আল্লাহ তায়ালা অনেক যত্ন করে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের মধ্যে রয়েছে নারী এবং পুরুষ৷ পুরুষ যেমন আল্লাহর বান্দা তেমনি নারীও তাই৷ নারী পুরুষ উভয়েই আল্লাহর কাছে সমানভাবে প্রিয়।

তবে সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীকে সংগ্রাম করে আসতে হয়েছে তার অধিকার আদায়ের জন্য৷ আধুনিককালে এসেও নারী সংগ্রাম করে যাচ্ছে তার অধিকার আদায়ের জন্য৷

বর্তমান পৃথিবীতে ধর্ম রয়েছে অনেক। একেক ধর্মে নারীকে বর্ণনা করেছে একেক ভাবে৷ আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই মুসলিম । তাই আমি ইসলামের কিছু বিশেষ অধিকার যেগুলো বিশেষভাবে নারীকেই দেওয়া হয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। এই অধিকারগুলো শুধু নারী নয়, জানা দরকার পুরুষেরও।

আমাদের দেশের আইনী ব্যবস্থায় ধর্মীয় আইনগুলো এখনো আছে জগাখিচুড়ির মত। আমাদের ধর্মীয় আইনের উপর একটা পূর্ণাঙ্গ আইন নাই৷ যে কারণে মুসলিম আইনের আলাপ করতে গেলে আমাদের শরীয়া আইনের উপর নির্ভর করতে হয়৷ শরীয়া আইনের আলোকে নারীর বিশেষ অধিকারগুলো নিয়েই আলোচনা করবো৷

১/ বিবাহ:বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে হবে না। জোর করে সম্মতি নিলে সেটাকে সম্মতি বলা যাবে না৷ একজন নারী বিয়ের যে কোন শর্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারে। কোনো শর্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করলে সে শর্ত নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না৷

বিয়েতে কন্যাকে দেনমোহর (dower)দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটা বিয়ের অন্যতম শর্ত। দেনমোহর না দিলে বিয়ে হবে না৷ এটা একপ্রকার উপহার৷ দেনমোহরের অর্থের উপর নারীর থাকবে একচ্ছত্র আধিপত্য৷ সে এই অর্থ তার বাবাকে দিয়ে দিতে পারে, কোনো গরীবকে দান করে দিতে পারে বা নিজের স্বামীকেই উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারে। সে না দিলে স্বামীর কোনো অধিকার থাকবে না এই অর্থের উপর। বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই তার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর। স্বামী তা দিতে বাধ্য। স্বামী না দিলে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। স্বামীর এই ভরণপোষণের বিপরীতে স্ত্রীকে কি দিতে হবে? আমাদের দেশে একটা প্রচলিত ভুল ধারণা হচ্ছে বিয়ের পর নারী ঘর সংসার করবে। আদতে তা নয়। আমাদের কাবিন নামার ১৭ নাম্বার কলামে বিয়েতে শর্ত আরোপের সুযোগ আছে। কোনো নারী যদি সে কলামে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে যে তাকে বিয়ের পর পড়াশোনার সুযোগ দিতে হবে অথবা তাকে চাকুরি করার সুযোগ দিতে হবে অথবা সুইজারল্যান্ড বা কানাডাতে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে এবং পুরুষ যদি এই শর্ত মেনে নিয়ে বিয়ে করে তবে পুরুষ বাধ্য সে শর্ত পূরণ করতে।

