মগবাজার থেকে মতিঝিল আসতে পুরো সোয়া ঘণ্টা লাগলো । সকাল সাড়ে সাতটার আগে বাসা থেকে বের হলে অবশ্য লাগে ২৫ মিনিট । প্রতিদিন সেরকমই বের হয় হাসান সাহেব । আজও বের হচ্ছিলো এমন সময় স্ত্রী সেলিনা এসে বলে… -শোনো আজকে কি একটু বাজার করে দিতে পারবে । আসলে গতকালই দরকার ছিলো । ভেবেছিলাম কোনোমতে শুক্রবার পর্যন্ত চালাতে পারবো । আজকে দেখি তেল নাই, পিয়াজ আর লবণও নাই । একটু করে দিয়ে যাবে । -অয়নতো বাসায় আছে । ওকেই বলো না । নরম করেই উত্তর দিয়েছিলো হাসান । -অয়নকে দিয়েতো একটা দুইটা জিনিষ আনা যায় । এইসব বাজার কি পারবে ? সব সময়ের মত নরম ভীরু কন্ঠে বলে সেলিনা । -তোমার ছেলের বয়স কিন্তু একুশ । কচি খোকা না । আরো কয়েকটা কঠিন কথা বলতে গিয়েও থেমে যান হাসান সাহেব । কেমন ভীত মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে সেলিনা । আগে অনেক রাগ হলেও আজকাল কেমন মায়া হয় হাসান সাহেবের । ঐ ভীত মুখ দেখে । -কি কি লাগবে মুখে বলবে নাকি লিস্ট করেছো ? -লিস্ট করা আছে ।

তারপর বাজার করে অফিসে রওনা দিতে দিতে নয়টা পার হয়ে যায় । মালিবাগ মোড়ে বিশাল জ্যাম । কারণ হলো একটা বাস আর একটা বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে লেগে গেছে । এর মাঝে একটা বাসের মালিক মনে হয় নেতাগোছের কেউ । ব্যস …আর কি ! এসব দেখতে দেখতে ঘেন্না ধরে গেছে । হাসানের রাগটা না হয় একটু বেশী…সবাই তাই বলে । কিন্তু বেশীরভাগ মানুষের হয়তো অনুভুতিই নষ্ট হয়ে গেছে । অথবা এটাই নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে । নাহলে দিনের পর দিন এসব চলে কিভাবে !?

শাপলা চত্বরে যখন বাস থেকে নামলো হাসান সাহেব তখন ঘড়ির কাটা সকাল সাড়ে দশটা ছুই ছুই । জুলাই মাস । গরমে পিঠের দিকে শার্ট কিছুটা ভিজে গেছে । দা হাতে রাস্তার পাশে ডাবওয়ালাকে দেখে তেষ্টাটা তীব্র হয় । একবার ভাবলেন একটা ডাব কিনে খাই । কিন্তু গত মাসেই অফিসের শরীফ সাহেবের কথা মনে পড়লো । রাস্তার পাশের ডাব খেয়েই বেচারা আট দিন হাসপাতালে ছিলেন ।

তিরিক্ষি মেজাজ নিয়েই চার তলায় নিজের অফিস রুমে ঢোকেন হাসান সাহেব । আজকেও এসি কাজ করছে না । গতকাল দুইজন লোককে দেখেছিলেন কাজ করতে । ফ্যানটা ছেড়ে টেবিলে বসতেই আপার ডিভিশন ক্লার্ক জলিল সাহেব রুমে ঢোকেন । -স্যার এর মনে হয় আজকে একটু দেরী হইলো ? -হ্যা কেনো কেউ খুজেছিলো ? -খোঁজার মানুষের কি অভাব আছে । জানেন না এই অফিস । -জলিল সাহেব এসিটা কবে ঠিক হবে ? গরমেতো মারা যাচ্ছি । -কালকেতো দুইজন আসছিলো । বোঝেন না সরকারী অফিসের কাজ । দশটাকার কাজে একশ টাকার বিল বানাইবো কিভাবে সেইটাই ধান্ধা । আমি খবর নেবো নে স্যার । দুই একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে । এখন এই ফাইলটা একটু ছাইড়া দেন স্যার । ক্লায়েন্ট অনেকদিন যাবত ঘুরতাছে । -ঠিক আছে রাখেন । আমি একটু দেখে আপনাকে খবর দেবো । জলিল সাহেব আপনার বড় ছেলে কোথায় পড়ছে ? ইচ্ছা করেই হাসান সাহেব অন্য প্রসঙ্গে যান । জলিল সাহেব সিবিএ এর নেতা । সে যখন নিজে ফাইল নিয়ে আসছে তখন বড়সড় কোনো ঘাপলাই আছে । এখন মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে । আর মেসির মত ড্রিব্লিং করে ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে যেতে হবে । এতদিনে এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন হাসান সাহেব । -প্রাইভেট ইউনিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে স্যার । আগামী বছরেই বাইরে পাঠাইয়া দেবো । ছোটটাও এই বছর একই ইউনিভার্সিটিতে ঢুকলো । -খরচ কেমন ? -মেলা খরচ স্যার । কিন্তু কি করুম । পোলাপানের ভবিষ্যৎ … যাই তাইলে স্যার । কল কইরেন । বলে রুম থেকে বের হয়ে যায় জলিল সাহেব ।

