মেয়েটিকে দেখার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পরেও প্রান্তিক কিছুতেই মেয়েটিকে ভুলতে পারলো না। তার বিস্মিত দৃষ্টি আর কথা বলার ভঙ্গি-দুটোই যেন অসাধারণ। প্রান্তিকের এখনো মনে হচ্ছে সে মেয়েটিকে ক্যাম্পাস এ দেখেছে। কিন্তু মেয়েটি এই ব্যাপারটা পুরোপুরি অস্বীকার করলো কেন এটা তার মাথায় ঢুকছে না। আর নাম না জানার কারণে কারো কাছ থেকে খবর নেয়া সম্ভব না।তার উপরে ঈদের ছুটি চলছে। সুতরাং ক্লাস খোলা অব্ধি অপেক্ষা করতেই হবে।

আকাশ যখন বাড়ি ফিরলো তখন রাত এগারোটা।সে ভীষণ ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। রান্নাঘর এ গিয়ে দেখলো সব খাবার ফ্রিজে।গরম না করে খাওয়া যাবে না।এ বাড়িতে কোন বাঁধা কাজের লোক নেই যাকে এখন খাবার রেডি করার কথা বলবে।অগত্যা সে গিয়ে লাবণ্যের দরজায় টোকা দিলো।

ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, “যা হাতমুখ ধুয়ে আয়।আমি ভাত তরকারি গরম করছি।”

আকাশ অতিদ্রুত ধোয়া ওড়া খাবার মুখে দিচ্ছে। লাবণ্য বললো, “এভাবে খাচ্ছিস কেন?ক্ষুধা লাগলেই যে রাক্ষসের মতো খেতে হবে এমন কোন কথা নাই।আস্তে ধীরে খা।”

আকাশ খাওয়া থামিয়ে হাসলো,“দরজা খুলেই বুঝতে পেরেছিলে আমি খেয়ে আসি নাই, তাই না?”

“হ্যা, বুঝতে পেরেছিলাম।তোর চেহারা দেখলে যে কেউ বুঝতো।”

”উহু, বুঝতো না।আমি একবেলা কেন দশবেলা না খেয়ে থাকলেও মা বুঝবে না।”

“তুই কিভাবে জানলি? কখনো দশবেলা না খেয়ে থেকেছিস?”

আকাশ উদাস কন্ঠে বললো,“অনেক কিছু এমনি এমনিই বুঝা যায়।জীবনের অনেক ঘটনাই খুব প্রেডিক্টেবল হয়।”

”থাক, আর সস্তা ফিলছফি কপচাতে হবে না।তুই ফিলছফির ছাত্র না।ভাত খা।”

আকাশ হাত ধুচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে লাবণ্য বললো,”বাবু শোন মামীর সাথে অযথা রাগারাগি করিস না।মামী কিন্তু তোকে খুব ভালোবাসে। তুই বোকা বলেই তা বুঝতে পারিস না।”

“আমি সবই বুঝি। আর রাগারাগি যে অযথা করি না তা তুমিও জানো।”

লাবণ্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যেন সে জানতো আকাশ এই উত্তরই দেবে।

আকাশ আবার বললো,“তাছাড়া তুমি আমার কথা শোন না।আমি তোমার কথা কেন শুনবো।”

লাবণ্য অবাক হয়ে বললো,“আমি তোর কোন কথাটা শুনলাম না?”

“এইযে কতবার বলেছি বাবু বলে ডাকবে না।শুনেছ সেই কথা?”

“মামা মামী তোকে বাবু বলে ডাকতে পারলে আমি কেন পারবো না?”

”তার কারণটাও বলেছি। বাবা মায়ের কিছুই আমার পছন্দ না।সুতরাং তাদের দেয়া নামটাও আমার পছন্দ না।”

“আচ্ছা বেশ, ডাকবো না বাবু বলে। কী বলে ডাকবো তাহলে? বাইরের লোকের মতো আকাশ বলেই ডাকবো?”

“না না, তা তো আরো আগেই না।তুমি আমাকে অমিত বলে ডাকো। ‘শেষের কবিতা’-র অমিত।”

লাবণ্য হেসে ফেললো। “তাহলে অমিত ডাকার চেয়ে ভালো হবে শোভনলাল ডাকলে। শেষপর্যন্ত শোভনলালের সাথেই তো লাবণ্যের বিয়ে হলো।শোভনলাল নামটা কেমন বল তো?”

লাবণ্য আর আকাশ মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসেছিল। আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে বললো,“কিচ্ছু বলে ডাকতে হবে না।আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।”

লাবণ্য ও উঠে দাঁড়ালো। বললো,”রেগে যাচ্ছিস কেন?তোর সাথে মজা না করলে কার সাথে করবো বল।মামাকে গিয়ে তো আর জিজ্ঞেস করতে পারি না শোভনলাল নামটা কেমন।”

“বন্যাপু, আমি কিন্তু ছোটবেলায় তোমাকে নিয়ে সত্যিই খুব সিরিয়াস ছিলাম। মনেপ্রাণে চাইতাম যেন তোমার বিয়ে আমার সাথেই হয়।”

“ছোটবেলার সিরিয়াসনেস বড়বেলায় হারিয়ে গেলো….আমার কপাল পুড়লো।এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি!”

