আমি খুব কম চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থাদেখি। একের পর এক চিত্রের চলতে থাকা, বা গতিশীল চিত্রকে চলচ্চিত্র বলে। স্থিরচিত্রের সমন্বয়ে চলচ্চিত্র গড়ে ওঠে। তবে চলচ্চিত্র বলতে আমরা সাধারণত বুঝি পূর্ণদৈর্ঘ্য অথবা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে। যাকে আমরা মুভি,ফিল্ম বা সিনেমা বলে থাকি।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে চলচ্চিত্র শিল্প এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূর। আবার প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার প্রতিনিধিত্ব বা উপস্থাপনে চলচ্চিত্র রেখেছে অসামান্য ভূমিকা। এখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চলচ্চিত্র বানানো হয়। কিছু দেশে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ অঞ্চল বা একভাবে বললে চলচ্চিত্র শিল্প কারখানা আছে। বিশ্বে বড় বড় ব্যবসাগুলোর মধ্যে চলচ্চিত্র অন্যতম। বলা হয়ে থাকে যে অস্ত্রের পর সবচেয়ে বড় ব্যবসাটা হয় চলচ্চিত্র নিয়ে। তবে সে কথার উৎস জানিনা বলে বিশ্বাসযোগ্য মানি না। কিন্তু এ অসত্য নয়, তা বুঝতে পারি।

শিল্পসাহিত্যে দুটো ধারার কথা বলা হয় একটি ধারা কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থে লাভের জন্য ভোক্তার চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে আরেকটি ধারায় ভোক্তার আত্মিক বা অনুভূতির জগৎকে নাড়া দেয়ার চেষ্টা করা হয়। অবশ্য এ ধারাগুলোর মাঝে সুস্পষ্ট বিভেদরেখা টানা খুব কঠিন। মোটাদাগে আলাদা করা যায় না।

আমার আশেপাশের তরুণ-যুবকদের অনেকের দেখি চলচ্চিত্রের প্রতি বিপুল ঝোঁক দেখি। সেটা স্বাভাবিক। চলচ্চিত্র গড়ে তোলা হয় মানুষকে আকর্ষণ করতে। মানুষভেদে যে রুচিবৈচিত্র্য সে অনুযায়ী বহু রকমের চলচ্চিত্র তৈরি হয় সারা বিশ্বে। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। তদুপরি বহু-ভাষা-জানা অন্তত একাধিক ভাষা জানা মানুষ বেড়ে চলেছে। হাল আমলে ভাষা শেখার আগ্রহ বাড়ছে। আগেও দোভাষী বহুভাষী ছিল। যারা ভাষা জানেন বেশি তারা চাইলেই বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র দেখে আস্বাদন করতে পারেন। যারা ভাষা কম জানেন, তারা ইংরেজির পাশাপাশি নিজ নিজ ভাষাতেই অনুদিত চলচ্চিত্র দেখে নিতে পারেন। কাজেই চলচ্চিত্র এখন আর গুটিকয়েক মানুষের থাকছে না। মোটামুটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার মত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটাই সম্ভবত চলচ্চিত্র নিয়ে ঝোঁকের একটা বড় কারণ।

আরেকটা কারণ আছে। একটা ভালো চলচ্চিত্র বানানো কঠিন হলে আজকাল আর তা দুঃসাধ্য বা অসম্ভব বলে মনে হয়না। কোনোমতে বানিয়ে ফেলতে পারলে একদিকে যেমন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া যায়। ভালো হলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অর্থ আয় হয়, আর তা না হলে অন্তত যশ বা পুরস্কার পদক আসতে থাকে। এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে বা ফলের আশায় কর্মে নামতে চান অনেকেই।