আজকাল এক একটা ছেলে মেয়েকে পড়াবার খরচ এত বেশী …বিশ বছর আগে কেউ চিন্তাও করতে পারতো না । নিজের একমাত্র সন্তান অয়নও একটা প্রাইভেট মেডিক্যালে পড়ছে । বাপরে যা খরচ । প্রয়াত বাবা মগবাজারের মত জায়গায় পৌনে তিন কাঠা জমি রেখে গেছিলো বলে একটু স্বস্থি । ডেভেলপারকে দিয়ে সেখানে ফ্লাট করা হয়েছে । ভাগে দুইটা পেয়েছেন । একটায় থাকেন আর একটা ভাড়া দেওয়া । এটা না থাকলে … -হ্যালো দাদা । ফোন আসাতে চিন্তার জাল ছিড়ে যায় হাসান সাহেবের । -তুই কি বিকালে বাসায় থাকবি ? ওপাশ থেকে বড় ভাইয়ের জলদগম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে । -কেনো দাদা ? -নাহ তুই বাসায় থাকলে একটু আসতাম । -অফিস থেকে বের হতে একটু দেরী হতে পারে । তুমি ঠিক সন্ধ্যার পরে চলে আসো । -গতকাল নজরুল ভাই বাসায় এসেছিলো । -কোন নজরুল ভাই ? -ঐযে আব্বার কিরকম চাচাতো ভাইয়ের মেয়ের জামাই । গ্রাম থেকে আই এ পাশ করে আমাদের বাসায় আসলো চাকুরী খুজতে । যার জন্য তুই আর আমি এক মাস মাটিতে বিছানা করে ঘুমালাম । সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় আমাদের টু ইন ওয়ানটা নিয়ে যে সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান ‘দূর্বার’ শুনতো …আব্বা এদিকে পৌনে আটটায় বিবিসি শুনবে …কিন্তু চাচাত ভাইয়ের মেয়ের জামাই দূর্বার শুনছে … মনে আছে ? -খুব মনে আছে । এক মাস ঢাকা থেকে সে তার যোগ্য চাকুরী না পেয়ে গ্রামে ফিরে গিয়েছিলো । তা এসেছিলো কেনো ? -আবারো চাকুরী । এবার তার নিজের মেয়ের জামাইয়ের জন্য । আরো কিছু মজার কথা বললো । তোকে বলবো । তোর সাথে আরো কিছু কথা আছে । -ঠিক আছে চইলা আইসো । -শোন একটা মজার জিনিষ জানলাম । -কি? -হার্ট এটাকের বাংলা কি জানোস ? সন্ন্যাস রোগ । শরৎচন্দ্রের বইতে পড়লাম । অদ্ভুত না ?

