২০০৪ সালের অক্টোবর মাস । ফুরফুরে মন নিয়ে দুবাই এয়ারপোর্টে বসে আছি । দেড় ঘণ্টা পরেই ঢাকার ফ্লাইটে উঠবো । সাত সপ্তাহের লন্ডন সফর শেষে দেশে ফিরছি । এত লম্বা সময় এর আগে দেশের বাইরে থাকি নাই । ছোট মেয়েটার আশি ভাগ কথা তখন ছিলো প্রশ্নবোধক । তাও আবার এক শব্দের প্রশ্ন; ‘কেনো’? মেয়ের সেজ চাচা এই জন্য নামই দিয়েছিলো ‘মিস কেনো’ । সেই ‘কেনো’ প্রশ্নটা শোনার জন্য মন উচাটন । তবে এই উচাটন অনুভুতিটাও উপভোগ করছি । কারন হলো পেশাগত সাফল্য । লন্ডনে থাকা অবস্থাতেই ঢাকা অফিসে ডিরেক্টর হিসাবে আমার পদায়ন নিশ্চিত হয়েছে । ম্যানেজিং ডিরেক্টর মার্কের সাথে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা করা হয়েছে । কোম্পানির সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর সব কাজ ঢাকা থেকে হবে, সম্ভব হলে সাপোর্ট এর ৫০ ভাগও ঢাকা থেকে হবে, আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি যে প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট এর দায়িত্বে আছি সেটাই হবে কোম্পানির অন্যতম প্রধান প্রডাক্ট ।

তখন বয়স কম । পেশাগত জীবনে একটার পর একটা সিঁড়ি পার হই আর নিজেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় । শক্তির কবিতা…

আসলে কেউ বড়ো হয় না, বড়োর মত দেখায়, নকলে আর আসলে তাকে বড়োর মত দেখায় গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়াও, দেখবে কত ছোটো, সোনার তাল তাংড়ে ধরে পেয়েছো ধূলিমুঠো।

পড়া ছিলো ঠিকই, কিন্তু এখনকার মতো উপলব্দিতে পৌছায় নাই । হয়তো অল্প বয়সে ‘সুখী হরমোন ডোপামিন’ এর প্রভাব অনেক বেশী থাকে । যাই হোক সুখী মন নিয়েই এমিরেটস এর ফ্লাইটে উঠলাম । কিন্তু উঠেই দুটো কারণে খুব বিরক্ত হলাম । প্রথমটা আগেই জানা ছিলো, তিন সিটের মাঝের সিট আমার । এটা হলো একেবারে ‘কাবাবের মধ্য হাড্ডি’ টাইপ সিট । ডান পাশের জন ঘুমে যখন আপনার কাঁধে ঢলে পড়বে বাম পাশের জন ঠিক তখন কনুই এর গুতা দিয়ে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে । দ্বিতীয় কারণ হলো সিটের সামনের জায়গাটুকুও খুব সংকীর্ণ । অথচ একই এয়ারলাইন্সের লন্ডন থেকে দুবাই এয়ারক্রাফটটা একেবারেই ভিন্ন ছিলো । এয়ারলাইন্সও গরীব, বড়লোক দেশ ভালোভাবেই চেনে, তাই বিরক্তিটা মনে চেপে রেখেই বসে পড়ি ।

ফ্লাইটের আশি ভাগ যাত্রী প্রবাসী কর্মজীবী বাঙ্গালী । অনেকেরই হাতের লাগেজ বেশ বড়, সেসব লাগেজকে ঠেলে ঠুলে ওভারহেড কম্পার্ট্মেন্টে ঢুকাতে বিমান বালারা পেরেশান হয়ে যাচ্ছে । শেষ পর্যন্ত না পেরে অনেক ব্যাগেরই জায়গা হলো পায়ের নিচের ফাঁকা জায়গাটুকুতে । আমার দুই পাশের দুই যাত্রীরই একটা করে লাগেজ পায়ের নিচে । সংকীর্ণ জায়গা, সংকীর্ণতর হয়ে গেলো । আমার দুই পাশের দুই যাত্রীর সামান্য বর্ণ্না দিয়ে রাখি । এক পাশের জনের চৌকো মুখ, কোটরাগত চোখ আর মাথা সাজাবার জন্য চুলের পরিবর্তে টাক সাজাবার জন্য যে কয়টা চুল দরকার হয় তার চাইতে কিঞ্চিৎ কম চুল । আর জানালার পাশের জনের নাম ইতিমধ্যে জানা হয়ে গেছে, তায়েব আলী । ছোটখাটো মানুষ, বিশেষত্ত্বহীন চেহারা, হাসলে লাল মাড়ি দেখা যায়, বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, সৌদি আর দুবাই মিলে বিদেশে আছেন চৌদ্দ বছর । এত অল্প সময়ে যখন এত কিছু জানা হয়ে যায় তখন বোঝাই যাচ্ছে লোকটা অনেক কথা বলে । দুই পাশের দুই জনের চেহারায় একটা মিল আছে । দুজনেরই প্রখর রোদে পোড়া চেহারা ।

