লেখালেখির ব্যাপারে মাঝে বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলতে হয়েছে। অনেকেই নিয়মিত লেখালেখি করে।অনেকে অনিয়মিত। তবে অদ্ভূত ব্যাপার ছিল কয়েকজন লেখালেখি করে, আগ্রহী কিন্তু লিখতে ভয় পায়।বিশেষ করে বর্তমান বিষয় নিয়ে। কি থেকে কি হয় তার নাই ঠিক এমন মনোভাব অথবা পুরোনো অভিজ্ঞতা।তবে ব্লগার হত্যা, কথায় কথায় থানা হাজত, সাইবার বুলিং ভয় পাওয়াই উচিৎ। আমার নিজেরও এক লেখাতেই ৪০০+ গালি খাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে।

আবার অনেকসময় বন্ধুবান্ধব উৎসাহ দেয়ার বদলে ওটা নিয়েই মজা করতে শুরু করে অবশ্য আজকাল তো সবাই সব বিষয় নিয়েই মজা করে ভাবাভাবির সময় কই। অবশ্য যে জেনারেশন আমি বই পড়ি না বলতে গর্ববোধ করে তাদের থেকে উৎসাহের আশা না করায় ভালো। বই তো দূর অনেককে একটু বড় মেসেজ পাঠালেও মাথাব্যথা শুরু হয়। টাইপিং এ তো ভালো আছি কথাটা বিবর্তিত হয়ে গেছে f9 এ। অপ্রয়োজনীয় কথার ভিড়ে প্রয়োজনীয় কথা সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে।

ট্রল আর মিম এ তো ফেসবুক ভর্তি থাকে। না এমন না ট্রল বা মিম কোনোটা খারাপ। বরং খুব জটিল বিষয় সহজ করার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। কিন্তু আজকালকার অবস্থা দেখে ভালো ধারণা পোষণ করার জায়গা থাকে না। বুঝে না বুঝে যা ইচ্ছা গণহারে শেয়ার হতে থাকে। ফলাফল বিনোদ ও হয়ে যায় একটি ভাইরাল ইস্যু। একজন ইউটিবারের বক্তব্য সে এতো কষ্ট করে, যত্ন করে একটা ভিডিও বানিয়ে কয়েকটা ভিউয়ার পায় আর কয়েকটা কমেন্টের ফলাফল সহজেই ইস্যু ভাইরাল।

টিকটক আর লাইকি নামে অবশ্য খুব নাক শিটকানি দেখা যায়। এখানকার বৈশিষ্ট্য হলো কোনো গান, মিউজিক বা সংলাপের সাথে নিজের করা নাচ অভিনয় বা ছবি জুড়ে দেয়া। খারাপ কিছু অবশ্য আমি খুঁজে পায়নি। তবে কিছু মানুষ ভাইরাল ট্রেন্ড ধরে উদ্ভট কিছু বানিয়ে ফেলে। ভালো কনসেপ্টগুলো রেখে আবার এই উদ্ভট কনসেপ্টগুলোই ভাইরাল হয়। কারণ আমাদের খুব পশ জেনারেশনটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে থাকে। তারা ওদের উদ্ভট কাজকর্ম জাজ করে সেটা দিয়ে ট্রল মিম বানিয়ে আমি কত কুল এটা দেখাতে মরিয়া হয়ে যায়। ভাবিই না এটা যার যার রুচি পছন্দ। খারাপটা দেদারসে শেয়ার হয়। আর যে ভালোটা করে সেটা পড়ে থাকে, পরেরবার আরেকটা কাজ করার উৎসাহ আর থাকে না।

ভালো কাজগুলো আড়াল হওয়ার সাথে এখন সেলিব্রেটি মহল ভরে গেছে হিরো আলম, রিপন ভিডিও বা অপুর মত লোকজন। যদিও এদেরকে ছোট করছি না। হিরো আলমের নিজের কথা হলো সে ভালো কাজ করতে চায় হাসির খোরাক না হয়ে থেকে। কেউ তাকে কাজ শেখাক, সে যা পেরেছে করেছে, ভালো কাজের সুযোগ হলেও সে করবে। কিন্তু তাদের ভালো কাজ তো আবার আমরা চাই না। আমাদের ভাইরাল টপিক হলেই হলো।

কিছুদিন ভোকেশনালের কিছু নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছি। সেখানে খুব চটপটে কিউট একটা ছেলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে জানালো সে নায়ক হতে চায়। তো জিজ্ঞেস করায় জানালো সে লাইকি দিয়ে প্রিপারেশন নিচ্ছে তার অনেক ফলোয়ারস। নাক সিটকে বললাম লাইকি দিয়ে কোনোদিন নায়ক হওয়া যায় নাকি? সে বললো তো কিভাবে হবে? সত্যি তো কিভাবে হবে? শিক্ষকা হিসেবে নিজের বান্ধবী শিলার উদাহরণ দিয়ে বোঝালাম পড়াশোনা করেও করতে পারবা।কিন্তু সত্যি বললাম কি? কতজন পারে? সবাইকে একছাচে ফেলে দেয়ার ফল কি আদেও ভালো হয়?