এভাবেই আরো কিছুক্ষণ আলাপ করে ফোন রাখেন হাসান সাহেব । মিজান সাহেব হাসান সাহেবের বড় ভাই । ছয় ভাই বোনের মধ্যে আড়াই বছরের বড় এই ভাইয়ের সাথেই ঘনিষ্ঠতা বেশী হাসান সাহেবের । ছেলেবেলায় একসাথে খেলেছেন, বড় ভাই একটু লম্বা হলেই তার ফেলে দেওয়া শার্ট, প্যান্ট পরেছেন এমনকি ভুল করে একই মেয়ের জন্য প্রেমপত্রও লিখেছেন । বছর দুই আগে সেনাবাহিনী থেকে কর্নেল হিসাবে অবসর নিয়েছেন বড় ভাই । বড় মেয়ে বিয়ে করে আমেরিকাতে, ছেলেটাও গত বছর কানাডা চলে গেলো পড়াশুনা করতে । শান্ত, নিরুপদ্রব কিন্তু প্রায় শূন্য ঘরে বড় ভাই মিজান সাহেবের এখন অফুরন্ত অবসর । প্রায়ই ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা করতে চলে আসেন । এমনকি এই অফিসেও দুই তিনবার এসেছেন । দাদার খুব ইচ্ছা মগবাজারে পৈত্রিক বাসায় ফিরে আসা । কিন্তু ভাবী উত্তরার বাসা ছেড়ে আসতে নারাজ । এ নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়ন চলছে । হয়তো সে কথাই বলতে বিকেলে আসবেন দাদা । এরপরে অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন হাসান সাহেব । ঠিক দুপুরে হঠাৎ সেক্রেটারি আসলো অফিসে । এরকম সময়ে যা হয় অফিসজুড়ে ব্যস্ততা বেড়ে যায় । যে লোক অফিসের টেবিলে নিয়মিত ঘুমায় সেও গভীর মনোযোগে ফাইল দেখতে থাকে । হাসান সাহেব সিনিয়র অফিসার বলে সারাটা সময় সেক্রেটারির সাথে থাকতে হলো । ঠিক দুইটার সময় সেক্রেটারি বিদায় নেবার পরে আবার নিজের টেবিলে এসে বসেন হাসান সাহেব । মাথাটা কেমন ঘুরছে । বছরখানেক আগে ডায়াবেটিস ধরা পরেছে । খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম করলেই এমন হয় । কিন্তু এই হতচ্ছাড়া অফিসে নিয়ম মেনে চলাওতো কঠিন । ব্যাগটা খুলে খাবারের বক্স বের করেন । দুটা রুটি, আলু আর পটলের সাথে শিং মাছের তরকারি, কাটা ছাড়াতে যেনো সুবিধা হয় সেইজন্য মাছের মাঝখানের টুকরা গুলো যত্ন করে দেওয়া । আর একটা বক্সে শসা, টমেটো, পিয়াজ, ধনেপাতে আর কাচামরিচ । সব আলাদা আলাদা করা । আগে থেকে মিশালে নাকি সালাদের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় । খেতে খেতে মফস্বলের মেয়ে স্ত্রী সেলিনার গভীর মমতাময় ভালোবাসা টের পান হাসান সাহেব । নিত্যকার মতো । হায় স্ত্রীর কাছে নিজের রাগ যেভাবে প্রকাশ করেছেন ভালোবাসাটুকু কি সেভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন ? আজকাল মনে হয় মানুষ শুধু শারীরিকভাবেই প্রতিবন্ধী হয় এমন না । মনের আবেগ প্রকাশেও অনেকের প্রতিবন্ধকতা থাকে…নিজের যেমন আছে ।

খাওয়া শেষ হতে না হতেই মোবাইল বাজে । ফোনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন হাসান সাহেব । “বড় ভাবী কলিং “ …বড় ভাবীতো সাধারনত ফোন করেন না …করলেও সেলিনাকে করে …তাহলে ? -হাসান তুমি কোথায় ? ফোন ধরতেই ভাবী জিজ্ঞেস করেন । -আমিতো অফিসে । -মিজানের কি জানি হয়েছে । আমি ইউনাইটেডে যাচ্ছি । -কি হয়েছে দাদার ? -ড্রাইভার আপনি রং সাইড দিয়াই যান …তাড়াতাড়ি করেন । উত্তরের বদলে ভাবীর এই কথাগুলোই ভেসে আসে । হাসান সাহেবও আর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করেন না । দ্রুত অফিস থেকে বের হন । মতিঝিল থেকে গুলশানে আসার পথে বাকি সব ভাই বোনকেই ফোন করেন ।