নির্ধারিত সময়েরও প্রায় এক ঘন্টা পরে প্লেন টেক অফ করলো । টেক অফ করার দশ মিনিট পরেই এক নাটক দেখতে হলো । নাটকই বলবো, কারণ এই দৃশ্য আমি এখন পর্যন্ত আর দেখি নাই । প্লেন টেক অফ করার পরেই তায়েব আলী সিটের নিচের ব্যাগ ধরে টানাটানি করতে লাগলো । পেট মোটা ব্যাগ খুলতে একটু সময়ই লাগলো । ব্যাগ খুলে কি বের করেছে খেয়াল করি নাই, কিন্তু একটু পরেই আর খেয়াল না করে উপায় থাকে না । শুধু আমি না তিন চারজন বিমান বালাও খেয়াল করতে বাধ্য হয় । কারণ তায়েব আলী তখন সিটের উপর দাঁড়িয়ে । বিমান বালা, ‘এক্সকিউজ মি স্যার, এক্সকিউজ মি স্যার, প্লিজ সিট ডাউন, হোয়াট আর ইউ ডুয়িং’ বলতে বলতে এগিয়ে আসে । কিন্তু তায়েব আলী নিরুত্তাপভাবে নিজের কাজ করে যেতে থাকে । কাজটা হলো প্যান্ট খুলে লুংগি পড়া । বিমান বালারা ততক্ষণে আর্তনাদ করছে । কিন্তু তায়েব আলী যেনো শুনতেই পায় নাই । সময় নিয়ে মাথার উপর দিয়ে লুঙ্গি গলিয়ে মুখ দিয়ে লুঙ্গিটা ধরে প্যান্ট খুলে অবশেষে লুঙ্গিতে একটা গিট দিয়ে সিট থেকে নেমে দাঁড়ায় । আমি হতবাক হয়ে যাই । বিমানবালারা তখন বিদ্রূপের হাসি হাসছে । হঠাৎ মনে হলো বিমানবালারা পরোক্ষভাবে আমাকে নিয়েই হাসছে…সমস্ত বাঙ্গালীদের নিয়েই হাসছে । নকলে আর আসলে মিলে আমার যে বড়োত্ত্বটুকু নিয়ে শান্তিতে ছিলাম সেখানে প্রবল আঘাত লাগলো । খুব রুঢ় কন্ঠে বললাম, এইটা কি করলেন ।

তায়েব আলী লাল মাড়ি বের করা হাসি দিয়ে বললো, ইট্টু আরাম কইরা বইলাম l ।

-সব জায়গারই তো একটা নিয়ম কানুন আছে ।

আমি মুখ আরো কঠোর করে বললাম ।

-এইডা কি বেনিয়ম ।

আমি তো স্যার সব সময়ই এইডা করি ।

-বিমান বালারা হাসাহাসি করলো ।

-স্যার হেরার কতা বাদ দেওহাইন l

হ্যারা লঙ্গী ফরণের মজা বুজতো না l

-বিদেশে আসলে দেশের সন্মানের কথাও ভাবতে হয় । আমি শেষ চেষ্টা করি । -স্যার মস্করা করুইন । লুঙ্গি পরলে দেশের ইজ্জত যাইবো না এইডা আমি বালা কইরাই জানি ।

আমি হাল ছেড়ে দিলাম । আজ এতকাল পরে এটা নিশ্চিতভাবেই জানি আসলেও প্লেনে লুঙ্গি পরলে দেশের ইজ্জৎ নষ্ট হয় না কিন্তু ব্যাংকের টাকা চুরি করে বিদেশে আরাম আয়েশে থাকলে দেশের ইজ্জৎ নষ্ট হয় ।