আমার প্রিয় একজন সাউথ কোরিয়ান আইডলের কথা ধরা যাক। ১২ বছর বয়সেই তার ওপর চোখ পড়ে এসএম এন্টারটেইনমেন্টের মত বড় প্রোডাকশন হাউজের যারা তাকে সেই ছোট থেকে ট্রেনিং করিয়েছে, পড়াশোনা করিয়েছে। এখন সে ইন্টারন্যাশনাল একজন সেলিব্রেটি। এমন একজন না অনেক আছে। অনান্য দেশ এমনকি পাশের দেশেও শিল্প সাহিত্য চর্চার পরিবেশ যথেষ্ট ভালো। আমার এদেশে তেমন কিছু চোখে পাড়েনি। বরং ক্লাস টু থেকে কিভাবে ছেলেমেয়ে বৃত্তি পাবে তার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সবাইকে জোর করে এক ছাচে ঢুকিয়ে দেয়া।

শিল্প জগতের কথা বাদ দেই, আবার উচ্চশিক্ষিতের কথায় আসা যাক। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে কেবলমাত্র বিসিএসের দৌড় চলতে থাকে। ইন্জিনিয়ারিং, মেডিকেল এরও এমন বেহাল দশা যে তাদেরকেও এই দৌড়ে সামিল হতে হয়। অবশ্য তাও ভালো মেধা পাচার হওয়ার থেকে। দেশে থাকতে হলে অবশ্য সরকারি চাকরি ছাড়া টেকা সম্ভব না। মুক্ত চিন্তার কথাগুলো কিছু পাগলের প্রলাপের মতই লাগে এর মধ্যে।

মুক্ত চিন্তা করা যাবে না, মেধাবীদের মূল্যায়ণ করা হবে না। তারা হয় দেশ ছেড়ে যায় অথবা স্রোতে গা ভাসায়। তাহলে সিস্টেমে কেমন হচ্ছে? একবার এক সাবরিনা ধরা পড়ল। প্রথম কাজ হলো টাইমলাইন ভরিয়ে ফেলতে হবে এমন হট টপিকে। তার ব্যক্তিজীবন, হাতের ট্যাটু, কিভাবে সে প্রথমবার মিডিয়াকে ফেস করেছে কোনোটা বাদ দেয়া যাবে না ট্রল করতে। কারও মাথায় আসলো না ছোট থেকে তৈরি হওয়া ওই ছাঁচে পড়ে আমরা সবাই সাবরিনা হয়ে যাচ্ছি নাতো? এই সিস্টেম কেবল সাবরিনাদেরকে দিয়ে ভর্তি নাতো?

মজার ব্যাপার যে পশ জেনারেশন সাবরিনা ট্রল নিয়ে ব্যস্ত তারাই আবার কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনলাইন ক্লাসের খরচ দেয়া হবে শুনে সেই টাকা নিয়ে কোথায় ট্যুর দেবে তার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। তারও আগে এরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অপকর্ম নামক গ্রুপ খুলে স্কুল কলেজে কি অপকর্ম করেছে তা নিয়ে বড়াই করতে ব্যস্ত। অবশ্য এখন লোভ না সামলালেও এরা চাকুরীজিবনে ঠিকই কোটি টাকার লোভ সামলে রাখবে।

করোনার মত মহামারীর সময়েও করোনা থেকে বেশি ভয় পেতে হয় দুর্নীতিকে। এক পিচ্চি বললো বিদেশিরা আমাদের ভ্যাক্সিন ফ্রি দিলেই কি? ঠিকই ভাগ হয়ে যাবে।গরীবরা পাবে না আবার করোনা হবে। বলবেই বা না কেন? ত্রাণ চুরি,পিপিই চুরি,রিপোর্ট জালিয়াতি কোনদিকটা ঠিক আছে?

সবাই খাবো খাবো একটা ভাব নিয়ে আছে। এটা একদিনে হয়নি। কেউ দুর্নীতিবাজ হয়ে জন্মায়নি এই সিস্টেমে পড়ে আস্তে আস্তে তৈরি হয়েছে। আমরা খুব পরিবর্তন করে ফেলবো তা ভেবেও লাভ নাই। আমরা এমন সময়ে আছি ভালো লেখালেখি বা ভালো চিন্তা করার আগে ভয় পেতে হয়। এসব আমাদেরকে অনেক বেশি বিবেক বিবেচনার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন চিন্তাশক্তিই হারিয়ে ফেলছি। সিস্টেমটাও আগের থেকে অনেক বেশি দুর্বল। পরিবর্তন একদিনে সম্ভব না। তবে এখনো চেষ্টা না করলে সামনের অধঃপতন আরও ভয়াবহ। গোড়া বাদ দিয়ে মাথায় পানি দিয়েও লাভ নাই।যদি পরিবর্তনের শুরু করতে হয় তো ছাঁচ থেকেই শুরু করতে হবে।

 

ইয়াসমিন শিরি 
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।