হাসপাতালের সামনে সি,এন,জি থেকে নামতেই বড় বুবুর সাথে দেখা হলো । বড় বুবুর বাসা কালাচাদপুর বলে তাড়াতাড়ি চলে আসতে পারছেন । -দাদা কই ? হাসান সাহেব জিজ্ঞেস করে । -আই,সি,ইউ তে নিছিলো । কিন্তু জ্ঞান আছে বলে একটু পরেই সি,সি,উ তে নিয়ে গেছে । -সি,এম,এইচে নিলো না কেনো ? -বড় বউ এর মামা এইখানের বড় ডাক্তার । সেই মনে হয় বলছে । আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি । ডাক্তারতো বললো হার্ট এটাক । আরো কি জানি বলবে । তুই বুঝতে পারবি তাই তোর জন্য এইখানে দাড়াইয়া আছি । -ঠিক আছে চলো ।

ঝকঝকে তকতকে ডাক্তারের রুমে এসে বসেন হাসান সাহেব । ‘দেখুন উনি ডায়াবেটিক রুগী বলে হার্ট এটাকটা সেভাবে টের পান নাই । এখন উনি ভালোই আছেন । তবে অনেক সময় সাবসিকুয়েন্ট এটাক হয় এবং সাধারনত পরের এটাকগুলো প্রথমটার চাইতেও অনেক খারাপ হয় । তাই পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ ।‘ গম্ভীরভাবে বলেন ডাক্তার সাহেব । ডাক্তারের রুম থেকে বের হতেই দেখেন হাসপাতালের করিডোর আত্মীয়-স্বজনে পরিপূর্ণ । এত মানুষ…নিজের মানুষ দেখে কেমন যেনো সাহস আসে মনে হাসান সাহেবের । ‘হাসানের সাথে ফোনে অনেকক্ষণ কথা বললো । আজকালতো আমার সাথে যত কথা বলে হাসানের সাথে তার চাইতেও অনেক বেশী বলে । তারপর বললো পেটে মনে হয় গ্যাস হইছে । দুইটা মাইলান্টা দেওতো …’ বড় ভাবী সবাইকে বলছেন । এই একই কাহিনী আরো দশ বারোবার বলতে হবে বড় ভাবীকে । কোনো একবার শুনে নিলেই হবে । তাই হাসান সাহেব সেখানে আর দাঁড়ায় না । সি,সি,ইউ এর দরজার কাছে যায় । দেখে ছোট ভাই শোভন দাড়িয়ে আছে । ‘ভিতরে বড় বুবু আছে । এখনই বের হবে । একজনের বেশীতো ঢুকতে দেয় না । তুমি যখন আসছো তুমিই আগে যাও । আমি পরে যাবো ।‘ শোভন বলে । একটু পরেই হাসান সাহেব ঢোকেন সি,সি,ইউতে । চারদিকে বড্ড বেশী সাদা । এর মাঝে দূরের কোনায় দাদা শুয়ে আছেন । হাসানকে দেখেই দূর থেকে হাসেন ।

-আসলে আমার তেমন কিছু হয় নাই । তোর সাথে সন্ন্যাস রোগ নিয়া আলাপ করলাম না । ঐটাই মনে হয় সাইকোলজিক্যালি কাজ করছে । তবে এইখানে যখন আসছি এক দুই লাখ টাকা বিল না দিয়াতো যাওয়া যাবে না । যতই তোর ভাবীর মামা থাকুক না কেনো । কাছে যেতেই বলেন মিজান সাহেব । -তোমাকে টাকা নিয়া চিন্তা করতে হবে না দাদা । -আরে নাহ টাকা নিয়া চিন্তা করি না । জানোস একটু আগে না পুরানো একটা কথা মনে করে হাসি আসলো । -কি কথা দাদা । -তুই যে লুকাইয়া লুকাইয়া আমার ক্যাসিও ঘড়িটা পড়তি আমি কিন্তু জানতাম । তুই যে ঘড়িটা পইড়া স্টাইল কইরা হাটতি । দূর থেকে দেখে আমার মজা লাগতো । মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই আমি ঘড়িটা ড্রয়ারে রেখে যেতাম । কতদিন ইচ্ছা হইছে তোরে একটা ঘড়ি কিনা দেই । কিন্তু তখনতো অত টাকা-

