

সন্ধ্যার দিকে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেন আব্বা। এক অজানা বালকের খোঁজে আবাকে এত উদ্বিগ্ন থেকে আমি কৌতুহল বোধ করি, তাঁর কাছে জানতে চাই ছেলেটির পরিচয়।

আব্বার কাছ থেকে যখন সবকিছু জানতে পারি তখন হতবাক হয়ে যাই আমি। এই ছেলেটি আব্বার ছোট বেলার বন্ধু। আমাদের বাড়ির ডানদিকে আরো ২ বাড়ি পেরিয়ে ছোট খালটার দক্ষিণ পাশের বাড়িটাই ছিলো ওদের। আব্বা আর কালু সারাদিন এক সাথেই দুষ্টুমি করে ঘুরে বেড়াতেন এ পাড়া থেকে ও পাড়ায়। কিন্তু ২৩ বছর আগে, হঠাৎই একদিন একেবারে লাপাত্তা হয়ে যায় কালু। সারা গ্রাম তন্নতন্ন করে খুঁজেও হদিস পাওয়া যায়না তার। পত্রিকায় নিখোঁজ বিজ্ঞতি ছাপা হয়, টেলিভিশনেও বিজ্ঞতি দেয়া হয়, কিন্তু কিছুতেই আর দেখা মেলেনি চঞ্চল ছেলেটির। যখন সে হারিয়ে যায় তখন তার বয়স ১৩ বছর।

আব্বা তার স্মৃতি হাতড়ে ছেলেটার শরীরের বর্ণনা দিলেন, আশ্চর্যজনক ভাবে তা মিলে গেলো আমার দেখা সেদিনের ছেলেটার সাথে!

আব্বা, আম্মা দুজনেই আমাকেই বারণ করেছিলেন এই ঘটনা কাউকে জানাতে। তারা নিজেরাও নিশ্চিত ছিলেন না এর ব্যাখ্যা নিয়ে। পুরো ঘটনাটিকেই হ্যালুসিনেশন বলে চালানো যেত, যদি না ছেলেটি একটা বই দিয়ে যেত আমার হাতে। যে বইটি আজ থেকে ২৩ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিলো কালু নামক ছেলেটির সঙ্গে। 

এরপর আব্বা আমাকে বিভিন্ন হুজুর, কবিরাজ, পীরদের কাছে নিয়ে গেলেন। পানি পড়া খাওয়ালেন, তাবিজ ঝুলিয়ে দিলেন গলায়। কারণ তিনি ভেবেছিলেন এসব হয়ত কোন অতিপ্রাকৃত ব্যাপার। হয়ত মৃত কালুর আত্মা এসে দেখা দিয়েছে আমার সাথে। যদিও আমার কাছেও এসবের কোন বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা ছিলো না, তবুও আমি এটুকু নিশ্চিত ছিলাম যে আর যাইহোক ওই ছেলেটা কোন অশরীরী ছিলোনা।

এই ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে আরো বছর। তবু রহস্য উন্মোচনে সক্ষম হইনি আমি। জানিনা এ রহস্যের উদঘাটন কখনো সম্ভব হবে কিনা। আজ বহুবছর পর সবার সামনে উন্মোচন করলাম এতদিন ধরে গোপন রাখা এক অবিশ্বাস্য সত্য।

(নীরব মাহমুদের লেখা ২০০৭ সালের এক ঘটনার স্মৃতিচারণ)

***

পর্দার আড়ালে

ছোট গ্রামটির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের পাড় ধরে উত্তর দিকে এগোলে যে জঙ্গলটি তার গহীনে গোপনে তাবু গেড়েছে দুজন নির্বাসিত পদার্থবিজ্ঞানী। বিতর্কিত কয়েকটি গবেষণায় অংশ নেয়ায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সংস্থা নির্বাসন দিয়েছে তাদের। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে এসে তারা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে তাদের গবেষণা। জঙ্গলের গভীরে কখনো কেউ আসেনা বললেই চলে। আর আসলেও খুব একটা সমস্যা নেই, কারণ মাটির নীচের গভীর সুড়ঙ্গ কারো চোখেই পড়বে না।

৭ এপ্রিল, ১৯৮৪

“আমরা সাকসেসফুল!” – উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন বিজ্ঞানীদের একজন।

“আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আমরা টাইম ট্রাভেলের পোর্টাল তৈরি করে ফেলেছি!” – অপর বিজ্ঞানীর কন্ঠে বিষ্ময়।

“তাহলে, পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে টাইম ট্রাভেল করতে প্রস্তুত?”

“অবশ্যই, লেটস ডু ইট।” সায় দিলেন অপর বিজ্ঞানী।

ছোটখাটো একটা ভূমিকম্পের মত আলোড়ন উঠলো জঙ্গল জুড়ে। গোপন সুড়ঙ্গটির ৩০০ মিটার দূরে থেকেও কম্পন টের পেলো কালু। হাটতে হাটতে সে চলে এসেছিলো জঙ্গলের গভীরে। এবারে খানিকটা ভয় লাগলো তার। কম্পনটা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো, এরপর হঠাৎই স্থির হয়ে গেলো সব। 

জঙ্গলটা পেছনে রেখে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাটতে শুরু করলো সে। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন অপরিচিত লাগলো তার। এক ভূমিকম্পে এত পরিবর্তন হলো কিভাবে, আশ্চর্য হয়ে ভাবলো সে।

তবে সে তখনো জানেনি, এক ভূমিকম্পই তাকে ১৯৮৪ থেকে ২০০৭ এ নিয়ে এসেছে।

 

বিনিয়ামীন পিয়াস
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।