কিন্তু চলচ্চিত্র দুই অর্থেই শিল্প একদিকে art আর্ট কলা অন্যদিকে industry ইন্ডাস্ট্রি বা industrial good শিল্পপণ্য. আমরা যে অর্থনীতিতেই বিশ্বাস করিনা কেন দারিদ্রের দুষ্টচক্রকে অস্বীকার করতে পারিনা। বিশেষত বৈশ্বিক বাজার মুক্তবাজার অর্থনীতি আর সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্যদানবদের এই যুগে একে মেনে নিতেই হয়। যত বেশি পুঁজি,তত বেশি বিনিয়োগ তত বেশি বিপণন, যত বেশি বিপণন তত বেশি লাভ, তত বেশি পুঁজি। যাইহোক, কিছু উনিশবিশ হলেও এর মাধ্যমে দারিদ্রের দুষ্টচক্র বোঝা যায়। আর এই সূত্রে চলচ্চিত্রে যত বেশি বিনিয়োগ হয় তা তত বড় বাজার ধরতে পারে। তদুপরি তার গুণগত মানও তত ভালো হয়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বিনিয়োগস্বল্পতাতে মার খাচ্ছে। এর মধ্যে আমরা কামড়াকামড়ির পাশাপাশি নানা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাকে বড় করে দেখাতে গিয়ে মূল সমস্যাকে আড়াল করতে দেখেছি অনেক বোদ্ধাদেরকেও। যার সামর্থ্য আছে সে ব্যক্তি একবেলার মধ্যহ্নভোঁজে একাই দুই হাজার টাকা ব্যয় করতে পারেন। যিনি দরিদ্র তিনি ত্রিশ টাকাতে মধ্যহ্নভোঁজে তৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু অর্থানুকূল্য পেলে, আর ত্রিশটাকায় সন্তোষজনক মানের খাবার না পেলে সেটা তিনি ত্যাগ করবেন। এখন মোটামুটি অর্থ ব্যয় না করে এমনকি নামমাত্র অর্থব্যয় করে দেশের বা বিদেশের উন্নত চলচ্চিত্র যখন দেখা যায়। কেন মানুষ সেইসব চলচ্চিত্র দেখবে? যাতে দারিদ্র্যকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয় বা কিছুতেই আড়াল করা যায় না! দরিদ্রের জীবন বা দারিদ্র্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরতেও যে অর্থ লাগে। চলচ্চিত্র দেখতে তেমন ব্যয় করতে হয়না এতো সত্য কিন্তু বিনেপয়সায় যে চলচ্চিত্র বানানো যায় না । তা কি মিথ্যে কথা?

ভালোমানের প্রেক্ষাগৃহে ৩ ঘণ্টা বসে থাকাও সুখের হতে পারে। তার সাথে একটা ভালো চলচ্চিত্র হতে পারে উপরি পাওনা। কিন্তু বিশ্বজগৎ সামলানোর ফাঁকে ফাঁকে পর্দায় চোখ বুলাতে থাকলে একটা ‘তর্কাতীত উন্নত চলচ্চিত্র’ ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এদেশে প্রেক্ষাগৃহ কমে যাচ্ছে। যেসব ভালো বা গর্ব করার মত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কথা আমরা বলি তা কি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের যে বিপুল সংখ্যক নিয়মিত দর্শক তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারে? কারণ তারা চলচ্চিত্রে দেখতে চান এমন কিছু, যা তাদের জীবনে নেই, যে জীবনের স্বপ্ন দ্যাখেন , বা দেখে সুখী হন অথবা রঙিন মদের মত গিলে মোহাচ্ছন্ন থাকতে পারেন। তেমন চলচ্চিত্র আসলে শিক্ষিত, মার্জিত, শিল্পিত, পরিশীলিত মানুষকে অস্বস্তি ভিন্ন কিছু দিতে পারে না। চলচ্চিত্র রুচি তৈরিও একটা ব্যাপার। যেদিন রঙিন মদ তৈরি শুরু হলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে, সেদিন বোদ্ধারা পাশ্চাত্যের প্রতিভা দেখতে মুখিয়ে ছিলেন। এদেশের সুশীলসমাজ বরাবরই পাশ্চাত্যের অনুগামী। এদেশের সাহিত্য যখন পাশ্চাত্যের অন্ধানুকরণ, সংস্কৃতিতেও যখন সেই প্রভাব বলয়, তখন চলচ্চিত্রে দুটো ঘটনা ঘটতে পারতো, পাশ্চাত্যের অন্ধানুকরণ অথবা, নিজদের মত কিছু করার চেষ্টা। দুঃখের বিষয় দু’টোর কোনোটিই আলোর মুখ দেখতে পায়নি। বরং দুটোর অবদ্রবণ তৈরি হয়েছে‌ (এমন মিশ্রণ যাতে দ্রব দ্রাবক ও অপরাপর বস্তু সব জায়গায় একই অনুপাত বা পরিমাণ মেনে থাকে না)। এর মধ্যে নিজেদের মত করে যে ভালো কাজ হয়েছিল তা থেকে সমাজের অভিজাতরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন । এরপর ঐ অভিজাতদের দলে যোগ দিতে প্রতিষ্ঠাকামী বা জাতে উঠতে চাওয়া লোকজনও দেশী প্রয়াসে বিমুখ হন। এর মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা বা রক্ষণশীলতা বেশ জেঁকে বসতে থাকে দেশব্যাপী। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ বা বিস্তার হয়নি, উল্টো অনুকরণমূলক প্রবণতা ছড়িয়েছে। বিভিন্ন দিকে বিভিন্নভাবে।