… -দাদা আমারো একটা কথা মনে হয় জানো । -কি? -সবাই যে বলে আমার রাগ বেশী এর কারণ মনে হয় তুমি । -কি বলিস ? -মনে নাই একবার মাথা ন্যাড়া করলাম আর তুমি একটু পর পর মাথার চাঁদিতে চাপড় দিতে …তাই মনে হয় রাগ বেশী হয়ে গেছে … -তাহলে এখন চাঁদিতে চাপড় দিলে আবার রাগ পানি হয়ে যাবে । দাড়া হাসপাতাল থেকে ফিরে সোজা মগবাজার যাবো । তোর ভাবীর কোনো কথাই আর শুনবো না । তখন সকাল বিকাল তোর মাথায় চাপড় দেবো …বলে হাসেন মিজান সাহেব । এর মাঝেই এক নার্স আসেন । ‘আপনারা এত কথা বলছেন । রোগীর ক্ষতি হবে তো । ওনাকে একটু রেস্ট নিতে দেন ।‘ -ধুর বলুক । তুই আর একটু থাক । দাদা পাত্তা দিতে চান না । -নাহ দাদা । আমি পরে আবার আসবো । তুমি এখন চুপচাপ শুয়ে থাকো ।

সি,সি,ইউ থেকে বের হতেই বড় ভাবী একটা ফোন ধরিয়ে দেন । ‘তানিম ফোন করছে । তোমার সাথে কথা বলতে চায় । আমি আসতে নিষেধ করছি । তুমি কথা বলো ।‘ বলে ভাবী ফোনটা দিয়ে চলে যান ।

-চাচু বাবা কেমন আছে ? সুদূর কানাডা থেকে দাদার ছেলে তানিমের গলা ভেসে আসে । -এখনতো ভালো আছে । তবে ডাক্তার একটা কথা বলছে । দাড়া একটু দূরে গিয়ে বলছি । একটু আড়ালে গিয়ে একটু আগে শোনা ডাক্তারের কথাটাই হুবহু বলে তানিমকে । -চাচু কালকে আমার একটা পরীক্ষা আছে । এটা না দিলে সময় টাকা দুইটাই নষ্ট হবে । পরীক্ষাটা দিয়েই আসি । -ঠিক আছে তাই কর । মুখে বললেও মনে মনে একটু বিরক্ত হন হাসান সাহেব ।

রাতে হাসান সাহেব হাসপাতালেই থাকেন । দাদা, কাছে গেলেই গল্প শুরু করেন বলে আলাদা জায়গায় থাকেন । সকালে সবাই আসলে তারপর হাসপাতাল ছাড়েন হাসান সাহেব । অফিসে একটা ফোন করে ছুটির ব্যবস্থাও করেন । তারপর বাসায় এসে ঘুমাবার চেষ্টা করেন । মনে হয় ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়েও ছিলেন । এর মাঝে সেলিনা এসে ডেকে তোলে । ‘বড় বুবু ফোন করেছে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলো ।‘ আধা ঘন্টা পরে যখন হাসান সাহেব হাসপাতালে আসেন তখন সব শেষ ।