তাহলে একজন নারী যদি ঘরের কাজকর্ম না করে তাহলে কি তাকে বাধ্য করা যাবে? ইসলাম বলে কোনো পুরুষ কোনো নারীকে বাধ্য করতে পারবে না৷ কোনো স্ত্রী তার স্বামীর জন্য খাবার রান্না করতে বাধ্য নয়। এমনকি স্ত্রী যদি বলে তাকে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার কিনে এনে দিতে তবে স্বামী তা করতে বাধ্য। আশ্চর্যজনক বিষয় আরো আছে, স্ত্রী যদি বলে তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হবে তবে স্বামী সেটা করতেও বাধ্য৷ একজন স্বামী তার স্ত্রীকে এক টুকরো কাপড় এনে দিয়ে বলতে পারবে না তুমি এটা সেলাই করে পরিধার করো। স্ত্রী চাইলে স্বামীকে সেটা সেলাই করে দিতে হবে। স্ত্রী কি তাহলে ঘরের কাজকর্ম করার বিনিময়ে অর্থ দাবি করতে পারবে? অধিকাংশ মনীষী বলেছেন, স্ত্রী এই দাবি করতে পারবে না তবে তাকে ঘরের কাজকর্ম করতে বাধ্যও করতে পারবে না। এমনকি কোনো কোনো ফকীহ বলেছেন, স্ত্রী নিজের সন্তানকে দুধপান করানোর বিনিময়ে অর্থ দাবি করতে পারে।

স্ত্রী কি স্বামীর পিতামাতার খেদমত করতে বাধ্য? ইসলাম বলে, স্ত্রী সেটা করতে বাধ্য না৷ স্ত্রীকে জোর করতে পারবে না তাদের সেবাযত্ন করার। আধিকাংশ আলেমগণ স্বামীর সেবার বিভিন্ন ফজিলত নিয়মিত বর্ণনা করলেই এই নারী অধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করেন না৷ নারীর এই অধিকারগুলো নারী পুরুষ উভয়েরই জানা প্রয়োজন। তবে এ অধিকারগুলো একদম শক্তভাবে প্রয়োগ করতে গেলে স্বামী স্ত্রীর বন্ধনে ফাটল ধরতে পারে অনেক সময়। তাই স্কলাররা নারী পুরুষ উভয়কেই সহনশীল আচরণ করতে বলেন৷

২ / সম্পত্তি : সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীর প্রতি এক ধরণের বৈষম্যমূলক আচরণ লক্ষ্য করা যায় আমাদের সমাজে যেটা খুবই দুঃখজনক৷ একজন ব্যক্তি মারা গেলে তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীদের মাঝে ভাগ করে দিতে হয়৷ পবিত্র কুরআনে ১২ ধরণের উত্তরাধিকারের কথা বলা হয়েছে যার মধ্যে ৮ জন নারী। বাকি ৪ জন পুরুষ। কুরআনে প্রত্যেকের অধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে অন্য কোন কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি কুরআনে নির্দেশিত ভাগের সম্পত্তির চাইতে কম সম্পত্তি নারীদেরকে দেয় তবে সে কুরআনের বিরোধীতা করলো এবং সে জাহান্নামী হবে৷

ইসলামে অধিকার দুই প্রকার। ১) হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর অধিকার) ২) হাক্কুল ইবাদ(বান্দার অধিকার)। নারীর পাওনা উত্তরাধিকার সম্পত্তি হাক্কুল ইবাদ। আল্লাহ তার নিজের অধিকার ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু বান্দার অধিকার আল্লাহ কখনো ক্ষমা করেন না৷ সুতরাং বাবার সম্পত্তি বোনকে না দিয়ে কিছু নামমাত্র অর্থ দিয়ে দেওয়া বা একটা জায়নামাজ উপহার দিয়ে সম্পত্তি নিয়ে নেওয়ার যে রেওয়াজ সমাজে প্রচলিত আছে সেটা স্পষ্ট ইসলামবিরোধী। তবে কোনো নারী যদি স্ব প্রণোদিত হয়ে উপহার দিয়ে দেয় সেটা তাহলে কোনো সমস্যা নেই।

এই নারী অধিকার গুলো নিয়ে আলোচনা হয় তবে সেটা পর্যাপ্ত নয়। নারীরাও খুব একটা আলোচনা করতে দেখা যায় না এই অধিকারগুলো। আর এই অধিকার গুলো নারীর চাইতে বেশি জানা দরকার পুরুষের৷ কারণ প্রতিটি অধিকারের বিপরীতে এক বা একাধিক দায়িত্ব থাকে। নারীর যদি কোনো অধিকার থাকে তবে সেই অধিকারের বিপরীতে দায়িত্বটা আসলে পুরুষের। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা রোধে তাই এগিয়ে আসতে হবে পুরুষদেরকেই।

সাব্বির রহমান কাউসার
আইন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।