চন্দ্রবোড়া /রাসেল ভাইপার নামকরনঃ Russell’s viper/চন্দ্রবোড়া /রাসেল ভাইপার।

বৈজ্ঞানিক নামঃ Daboia russelii

বর্ণনাঃ চন্দ্রবোড়ার দেহ মোটাসোটা, লেজ ছোট ও সরু। প্রাপ্তবয়স্ক সাপের দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত এক মিটার; দেহের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১.৮ মিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।দেহের নকশা অনেকটা অজগর সাপের মত। এজন্য কেউ কেউ অজগর মনে করে ধরতে গিয়ে এর ছোবলে প্রাণ হারিয়েছে।

প্রাপ্তিস্থানঃ চন্দ্রবোড়া সাপ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দুর্লভ সাপ। এটি পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ জেলায় ও বাংলাদেশের সব বিভাগে সচরাচর এবং ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বিশেষ করে নদীয়া বর্ধমান ও উত্তর চব্বিশ পরগনা বর্তমানে বাঁকুড়া জেলার গ্রাম অঞ্চলে এই সাপ ভয়ের অন্যতম কারণ।বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির রঙের সাথে এদের দেহবর্ণ মিল থাকায় বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে এ সাপ বেশি পাওয়া যায়। রাসেল ভাইপার ভারত বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। এছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, চীনের দক্ষিণাংশ, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, বার্মা ও ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া যায়।

বাসস্থানঃ এদের আক্রমণ সব চেয়ে বেশী হয়েছে ধান ক্ষেতে। তবে সাধারণত ঝোপঝাড়, শুকনা গাছের গুড়ি, ডাব গাছের নিচে, গোয়াল ঘর এই সব জায়গায় এই সাপ থাকতে বেশি পছন্দ করে।

খাদ্য ও স্বভাবঃ চন্দ্রবোড়া নিচু জমির ঘাসযুক্ত উন্মুক্ত পরিবেশে এবং কিছুটা শুষ্ক পরিবেশে বাস করে। এরা নিশাচর, এরা খাদ্য হিসেবে ইঁদুর, ছোট পাখি, টিকটিকি ও ব্যাঙ ভক্ষণ করে। অন্যান্য সাপ শিকারের সময় শিকারকে কামড় দিয়ে সাথে সাথে খেয়ে ফেলে কিন্তু হিংস্র চন্দ্রাবোড়ার শিকারকে শুধু একা নয়, তার পুরো পরিবারসহ খেতে ভালোবাসে। তাই অন্যান্য সাপ যেমন একটি ইঁদুরকে কামড় দিয়ে সাথে সাথে খেয়ে ফেলে, চন্দ্রাবোড়া সে ক্ষেত্রে কামড় দিয়ে ছেড়ে দেয়। প্রচণ্ড বিষের যন্ত্রণায় ইঁদুর যখন তার গর্তের দিকে ছুটে চলে চন্দ্রাবোড়া তার পিছু পিছু গিয়ে সে গর্তে ঢুকে সব ইঁদুরকে খেয়ে ফেলে। অন্যান্য সাপ মানুষকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও এ সাপটি স্বভাব ঠিক তার উল্টো।এরা মানুষের কাছাকাছি থাকে। তবে বিপন্নবোধ না করলে এরা কমড়ায় না।রেগে গেলে প্রচণ্ড হিস হিস শব্দ করে।প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কেবল এ সাপটির কামড়েই প্রাণ হারান।একে ‘কিলিংমেশিন’ ও বলা হয়। আক্রমণের গতি ও ক্ষিপ্রতায় এ সাপ বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মাত্র ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ে কামড়ে বিষ ঢেলে দিতে পারে। তবে মাঝে মাঝে এরা Dry bite ও দেয়। যে কারণে এর কামড় খেয়ে বেঁচে যাওয়ার নজিরও আছে। এরা ফণা তুলতে পারে না। একেবারে সামনে থেকে মাথা উঁচু করে কামড় বসায়।