এর তিন সপ্তাহ পরে । –

কি বুবু ডাকছো কেনো ? বড় বুবুর বাসার ড্রয়িং রুমে বসতে বসতে বলে হাসান সাহেব । -এখানে বসলি কেনো ? ফ্রেস হয়ে শোবার ঘরে যা । আজকেতো খেয়ে যাবি । -নাহ বুবু । আজকে খাবো না । কিজন্য ডেকেছো সেইটা বলো । -তুই নাকি খুব অশান্তি শুরু করছোস । ফিক্সড ডিপোজিট সব ভেঙ্গে ফেলতে চাস । অয়নের সাথে খ্যাচ খ্যাচ করোস । -সেলিনা বলছে ? -কে বলছে সেইটা বড় না । মিজানের মৃত্যু আমাদের সবার জন্যই শোকের । তুই না হয় একটু বেশী ক্লোজ ছিলি । তাই বইলা এই বয়সে এইসব কি শুরু করছোস । -বুবু ঠাণ্ডা হইয়ো বসো । তোমাকে কয়েকটা কথা বলি । -বল । -তোমার কি মনে হয় না অয়ন, তানিম এরা খুব স্বার্থপর একটা প্রজন্ম ? -কেনো এই কথা কেনো ? -তোমাদের কাউকে না বললেও ডাক্তার কি বলেছে সেটা কিন্তু আমি তানিমকে ভালোভাবে বলেছিলাম । সে বললো তার পরীক্ষা পরেরদিন । -তানিম তো আর এখানে ছিলো না । হয়তো বুঝতে পারে নাই । -বুবু তুমি খেয়াল কইরা দেইখো এরা কেমন যেনো । আমরা ছয় ভাইবোন ছিলাম । গ্রাম থেকে মেহমান আসলেই আমাকে আর দাদাকে মাটিতে শুইতে হইতো । সারাটা স্কুল কলেজ জীবন পার করলাম নিজের কোনো পড়ার টেবিল ছাড়া । সকালে একটা ডিম ভাজি হইলে কমপক্ষে তিনজন খাইতাম । আর এখন আমাদের ঘরে ঘরে একজন কিংবা দুইজন সন্তান । এরা কিছু না চাইতেই অনেক কিছু পায় । সেদিন আমার একটা জামা অয়নকে দিলাম । আমি মাত্র একদিন পরেছিলাম । সে মুখের উপরে বললো আর একজনের জামা কাপড় পরা নাকি আনহাইজিনিক । অথচ আমার সারাটা ছোট বেলা কাটছে দাদার জামা কাপড় পরে । এরা আসলে একটা স্বার্থপর প্রজন্ম । -কিসব যে বলস না । তোর সাথে…মিজানের সাথে… বাবারও তো অনেক লাগতো । মনে নাই একবার বাবা আর একটু হইলে ক্যাসেট প্লেয়ারটা আছাড় মাইরা ভাইঙ্গা ফালাইতে লইছিলো । -ঐটাতো অন্য ব্যাপার বুবু । বাবা মনে করতো আব্বাসউদ্দিন আর আব্দুল আলীমের পরে আর কোনো শিল্পী আসে নাই । আমি আর দাদা ব্যান্ডের ক্যাসেট কিনলে কইতো কাউয়া সঙ্গীত । ঐটাতো ভিন্ন জিনিষ । -আরে একই । আসল কথা হলো এদের অনেক কিছু আমাদের সাথে মিলবে না । -নাহ বুবু । আমি খেয়াল করে দেখেছি । অফিসের পিওনের ছেলেটাও মনে করে হাজার হাজার টাকা খরচ করে বাবা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াবে । বাবা যেভাবেই হোক পড়ায়ও । আমরা কোনোদিন এসব ভাবতে পারছি । -হইছে তুই যেমন তোর মত ওরাও ওদের মত । সংসারে অশান্তি করিস নারে ভাই ।

আরো তিন সপ্তাহ পরে । ডাক্তারের চেম্বারে হাসান সাহেব আর অয়ন বসে আছে । সব রিপোর্ট দেখে বেশ কিছুক্ষণ পরে ডাক্তার মুখ তুললেন । -দেখুন আপনার ছেলে মেডিক্যালের ছাত্র । ও মনে হয় কিছুটা বুঝতে পারছে । আপনার স্ত্রীর যেটা হয়েছে তার নাম সি কে ডি । ক্রনিক কিডনি ডিজিস । সমস্যাটা অনেক দিনের । উনি হয়তো চেপে গেছিলেন । খারাপটা আগে বলে নেই । ওনার দুইটা কিডনিই ৭০ শতাংশ অকেজো এবং এটা চিকিৎসা করলেও ধীরে ধীরে আরও খারাপই হবে । -আরো খারাপ হলে সেটা আবার কি চিকিৎসা ? হাসান সাহেব প্রশ্ন করেন । -আমাকে পুরোটা বলতে দিন । চিকিৎসা মানে হলো খারাপ হবার রেটটাকে যথাসম্ভব ধীর করে দেয়া । তবে আসল ভালো খবরটা এখনো বলি নাই । ওনার যেহেতু ডায়াবেটিক কিংবা অন্য কোনো জটিল সমস্যা নাই এবং বয়সটাও যেহেতু মাত্র পঞ্চাশ পার হলো কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হলে উনি অনেকদিন সুস্থ থাকবেন । তুমিতো ব্যাপারগুলো কিছুটা জানো ? শেষ প্রশ্নটা ডাক্তার সাহেব অয়নকে বললেন । -জ্বি । কিডনি হয় একজন ডোনার কিংবা নিজের আত্মীয় স্বজন থেকে যোগাড় করতে হবে । অয়ন উত্তর দেয় । -এখনো তাড়াহুড়ার পর্যায়ে নাই । আগামী ছয় কিংবা নয় মাসের মাঝে কিডনি পেলেই হবে । এর মাঝে ওষুধ চলতে থাকুক ।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে হাসান সাহেব অয়নকে বলেন ‘খবরটা মাকে দিও না । বলবে ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবে ।‘ অয়ন এই যুগের ছেলেদের মত বিশ্রীভাবে কাঁধ নাচিয়ে উত্তর দেয় ।

