পলাশীর মোড়ে অস্থির ভাবে পায়চারী করছিলো শায়ন। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি, অতোটাও গায়ে লাগছিলো না। বরং সে এই ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়াতেও একটু একটু করে ঘামছিলো। শায়নের বড় বোন শেফা পলাশী বাজারে টুকটাক কেনাকাটা করছিলো। কেজি খানেক আপেল, মালটা আর হরলিক্স নিয়ে মোড়ে এসে দাঁড়ালো সে।

“তুই চা খাবি?”

“এখন চা?”

“পরে কখন আবার আসা হয় ব্যস্ততায়”

“আচ্ছা, চা খেয়েই যাই”

শায়ন-শেফার আম্মা পিজি হাসপাতালে ভর্তি সকাল থেকে। হার্টের কি সব সমস্যা বেড়েই চলেছিলো। কেবিনে ভর্তির সব দৌড়াদৌড়ি শেষ করে দু ভাই বোন পলাশীতে এসে টুকটাক ফলমূল আর কেনাকাটা করে আবার হাসপাতালে ফিরে যাবে৷

শায়ন-শেফা যেখানে চা খাচ্ছিলো তার একটু দূরেই পুরান ঢাকার দিকের উঠতি বয়সী এক ছেলে আর মেয়ে বেলের শরবত খাচ্ছিলো। ছেলেটা একটু পর পর পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেন বারবার আসতে বলছিলো৷ রাস্তার ঠিক বিপরীত দিক থেকেই মধ্যবয়েসী এক লোক বেশ খানিকক্ষণ তাদের দিকে লক্ষ্য রাখছিলো। লোকটা দেখতে মাস্তান কিসিমের, বেশ লম্বা, স্বাস্থ্যবান এবং চেহারায় ভিতর খানিকটা নির্মমতা বোঝা যায়।

লোকটা এবার ফোনে কথা বলতে বলতে শায়ন-শেফার পাশে এসে দাঁড়ালো। সেখান থেকে পুরান ঢাকায় ছেলেমেয়ে দুজনকে ভালো ভাবে দেখা গেলেও ছেলে মেয়ে কেউই লোকটাকে খেয়াল করে নি৷ শায়ন চা খেতে খেতে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছিলো।

একটু পর লোকটা ফোন বের করে কাকে যেন ফোন দিয়ে লাউড স্পিকারে দেয়৷ শায়ন খেয়াল করে পুরান ঢাকার সেই ছেলেটা পকেট থেকে ফোন বের করে কানে ধরে।

“হ্যালো”

“আবে কেডায়?”

“তোর বাপ, শুয়ারের বাচ্চা। কুত্তার বাচ্চা মোবাইল চুরি করছোস, সিম পাল্টাইস নাই বলদের বাচ্চা, আইজকা তোরে জবাই করমু খানকির পোলা”

কোন কিছু বুঝে উঠে আগেই লোকটা দৌড়ে ছেলেটাকে ধরতে গেলো। ছেলেটা বুঝতে পেরে হাতের শরবত ফেলে পলাশী বাজারে ঢুকে পরলো। কি ভেবে শায়নও ছেলেটাকে ধরতে চা ফেলে দৌড় দিলো। কসাইয়ের দোকানের সামনে এসে লোকটার আগেই সে ছেলেটার জামার কলার ধরে ফেললো। লোকটা এসে ছেলেটাকে ছিনিয়ে নিয়ে কসাইয়ের পাশে পরে থাকা চা পাতি উঠিয়ে গলায় কোপ দিলো! ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো….

ঘটনার আকস্মিকতায় শায়ন পাথর হয়ে গেলো। তার কোন অনুভূতি কাজ করছিলো না৷ যতক্ষণে তার সেন্স ফিরে আসলো সে উল্টা ভীড়ের মধ্য থেকে দৌড়ে পালিয়ে আসতে চাইলো। পলাশী বাজারের গেটে এসে হঠাৎ তার চোখে পড়লো সিসি ক্যামেরা! সে ভয়ে আরো জড়সড় হয়ে গেলো। তার মনে পড়লো কিছুদিন আগে বুয়েট আর ঢাকা ভার্সিটির ছেলেদের মারামারির সময়ে সিসি ক্যামেরা দেখে অনেককে শনাক্ত করা গিয়েছিলো। সে নিজেও সেই ভিডিও দেখে তার হলের পরিচিত অনেক জুনিয়রকে চিনতে পেরেছিলো।

শায়ন খানিকটা কাঁপতে কাঁপতে শেফার সামনে এসে দাঁড়ালো। অপ্রত্যাশিতভাবে সে ভয়াবহ একটা চড় খেলো শেফার হাতে।

“সব জায়গায় মাতব্বরি না দেখালে হয় না, না? ভার্সিটিতে পড়ো দেখে রক্ত গরম?”

কোন কিছু বলার আগেই শেফা আবার বললো, “তোর দুলাভাই ফোন দিছিলো, তোরে ম্যাসেজ দিছে, যা ফার্মেসি থেকে ওষুধ গুলা নিয়ে আয়”

শায়নের মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। তার বোন কিছুই বুঝতে পারে নি।

“এইখানে মারামারি লাগছে, এইখানে যাওয়া যাবে না”

“ক্যান খুব না মাতব্বরি করে দৌড়ে গেলি? যা তাত্তারি নিয়ে আয়, অনেক দেরি হয়ে গেছে”

শায়ন অনেকটা জোর করে শেফাকে টানতে টানতে ফুলার রোডের কাছে নিয়ে এসে রিকশায় উঠালো। তার মাথা এখন আর স্বাভাবিক মানুষের মত কাজ করছে না। একটু পর পর সে ফোন বের করছে আর ব্রেকিং নিউজ দেখার চেষ্টা করছে। তার শুধু মনে হচ্ছে সে যখন ছেলেটাকে ধরে ফেলেছিলো তখন সিসি ক্যামেরায় তার মুখ স্পষ্ট দেখা গেছে। সেই খুনি লোকটার সহযোগী হিসেবে পুলিশ তাকে সহজেই ধরে ফেলবে। বৃষ্টির মাঝেও প্রচন্ড ঘামছিলো শায়ন৷ তার হার্টবিট বেড়ে চলছিলো সময়ের সাথে সাথে। ভিসি চত্ত্বরের কাছাকাছি এসে সে পুলিশ দেখতে পেয়ে রিকশা থেকে লাফ দিয়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেলো…

শায়নের ঘুম ভেঙে গেলো। তার মা চিৎকার চেঁচামেচি করছিলো এতো বেলা করে ঘুমানোর জন্য৷ স্বপ্নের আকস্মিকতায় সে তখনো স্বাভাবিক হতে পারে নি৷ ঘুম ঘুম চোখে বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে পানি দিতেই সারা শরীর ব্যাথায় সে আর্তনাদ করে উঠলো।

শাহবাগ থানার জেলে ঘুমিয়ে পড়েছিলো শায়ন। পাশের এক কয়েদী রুটি কলা খেতে গিয়ে শায়নের মুখে পানি ফেলে দিয়েছিলো….

এইচ এম নাজমুল আলম
লেখক