-স্যার তো কোইসুইন লন্ডন থাইক্কা আইসুইন l লন্ডনের ট্যাহার তো হুনসি অনেক দাম l স্যার কত ট্যাহা বেতন ফাইন ?বেশী কথা বলা তায়েব আলী একটু পরেই জিজ্ঞাসা করে । শুনে আমার মেজাজটা আবারো খারাপ হয় । তাও ভদ্রভাবে উত্তর দেই, লন্ডনে আমি মাত্র দুইমাসের জন্য এসেছিলাম, ঐখানে আমি চাকুরী করি না । -তাও স্যার ধরোইন আফনে লন্ডনও চাকরি করোইন, কত ট্যাহা বেতন ফাইতাইন ? -হয়তো পাঁচ লাখ টাকা । প্রশ্নের সরলতার জন্যই হয়তো উত্তরটা দেই । -ইসস স্যার কুনুবায় লন্ডন যাইতাম ফারতাম l আফনের তিন ভাগের এক ভাগ বেতন ফাইলেও তো তিন/চাইর বছরের বেশি বিদেশ করন লাগলয় না l আমি কিছু না বলে চুপ করে থাকি । -চইদ্দ বছর বিদেশ করলাম l আরো কতদিন যে করন লাগবো l এইবার দেশও যাইতাসি চাইর বছর ফরে l আরো আগেই যাওনের কতা আসিন l ছুডু বাইডার সরকারি চাকরির লাইগ্যা ঘুষ দেওন লাগলো অনেক ট্যাহা l তারফরে আরেক বাই বিয়া করলো l বাবা অন্ধ, হের চিকিৎসা আছে l খরচে কুলায়া উঠতাম ফারি নাই l -আপনি বিয়ে করেন নাই । -করসিলাম স্যার l বউ খুব সুন্দর আসিন l বিদেশ থাহইন্না জামাই কি কুনু কামে লাগে l আরেক বেডার সাথে গেসে গা l বাবা আবার মেয়ে টিক করসুইন l এইবার বিয়া কইরা ছয় মাস থাকবাম l আল্লায় দিলে বউ যুদি ফুয়াতি অয় হের ফরে বিদেশ যায়াম l বাইচ্চা-কাইচ্চা অইলে মাইয়া মানুষ আর বাইরম বাইরম করতো না l টিক কইসি না স্যার l

এই কথার কি উত্তর দিতে হয় তাও জানি না । তাই আবার চুপ থাকলাম । এর মধ্যে প্লেনে খাবার দিয়ে দেয়া হয়েছে । বিমানবালা কি ড্রিঙ্কস নেবো, জিজ্ঞেস করতেই আমি জবাব দিলাম কোক । তায়েব আলীকেও একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করাতে তায়েব আলী উত্তর দিলো ওয়াইন । -এইডা জিগানির কি আছে l ফইসা দিয়া টিকেট কাটছি, মাল না খায়া ফানি খাইতাম নিহি l

আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললো তায়েব আলী । আমার আবারো মেজাজ খারাপ হলো । এরপরে একটু পরপরই তায়েব আলী লাইট জ্বেলে বিয়ারের কথা বলতে লাগলো । দুইবার দেবার পরে বিমানবালারা আর এদিকে আসাই বন্ধ করে দিলো ।

-তিন/চাইর বছর ফরে একদিন ইট্টু মাল কাই l বেডিরা হেইডাও দিতাছে না l ফইসা দিয়া টিকেট কাটসি না l নিজের মনেই গজগজ করতে থাকে তায়েব আলী । শুনে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগে । -দেখুন আমার মাথা ধরেছে । আমি একটু চোখ বন্ধ করবো । আপনি এত বিরক্ত করলে তো অসুবিধা । -টিক আছে, টিক আছে স্যার আফনে ঘুমাইন আমি সুলেমানের সাথে গিয়া বই l বলে তায়েব আলী চলে যায় । কিন্তু আধা ঘন্টা পরেই আবার ফিরে আসে । হাতে এম্বারকেশন কার্ড । স্যার এইডা ইট্টু ফুরন কইরা দেইন না l -কেনো আপনি পড়ালেখা জানেন না । -জানি স্যার l তিন/চাইর বছর ফরে কই কিতা লেখবাম .. ভুল অইবোই l -তিন/চার বছর পরে প্লেনে উঠে মাল খাইতে তো ভুলেন না । আর আমার কাছে কলমও নাই । এখনো মাথা ধরে আছে । বিরক্ত করবেন না । আর শোনেন একটু ভদ্র হইতে চেষ্টা কইরেন । খুব রুঢ়ভাবে উত্তর দেই । এই লোকের এমন ব্যবহারই প্রাপ্য, মনে মনে বলি । -বুঝছি স্যার অনেকেরই প্লেনে খুব মাথা ধরে । আমি যাই সুলেমানের সাথে বইসা ফর্ম ফিলাপ করি ।

