কোয়ারেন্টিন শব্দটা আমাদের কাছে বহুল প্রচলিত কোনো শব্দ না৷ ইদানীংকালে শব্দটি আমাদের বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে। মহামারী করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে কোয়ারেন্টিন অনেকটা অবশ্য কাজ হয়ে দাড়ায়। অন্য মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই হচ্ছে কোয়ারেন্টিন।

বর্তমান করোনা ভাইরাস আমাদের যেমন কোয়ারেন্টিনকে এত পরিচিত করে দিয়েছে তেমন অন্য কোন রোগ কি ছিলো যেটাতে কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মেনে চলতে হয়? অনেক রোগের ক্ষেত্রেই কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মানতে হয়। বিশেষ করে ছোঁয়াচে রোগ গুলোর ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক।

অপরাজেয় কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রও পড়েছিলেন কোয়ারেন্টিনের ফাঁদে। তাকে থাকতে হয়েছিলো কোয়ারেন্টিনে৷ আজকে সেই গল্পই করবো।

শরৎচন্দ্র আসলে এমন একজন লেখক যিনি রোমান্টিকতাকে নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে। একই সাথে সমাজের যাবতীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সমাজকে বিশ্লেষণ করেছেন নিখুঁতভাবে। এছাড়াও লিখেছেন তৎকালীন সমাজে নারীর অবস্থান ও তার সমালোচনা৷

শরৎচন্দ্রের একটি বিখ্যাত উপন্যাস হচ্ছে শ্রীকান্ত। চার খন্ডের এ উপন্যাসটি শরৎচন্দ্র লিখেছেন উত্তম পুরুষে৷ ধারণা করা হয় তিনি বার্মায় বসে এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন। এই উপন্যাসটির গল্পের শুরু তার গ্রামে হলেও শেষের দিকে তার চাকুরি-জীবনের গল্প উঠে এসেছে যখন তিনি ছিলেন বার্মায়।

শ্রীকান্ত উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র রাজলক্ষীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শ্রীকান্ত বাবু চেপে বসেন বার্মার জাহাজে। বার্মা যাচ্ছিলেন তিনি চাকরির সুবাদে। অনেকের অনুরোধ ছিলো বার্মা না যাওয়ার৷ কিন্তু শ্রীকান্ত ছিলেন তার সিদ্ধান্তে অটল।

শ্রীকান্ত বার্মার জাহাজে চেপে বসলে সেখানে এক বাঙালী মহিলার সাথে পরিচয় হয়৷ তার নাম অভয়া। এই অভয়ার স্বামী খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। শ্রীকান্ত তার স্বামীর চিকিৎসার জন্য সহায়তা করেছিলেন। সেখান থেকেই অভয়ার সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিলো৷ কিন্তু এ সম্পর্কের নাম কি তা ঠিক বোঝা যায় না৷

ভারতবর্ষে তখন প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিলো। তাই ভারত থেকে কেউ বার্মা গেলে তাকে থাকতে হতো কোয়ারেন্টিনে। শ্রীকান্ত বাবু যখন বার্মা পৌছান তখন তাকেও থাকতে হয়েছিলো কোয়ারেন্টিনে। বার্মার বন্দরে পৌছেই শ্রীকান্ত শুনতে পান কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক। কারণ বার্মার সরকার চায় না তার দেশেও প্লেগ ছড়িয়ে পড়ুক।

শ্রীকান্ত বলেন, এখানে এসে নতুন একটা শব্দ শুনলাম, কেরন্টিন! পরে জানলাম শব্দটা quarantine! তিনি অবশ্য কোয়ারেন্টিন ছাড়াই বার্মায় প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন৷ সুযোগ করে দিয়েছিলেন জাহাজের ডাক্তার৷ কিন্তু বাঁধ সাধে অভয়া। অভয়া বলেছিলো সে একা কোয়ারেন্টিনে কিছুতেই যাবে না। দরকার হলে পানিতে ঝাপ দিবে। কোনো এক অদ্ভুত আকর্ষণে শ্রীকান্তও রাজি হয়ে যান কোয়ারেন্টিন বাসে।

এই কোয়ারেন্টিন বাস করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন সামাজিক চিত্র সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। ডাক্তার তাকে বলেছিলো, একটা কাগজের পাস নিয়ে আসলেই পারতেন। সঙ্গ নিরোধ খুবই কষ্টের৷ শ্রীকান্ত নিজেই বলেছে, এই সকল কোয়ান্টিন আসলে মুটে মজুরদের জন্য৷ ধনী লোকদের এইসব ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না৷ জাহাজ ঘাট থেকে দূরে একটা জায়গায় কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে যাওয়ার তেমন রাস্তাঘাট নেই। নেই কোনো কুলি মুটে মজুর। নিজেদের মালামাল নিজেদেরকেই বহন করতে হয়। মোদ্দাকথা, একেবারে জগাখিচুরি অবস্থা৷

শ্রীকান্ত অভয়ার পাল্লায় পড়ে কোয়ারেন্টিন বাস করলেও তিনি হয়ে পড়েছিলেন একদমই বীতশ্রদ্ধ। তিনি বার বার ভাবছিলেন এমন একটা জায়গায় কেন আসলাম। আমার মত বোকা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। তার কোয়ারেন্টিন অভিজ্ঞতা ছিলো খুবই বাজে। তবে তিনি এও বলেছেন, টাকা থাকলে এই কোয়ারেন্টিনেও রাজার হালে থাকা যায়। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে যে কোয়ারেন্টিন অভিজ্ঞতা শ্রীকান্ত পেয়েছিলো ২০২০ এ একশো বছর পরেও তার তেমন কোনো পরিবর্তন হয় নি। যার সম্পদ আর প্রভাব প্রতিপত্তি রয়েছে তার জন্য এগুলো তার কাছে পান্তাভাত। তৎকালীন কোয়ারেন্টিনের সময় সমাজের যে নৈতিক বিচ্যুতি বর্তমান সময়েও আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি।

অনেকে বলে থাকেন, শ্রীকান্ত উপন্যাসের শ্রীকান্ত আসলে শরৎচন্দ্র নিজেই৷ তার জীবনের গল্প গুলোই তিনি বলিয়েছেন শ্রীকান্তের মুখ দিয়ে। যদি তাই হয় তবে বলতেই হয়, আজ থেকে ১০০ বছর আগেই শরৎচন্দ্র কোযারেন্টিন বাস করেছিলেন৷

সাব্বির রহমান কাউসার
আইন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।