বিষের ধরণঃ ভূমিতে বসবাসকারী পৃথিবীর সব সাপের মধ্যে বিষের তীব্রতায় এটি ৫ম অবস্থানে আছে। বিষের তীব্রতায় ইন্ডিয়ান কোবরার পরেই এর অবস্থান।এদের বিষদাঁত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃহৎ।বিষদাঁতের দৈর্ঘ্যে গ্যাবুন ভাইপারের পরেই রয়েছে এর অবস্থান।যে কারণে প্যান্ট বা মোজা তো বটেই, কয়েক প্রস্থ কাপড় ভেদ করেও এটা অনায়াসে ছোবল দিতে পারে। চন্দ্রাবোড়ার বিষ হোমটক্সিন, যার কারণে কামড় দিলে মানুষের মাংস পচে যায়। বিষের মারণ মাত্রা মানুষের জন্য ৪০-৭০ থেকে মিলিগ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভয়ে হার্ট অ্যাটাকে অনেকের মৃত্যু হয়। অন্যান্য সাপের বেলায় ৪৮ ঘণ্টা কেটে গেলে রোগীকে নিরাপদ ভাবা হয় কিন্তু রাসেল ভাইপারের বেলায় রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ী ফেরার পথেও মারা গেছে এমন রেকর্ডও আছে।

প্রতিষেধকঃ বাংলাদেশে এ সাপের কোন এন্টিভেনম তৈরি হয় না এর যোগান আসে ইন্ডিয়া থেকে। মূলতঃ কোন সাপের জন্যই (একমাত্র লাল গলা ঢোরা বাদে) আলাদাভাবে এন্টিভেনম তৈরি করা হয় না। সব সাপের জন্য একটা কমন এন্টিভেনম তৈরি হয়, যাকে ‘পলিভ্যালেন্ট এন্টিভেনম’ বলে। এগুলো সাধারণত গোখরা,চন্দ্রবোড়া, কালাচাঁদ এবং ফুরশাঁ এই চার প্রজাতির সাপের বিষ থেকে তৈরি করা হয়। তবে ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত এক পত্রিকায় সেখানকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের স্নেক বাইট বিশেষজ্ঞ দয়ালবন্ধু মজুমদারের বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গে) দক্ষিণ ভারতের চন্দ্রবোড়ার এন্টিভেনম সিরাম কাজ করছে না।এর কারণ হিসেবে তিনি জানান বিজ্ঞানীরা চন্দ্রবোড়া সাপকে ভৌগোলিকভাবে ৩ টি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন।— দক্ষিণ ভারত, উত্তর-পশ্চিম ভারত, পূর্ব ভারত। এ ৩ টি এলাকার চন্দ্রবোড়া সাপের বিষের গঠনের ভিন্নতা রয়েছে। এ কারণে এ সাপটি নিয়ে চিকিৎসকরা চিন্তিত।

প্রজননঃ অন্যান্য সাপ ডিম দিলেও এটি সরাসরি বাচ্চা দেয়।এরা বছরের যে কোনো সময় প্রজনন করে। একটি স্ত্রী সাপ গর্ভধারণ শেষে ২০ থেকে ৪০টি বাচ্চা দেয়। তবে কোনো কোনো চন্দ্রবোড়া সাপের ৭৫টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয়ার রেকর্ড আছে।

উপকারিতাঃ এ সাপের মূল খাদ্য ইঁদুর, ব্যাঙ, পোকামাকড় ইত্যাদি।তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া ফসলেBর জমিতে ইঁদুর খেয়ে দমন করার ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফসল রক্ষা পায়।

সতর্কতাঃ এই সাপকে দেখলে নিরাপদে সরে যাওয়াই উত্তম তবে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকলে এর থেকে বাঁচা সম্ভব। যেমন-

১। আশেপাশের পুরাতন পরে থাকা গাছের নিচে খেয়াল না করে হাত না দেওয়া।

২। ধান কাটার সময় গামবুট ব্যাবহার করা।

৩। যেহেতু এরা খুবই হিংস্র তাই যে সব এলাকায় বেশী দেখা যায় সে সব এলাকায় সচেতনভাবে চলাফেরা করা এবং উপস্থিতি লক্ষ্য করলে সামনে থেকে সরে যাওয়া।

আমাদের দেশে এর বিস্তার সম্পর্কে  ২ টা মত আছে।

১। ভারত থেকে বন্যার পানিতে পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চল এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এ সাপের শারীরিক বৈশিষ্ট্য পানিতে ভেসে বেঁচে থাকার অনুকূল না, তাই এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে সবচেয়ে প্রচলিত মত এটাই।

২। আগেও ছিল। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির অপ্রতুলতার কারণে মানুষ জানত না। 

হুসাইন মুহাম্মদ সিদ্দিকিন
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়