আরো তিন সপ্তাহ পরে ।

গত এক সপ্তাহ যাবত ছুটিতে আছেন হাসান সাহেব । অবশ্য বাসার কেউ জানে না । প্রতিদিন নিয়মমতো অফিসের সময়ে বের হন । তারপর বিভিন্ন হাসপাতালে যান । বন্ধু ডাক্তার জামিলের পরামর্শে এমন করছেন । একটা নেটওয়ার্ক বিল্ডাপ করা যাতে একটা কিডনি পাওয়া যায় । আজকে অবশ্য জামিলের চেম্বারেই আসছেন । -তুই বুঝতে পারছিস না কেনো । তোর কিডনি ম্যাচ করলেও নেওয়া যাবে না । তুই নিজেই ডায়াবিটিক রোগী । -আমি ডায়াবেটিক রোগীতো কি হইছে । আমার কিডনিতো এখনো ঠিক আছে । তাছাড়া ধর এক কিডনিওয়ালা লোকের কি ডায়াবেটিক হয় না । -ক্রস ম্যাচ করাইতে চাস করা । কিন্তু আমি জানি তোর কিডনি কোনো ডাক্তার নিবে না । তুই এত অধৈর্য হয়ে যাচ্ছোস কেনো । বুঝলাম না । আর ভাবীর দিকের কিছু আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ কর । -ওর দিকের আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ একটু কম । ও নিজেই কমাইয়া দিছে । -কমাইয়া দিছে, তুই এখন বাড়া । -তুই আসলে বুঝবি না জামিল । এই দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সেলিনা আমার কাছ থেকে তেমন কিছু পায় নাই । কথায় কথায় রাগারাগি করছি । ও মফস্বলের স্কুল মাস্টারের মেয়ে । আমার অন্য ভাইদের বউদের চাইতে সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে অনেক দুর্বল । এটা নিয়ে সব সময় ও কূন্ঠিত হয়ে থাকতো । আর তাতেই আমার মেজাজ আরো বেশী খারাপ হোতো । অয়ন জন্মাবার পাঁচ বছর পরে ওভারিতে টিউমার হওয়াতে যখন ওভারি ফেলে দিতে হলো …সেটাও সে নিজের আর একটা দোষ হিসাবে মনে করে । প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেলো …আমি যে ওকে ভালোবাসি সেটাও মনে হয় বলি নাই ঠিকভাবে… শেষ কথাগুলো বলার সময় গলা ধরে আসে হাসান সাহেবের । জামিল একটু অবাকই হয় । হাসানকে সব সময় অন্যভাবেই দেখে অভ্যস্ত জামিল । বন্ধুমহলে হাসানের রগচটা স্বভাবের জন্য নামই ছিলো ‘ঘাউরা হাসান’ ।