“কোথাও রাখতে হবে না।আমি গেলাম।তুমি মনে হয় পড়াশোনা করছিলে। যাও, রুমে গিয়ে পড়তে বসো।”

আকাশ চলে গেলো। লাবণ্যও খাবার ফ্রিজে রেখে রুমে গিয়ে পড়তে বসলো। এই বাড়িতে একমাত্র আকাশকেই লাবণ্য নিজের পরিবার এর অংশ মনে করে।মামা মামীকে এতো বছরেও সে পরিবার ভাবতে পারে না।বুঝতেও পারে না এটা কার ব্যর্থতা- তার নিজের নাকি মামা মামীর।

আকাশদের বাড়িতে ছয় সাত বছর ধরে কোরবানি দেয়া হয় না। তবে এবার হচ্ছে।আকাশের বাবা আজিজ সাহেব বেশ বড়সড় একটা গরু কিনে নিয়ে এসেছেন। লাবণ্য তার মামার কাণ্ডকারখানা কিছুই বুঝতে পারছে না।হঠাৎ করে এতো টাকা কোত্থেকে এলো কে জানে! সে নানান কথাবার্তা বলে মামীর কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছিল।কিন্তু মামী কিছুই বলেননি। আকাশকে বলেছিল খোঁজ নিতে, নিয়েছে কিনা তা জানা হয়নি। লাবণ্য ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিল। কলিংবেল এর শব্দ শুনে দরজা খুললো।একটা অল্পবয়সী ছেলে ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই ছেলেকে লাবণ্য আগেও দেখেছে। আকাশের বন্ধু। ছেলেটি ভয়াবহ খবর দিলো। আকাশের মাথা ফেঁটে গেছে। ঈদের আগের দিন বলে মহল্লার ক্লিনিক বন্ধ। অন্য বন্ধুরা তাকে এলাকায় নতুন আসা এক ডাক্তার এর বাসায় নিয়ে গেছে।

খবরটি শুনে লাবণ্য হতভম্ব হয়ে গেলো। তারপর অবশ্য দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো। মামা বাসায় নেই, মামীকে এখন কিছু জানানো যাবে না।তিনি কথাটা শোনামাত্র ‘বাবু’ বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকবেন।তখন তাঁকে সামলাতেই বেশি ঝামেলা হবে।পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে লাবণ্য এই ব্যাপারে নিশ্চিত।
সে আকাশের বন্ধুটিকে বাইরে দাড় করিয়ে মামীর কাছে গেলো। সালেহা টিভি দেখছিলেন।লাবণ্য তাঁর সামনে এসে বললো,“মামী একটু বাইরে যাচ্ছি।”
“ঝাড়ু দেয়া হয়েছে?”
“না, আমি যাবো আর আসবো। জরুরি দরকার আছে।”
“তোর আবার কীসের জরুরি দরকার?”
“এসে বলছি, তুমি দরজাটা বন্ধ করে দাও।” বলেই সে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলো।
তার অস্থিরতা দেখে সালেহা রেগে গেলেন।এই মেয়ের সাহস দিনদিন বেড়েই চলেছে।
প্রান্তিক তার বাবা মায়ের সাথে লুডো খেলছিল। অতিব্যস্ত বাবা মায়ের সাথে সে কখনোই বেশি সময় কাটাতে পারেনি। একটা সময় সে বাড়িতে বসে তাঁদের জন্যে অপেক্ষা করতো। এখন তাঁরা ঢাকায় বসে প্রান্তিকের জন্যে অপেক্ষা করেন।খেলায় যখন চরম উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা চলছে তখন কলিংবেল বেজে উঠলো। একদল কমবয়সী ছেলে এসেছে। তাদের মাঝে একজন আহত।মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে। মিলি তাদের ড্রয়িংরুম এ বসালেন। এরা একই মহল্লার ছেলে। কিন্তু প্রান্তিক তাদের কাউকেই চেনে না।চেনার কথাও না।ইকবাল সাহেবরা এখানে এসেছেন কেবল মাসদেড়েক আগে। প্রান্তিক যখন ছুটিতে ঢাকায় এলো তখন তারা বাসা তার শৈশব কৈশোর এর স্মৃতিবিজড়িত মালিবাগে নয়, অল্পপরিচিত মোহাম্মদপুর এ। লাবণ্য যখন এসে পৌছুলো তখন মিলি আকাশ এর মাথায় ব্যান্ডেজ করছেন।লাবণ্য ঘরে ঢুকে একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। আকাশ তাকে দেখতে পেলো না কিন্তু প্রান্তিকের সাথে চোখাচোখি হলো। প্রান্তিকের বুকটা কেঁপে উঠলো। সেই মেয়েটি তার বাড়িতে!!

চলবে…..

আতিকা খান ইরা
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড রিসার্চ