ভালো, সুন্দর, উপকারি এ তিনটি বিশেষণ কি আপেক্ষিক নয় ? ভালোমন্দ আর সৌন্দর্য যে আপেক্ষিক, তা সহজবোধ্য, কিন্তু উপকারিতার বিষয়টা বোঝা ততটা সহজ নয়। অনেক কিছুতেই স্বল্পমেয়াদে আর দীর্ঘমেয়াদে ঘটতেই পারে বড় ক্ষতি, অথচ তা হতে পারে অধিকাংশের ধারণা অভিজ্ঞতা ও অধিকাংশ পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলে উপকারি বলে স্বীকৃত । উপকার-অপকার ও আপেক্ষিক। আচ্ছা, ক্ষতিকর বলতে আমরা কী বুঝবো? ক্ষতি কখন কীভাবে হয় কার হয়? ধরা যাক, একটা বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট হলে কিছু লোকের উপকার হয় । আর সেই রেস্ট্রোঁ নির্মাণের কারণে প্রকৃতি-পরিবেশ বা কিছু প্রান্তিক লোকের ক্ষতিই হয়।

ইশপ বহুকাল আগে দেখিয়ে গিয়েছেন যে , দুইয়ের বিরোধে তৃতীয় বা অন্য কারও লাভ হয়। এ বিষয়টা তিনি কত সহজে শিশুদের উপযোগী করে গল্পে তুলে ধরেছেন । অথচ আজও আমরা দুয়ের বিরোধে তৃতীয়কে লাভবান করেই চলি। সত্যিকার শত্রুকে না চিনলে সংকট অনিবার্য । তবে কথা হল মূর্খ বন্ধুর চেয়ে জ্ঞানী শত্রু উত্তম। অথচ শত্রুতা থেকে বাঁচতে আর বন্ধুত্বের প্রয়োজনে আমরা অজ্ঞ লোককেই বন্ধু ভাবি। তথ্য পরিবেশন বা ধারণকারীই জ্ঞানী নন। যিনি সত্যনিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ তিনিই জ্ঞানী। সুযোগসন্ধানী লোক জ্ঞানী নন, বরং বুদ্ধিমান। জ্ঞানীলোকের কাছে গেলে আপনি নিজের জ্ঞানরাজ্য সম্পর্কে ধারণা পাবেন, অন্যদিকে জ্ঞানদৈন্যেভোগা লোকের সান্নিধ্যে গেলে আপনি কেবল নিজের অজ্ঞতা ও অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে ধারণা পান আপনার জ্ঞানরাজ্য মোটেও সমৃদ্ধ হয় না।

একটা সময় পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন আর অহিংসা খুব কার্যকর ছিল। অথচ আজ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের অসহযোগ আন্দোলনে ফল লাভ সম্ভব নয়। আত্মদম্ভ করে কাউকে অসহযোগ বা বর্জন করলে, ফল বিশেষ কিছুই আসে না। বরং আত্নত্যাগের একটা ধরন হতে পারে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে অপমানিত হতে থাকা। কেননা লোকের সান্নিধ্যধন্য না হলে তাকে যেমন অনুধাবন করা যায় না! আবার তেমনি নিজের মানবিক গুণ ব্যক্তকরণে সান্নিধ্যদান ভিন্ন অন্য কোন পথ নেই। সেই রাম আর সেই অযোদ্ধা নেই। অমানবিক গুণের প্রতিযোগিতা বা কদর থাকতে পারে । কলা নৈপুণ্যে মিলতে পারে পুরস্কার । কিন্তু নিজের মহৎ গুণাবলি আবিষ্কার,প্রকাশ ও বিকাশে মানুষের সঙ্গ পরিত্যাগ কার্যকর নয়। কিন্তু সমস্যা সেখানেই যে, আবেগ অনুভূতিহীন মানুষ, বোধশক্তিহীন ও নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষের আধিক্য আমাদের বিপথে পা চালিয়ে বিপর্যস্থ হবার যত পথ রেখেছে , তুলনায় সত্যিকার মানুষ আবিষ্কারের সম্ভাব্যতা কমিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রচলিত ব্যবস্থা । আমাদের নিজেদের মানুযের মত মানুষ হতে হবে , মানুষ খুঁজতে হবে, মানুষের সান্নিধ্য নিতে হবে । মানবিক গুণাবলি বিকশিত করতে হবে। আর প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে, নিজেরা যেন প্রযুক্তিতে আসক্ত না হই, সেটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। প্রযুক্তি হোক উপকারি ক্ষতিকর যেন তা না হয়। জীবন হোক সুন্দর।

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়