ঠিক আছে তুই ক্রস ম্যাচ করা । আর চিন্তা করিস না । একটা ব্যবস্থা হবেই । জামিল বলে । -তোমার কি হয়েছে ? সেই রাতেই সেলিনা হাসান সাহেবকে জিজ্ঞেস করে । -কই কিছু হয় নাইতো । -কিছু একটা হইছেই । রাতের বেলা দুই তিনবার উঠে পরো । সকালে এক এক সময়ে অফিসে যাচ্ছো । অফিসে কোনো সমস্যা ? -আরে নাহ অফিসে আবার কি হবে । তুমি তো জানোই অফিস নিয়ে আমি বেশী চিন্তা করি না । -হ্যা আমিও তাই ভাবি অফিস নিয়ে টেনশন করার লোক তো তুমি না …তাহলে ? -আমার কিছুই হয় নাই । -দেখো । আমার পৃথিবী খুব ছোট । পঁচিশ বছর আগে এই সংসারে এসে নিজেকে অসম্ভব ভাগ্যবতী মনে হয়েছিলো । এখনো তাই মনে হয় । সব সময় ভয়ে থাকি তুমি, অয়ন এই নিয়ে এই যে আমার ছোট সুন্দর পৃথিবী সেখানে না আবার কোনো সমস্যা হয় । -তোমার এই ভয়টাই আমার দুচোখের বিষ । -আমি জানি । তুমি যদি আমার চোখ দিয়ে দেখতা তাহলে বুঝতে । আজকাল কতকিছু শুনি দেখি । অথচ তোমার দিকে তোমার ছেলের দিকে তাকালে মনে হয় আহা আমার দুনিয়াটা এত সুন্দর…যদি নষ্ট হয়ে যায় । ভয় তো আর এমনি এমনি আসে না । সেলিনার কথাগুলো শুনতে শুনতে জলের ধারা বুক থেকে উঠে এসে চোখের কিনারায় জড়ো হয় । -তোমার যত আজাইরা চিন্তা । এইসব আজাইরা চিন্তা না করে ওষুধগুলো ঠিকমতো খাইয়ো । তাইলে আমার উপকার হবে । শেষ কথাটা স্বভাবসুলভ চড়া স্বরেই বলেন হাসান সাহেব । জীবনে এই প্রথম নিজের আবেগ প্রতিবন্ধকতার জন্য তেমন খারাপ লাগে না হাসান সাহেবের ।

ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছেন হাসান সাহেব । এর পরের সিরিয়ালটাই হাসান সাহেবের । অয়নেরও আসার কথা । কোথায় নাকি আটকা পরেছে । মায়ের অসুখ । কোনো হুস আছে ছেলেটার । তবে এই স্বার্থপর প্রজন্ম থেকে বেশী কিছু আশাও করেন না হাসান সাহেব । -তাহলে একজন ডোনার অলরেডি পাওয়া গেছে । এখনো আরো পাঁচ-ছয়মাস সময় আছে । দেখেন আরো এক দুইজন পাওয়া যায় কিনা । ডাক্তারের কথায় চমকে যান হাসান সাহেব । -ডোনার পাওয়া গেছে মানে ? -ফাইলে তো তাই লেখা । ডোনারের সব টেস্টও করা হয়ে গেছে । সব পজিটিভ । আপনি জানেন না ? -আমি কি একটু ফাইলটা দেখতে পারি ডক্টর । -নিশ্চয় । -ফাইলের উপরেই বড় করে ডোনারের নাম লেখা । ‘অয়ন ইসলাম’ । এরপরে ডাক্তার আর কি বলে ঠিকমতো শোনা হয় না হাসান সাহেবের । হু হা করেই বাকি সময়টা পার করেন ।

চেম্বার থেকে বের হতেই হন্তদন্ত অয়নকে দেখতে পান হাসান সাহেব । -ইসস একটুর জন্য মিস করলাম । কি বললো ডাক্তার । ক্রিয়েটিনিন লেভেল বাড়ে নাইতো ? ডাক্তারের চেম্বারের করিডোরে হাটতে হাটতে অয়ন জিজ্ঞেস করে । -নাহ । -এত গম্ভীর হয়ে আছো কেনো । রাগ কইরো না । রাস্তায় যে কি জ্যাম আজকে চিন্তাও করতে পারবে না । -তুই কিডনি দিবি একবার আমাকে বলারও প্রয়োজন মনে করলি না । -এতে বলার কি আছে । মায়ের জন্য আমি কিডনি দেবো । আর ভুলে যাচ্ছো আমিও কয়দিন পরেই ডাক্তার হবো । এক কিডনি নিয়ে দিব্যি ভালো থাকা যায় । বলে স্বভাবসুলভ কাঁধ নাচায় অয়ন ।

কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ অয়নকে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেলেন আবেগ প্রতিবন্ধী হাসান সাহেব । স্বার্থপর প্রজন্মের ছেলে অয়ন অবাক হয়ে যে একটু কাঁধ ঝাকাবে তারও কোনো উপায় থাকে না । কাঁধে যে বাবা মুখ ডুবিয়ে বসে আছেন …