এরপরে তায়েব আলী আর নিজের সিটে ফেরে নাই । প্লেন ঢাকায় ল্যান্ড করে । লাগেজ নিতে নিতেই ছোট ভাই ফোন করে । গাড়ী নাকি জ্যামে আটকা, আসতে সামান্য দেরী হবে । আমি লাগেজ নিয়ে বাইরে দাঁড়াই । একটু দুরেই এক জটলার মাঝে তায়েব আলীকে দেখি । এর মাঝেই আবার লুঙ্গি বদলে প্যান্ট পরে নিয়েছে । বয়সের ভারে নুয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধ তায়েব আলীর এক হাত শক্ত করে ধরে আছে । আর এক হাত দিয়ে তায়েব আলীর মুখ, হাত, মাথা সব হাতড়ে হাতড়ে দেখছে । বুঝতে পারি উনি তায়েব আলীর অন্ধ বাবা । শুধুই স্পর্শের মাধ্যমে প্রবাস ফেরত সন্তানকে অনুভব করার আকুল, সপ্রাণ চেষ্টা । পুরো দৃশ্যটার মধ্যে কি যেনো ছিলো, আমার ভিতরটা আমুল নড়ে ওঠে… ভিতরে কি যেনো ভিজে যেতে থাকে…আমি চোখ সরাতে পারি না ।

এর মধ্যে তায়েব আলীও আমাকে দেখতে পায় । পায়ে পায়ে আমার কাছে চলে আসে, দঙ্গলসহ । -স্যার দেহইন সবাই মাইক্রো বারা কইরা আয়া ফরসে l এই যে আমার দুই বাই, বাইয়ের বউ, চাচাতো দুই বাই l আর এই অইলো আমার বাবা l বাবা এই স্যার আমার পাশের সিটো আসিন l কুব বালা মানুষ l

বলে তায়েব আলী অন্ধ বাবার একটা হাত আমার হাতে ধরিয়ে দিলো । বৃদ্ধ আর এক হাত দিয়ে তখনো তায়েব আলীকে শক্ত করে ধরে রেখেছে । বয়সের বলিরেখা মুখে । কিন্তু হাতটা আশ্চর্য কোমল । -স্যার আমার ছেলেডার লাইগ্যা দুয়া করবাইন l হের মতো বালো ছেলে স্যার এই দুইন্নাইত নাই, হে না থাকলে স্যার আমরা না খায়াই মইরা গেলাময় l গ্রামের আরো কত লুকের যে হে উপকার করছে, কইয়া শ্যাস করন যাইতো না l আরো অনেকেই আইতো চাইছিন l এক গাড়ীত বেশি মানুষ আনতাম ফারসিনা l স্যার আমার ফুলাডা কত বালা আফনে চিন্তাও করতে ফারতাইন না l ফুলাডা আমার ট্যাহার লাইগ্যা দুইডা চাকরি করে … টিক মতো খায়না, ঘুমায়না .. আমার ফুলাডার লাইগ্যা দুয়া করবাইন l

বলতে বলতে বৃদ্ধের কন্ঠ ধরে আসে । আমি দুই একটা কথা বলতে চাই কিন্তু কি যেনো গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকে…বলতে পারি না ।

সেই থেকে প্রতি ফ্লাইটে একটা কলম পকেটে রাখি । যেই ফর্ম ফিলাপ করতে বলে, করে দেই । আশায় আছি একদিন তায়েব আলী ফর্মটা এগিয়ে দিয়ে বলবে,স্যার এইডা ইট্টু ফুরন কইরা দেইন না l

মোস্তাফিজুর রহমান টিটু – লেখক