সাহিত্যকে বাদ দিয়ে কি চলচ্চিত্র হতে‌ পারে? ভালো গল্প, ভালো কাহিনি তো দৈববাণীর মত কিংবা স্বপ্নযোগে দেবীর দয়ায় আসবে না! আর তাই বস্তাপচা কাহিনি, সুড়সুড়িমূলক গল্প, অশ্লীল নাচগান- গালাগালি – মারামারি, সস্তা সংলাপে ভরে উঠতে থাকে বাংলা চলচ্চিত্র । বিনিয়োগ কমতে থাকে কারণ দর্শক কমতে থাকে। এর মধ্যে দর্শক কমার মধ্যে প্রেক্ষাগৃহগুলোর পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে। এখন যাদের সাধ্য নেই বিদেশের চলচ্চিত্রে স্বস্তি খোঁজার তারাই আসতে থাকেন এসব প্রেক্ষাগৃহে। আর বাকিরা নানা মাধ্যমে বিদেশী চলচ্চিত্রের দিকে মনোযোগী হন।

চলচ্চিত্র একটা শক্তিশালী মাধ্যম তিনশ পাতার উপন্যাস পড়া বোঝা শুধু সময়সাপেক্ষ নয় এমনিতেও কষ্টকর ব্যাপার অথচ ৩ ঘণ্টার চলচ্চিত্র শিরা-ধমনীতে সহজেই ঢেউ বইয়ে দিতে পারে। নানা সংকটের চিত্র তুলে ধরে সচেতনতা বাড়াতে পারে, আবার সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়ে সমাজ বদলাতে পারে। চিন্তাশক্তি বাড়াতে পারে, চিন্তার খোরাক দিতে পারে। আর কিছু না হোক নিছক আনন্দ তো দিতে পারে। সবই করতে পারে এজন্য প্রতিভা দরকার, দরকার পরিশ্রমের। টাকা পয়সা না থাকলে এসব কি সম্ভব? একজন তরুণ নির্মাতা বসে গল্প করছিলেন, হঠাৎ সাদাশার্ট কালো প্যান্ট পরা তার পরিচিত একজনকে আসতে দেখে মনে মনে একটা দৃশ্য এঁকে ফেললেন। কিন্তু এটা তো কোন প্রস্তুতি, আয়োজন, অর্থব্যয় ছাড়া চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করতে পারবেন না তিনি । নাহয় অভিনেতা ঐ পোশাকে বিনাপয়সায় কাজ করলো কিন্তু বাকি যে সেট বা চিত্রধারকের ব্যয়, ক্যামেরার যে ব্যয় প্রভৃতি তো তাকে করতে হবে। দাতব্য চিকিৎসালয় হতে পারে। স্বেচ্ছাশ্রমে ত্রাণবিতরণ হতে পারে। কিন্তু চলচ্চিত্র বানানো না হয় তর্কের খাতিরে তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলো। কিন্তু এর বিপণনে বা প্রচারণায় কি কোনো ব্যয় হবে না?

এখন যার টাকা আছে তার নিজের টাকায় যাচ্ছে তাই বানানোতে উপহাস করে তো আমাদের কোনো কল্যাণ হবে না। আবার মেধাবীদের প্রবেশাধিকার তো দিতে হবে। যারা বিদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক নায়িকার সৌন্দর্যের চেয়ে অভিনয়কে গুরুত্ব দেন। তারা দেশীয় অভিনেতা অভিনেত্রীদের দেহ নিয়ে উপহাস করেন। জনৈক ভদ্রলোকের শখ ছিল পর্দায় নিজেকে দেখবেন। কোনমতে কষ্ট করে টাকা জমিয়ে নিজের ইচ্ছে মিটালেন যখন, তখন একদল লোক সেসব প্রচার করতে শুরু করলো, সেটা তাকে উৎসাহ দিতে না উপহাস করতে বুঝে ওঠার আগেই তিনি জনপ্রিয় হলেন। এ জনপ্রিয়তা নিয়ে ঈর্ষা শুরু হলো। এসব পত্রপত্রিকার চলচ্চিত্রের খবর হলো। কিন্তু চলচ্চিত্রের জন্যে শ্রম ঘাম দিয়ে কোন প্রতিকূলতায় প্রতিভাবান তরুণগুলো এই পথ-হাঁটা ছেড়ে দিলো তা থেকে গেল অজানা।

জীবাণু ছড়ায় সুস্বাস্থ্য ছড়ায় না অর্জন করতে হয়, চলচ্চিত্র জগতের যত খারাপ দিক তা শুধু আসেইনি বেড়ে চলেছে কালের সমানুপাতে, অন্যদিকে উৎকর্ষের নামে যা এসেছে। তা হলো প্রশংসা আসলে যা করুণার নামান্তর মাত্র। এখন পুরস্কার-পদক নিয়ে তুষ্ট থাকলে আমাদের শুধু কিছু তথ্যের পীড়ন সইতে হয়। আর সহায়তার নামে মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলার টাকা লগ্নি হতে থাকে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? শুরু হবে কোথা থেকে? কোন সমস্যা সবার আগে সমাধান করা হবে?

ma