‘তোর নাম আসলেই বিল্টু ।‘ -জ্বি স্যার । ‘বিল্টু আবার কারো নাম হয় নাকি ?‘ -আমগো মতো মাইনসের হয় স্যার । ব্যাক দিন একই কথা জিগান । এহন আমারে ধইরা একটু উঠেন । ‘কেনো আজকে কি রবিবার নাকি ?’ -জ্বে না আইজকা শুক্রবার । আপনার দোস্ত মতিন সাহেব আইবো । আর কথা কইয়েন না । আমারে কাম করবার দেন ।

সিরাজ সাহেব চুপ করেন । বিল্টু সিরাজ সাহেবকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে কাজ করতে থাকে । কি কাজ করে সেটা অবশ্য দেখতে পারে না সিরাজ সাহেব । তিন বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোক করে সিরাজ সাহেবের । দুই মাস যমে-মানুষে টানাটানির পর হাসপাতাল থেকে বাসায় আসেন একটা মাংসের দলা হিসাবে । চোখে দেখতে পারেন না , কানে শুনতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, বাম হাতের কব্জি শুধু একটু নাড়াতে পারেন…তবে কেমন যেনো সব অনুভব করতে পারতেন । ঐ সময়েই আমেরিকা থেকে বড় ছেলে সবুজ আর লন্ডন থেকে মেয়ে মিতু আসে । অসুস্থ হবার প্রথম দিকে মেয়ে আর ছেলে নাকি এসেছিলো । অল্প কয়েকদিন থেকে আবার চলে গিয়েছিলো । এসবই পরে শুনেছেন সিরাজ সাহেব ।

বড় ছেলে, ছোট ছেলে আর মেয়ে মিলে আবার শুরু করলো চিকিৎসা । সকাল বিকাল ডাক্তার আর ফিজিওথেরাপিস্ট আসা যাওয়া শুরু করলো । প্রথমদিকে ভালো উন্নতিও হচ্ছিলো । এক মাস পরেই কথা বলা শুরু করলেন । বা হাতে আর বা পায়েও সাড়া ফিরে এলো । বাদিকে জোরও পেলেন খানিকটা । তিনমাস পরে খুব আবছাভাবে শোনাও শুরু করলেন । তবে চোখের কোনো উন্নতি হলো না । আর মাস ছয়েক পরে থেকে উন্নতিও থেমে গেলো । মিতু লন্ডন থেকে হিয়ারিং এইড পাঠালো । ঐটা পরলে মোটামুটি কথা শুনতে পারেন । কিন্তু খুলে ফেললে যা শোনেন তার কোনো মানে বের করতে পারেন না ।

-স্যার কোন পাঞ্জাবীটা পড়বেন ? যদিও কোনো মানে নাই তারপরও প্রতিবার বিল্টু জিজ্ঞেস করে । সিরাজ সাহেবের বেশ ভালো লাগে । ছেলেটা প্রতিদিন সকালে এক ঘণ্টা আর সন্ধ্যার পরে এক ঘণ্টার জন্য আসে । সিরাজ সাহেবের কাজ করার জন্য । ‘আকাশী রং এরটা পরা ।‘ বিল্টু যত্ন করে পাঞ্জাবিটা পরিয়ে দেয় । এর মাঝেই রুমে নতুন গন্ধ টের পান সিরাজ সাহেব । অসুখের পর থেকেই এটা হয়েছে । অন্য কিছু না শুধু মানুষের শরীরের গন্ধ টের পান সিরাজ সাহেব । এখন যে মিষ্টি গন্ধটা পাচ্ছেন সেটা ছোট বৌ শিলার । প্রতিদিন একবার না একবার এই রুমে আসবেই শিলা । কোনো কোনোদিন চার পাঁচবারও আসে । ছোট ছেলে সেলিম অবশ্য প্রতিদিন আসে না । তবে যেদিন আসে সেদিন কমপক্ষে একঘণ্টা থাকে রুমে । ‘কেমন আছো বৌমা । অহনা কোথায় ? ‘ -জ্বি বাবা ভালো । আজ শুক্রবার না, অহনা ঘুমাচ্ছে বাবা । আজও আপনি আকাশী রং এর পাঞ্জাবী পরেছেন বাবা । এটা কি আপনার খুব পছন্দের । ‘আমিতো আর রং দেখতে পারি না বৌমা । তবে এটা পরলে আরাম লাগে ।‘ -ঠিক আছে বাবা । আপনাকে একটু আতর দিয়ে দেই । মতিন চাচা এসে বসে আছেন । বলে শিলা খুব যত্ন করে আতর লাগিয়ে দেয় ।

তোমাকে দেখলে খুব হিংসা হয় সিরাজ । কানের বেশ কাছে মুখ নিয়ে বলে মতিন সাহেব । দুজনে একসাথে চাকুরী করেছেন অনেকদিন । ডেপুটি সেক্রেটারি হিসাবে দুজনের অবসরও প্রায় একসাথেই । দুজনেই বিপত্নীক । সিরাজ সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন ছয় বছর আগে, আর মতিন সাহেবের চার বছর আগে । প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে মতিন সাহেব আসেন সিরাজ সাহেবের বাসায় । -আমার মত মানুষ দেখেও হিংসা হয় ? -হয় । কেনো হয় সেটা চোখে দেখতে পারলে ঠিকই বুঝতে পারতে । বেশী কিছু না তোমার আর আমার পাঞ্জাবীটা দেখেই । বাহ আবার আতরও দিয়েছো দেখছি । -হ্যা, ছোট বৌ দিয়ে দিলো । বলে একটু সলজ্জ হাসেন সিরাজ সাহেব । রোগ শরীরের অনেক কিছু কেড়ে নিলেও হাসিটা সেই আগের মতই আছে সিরাজের মনে মনে ভাবেন মতিন সাহেব । -সবই কি কপাল সিরাজ ? নাকি কর্মফলও আছে ? চাকুরীকালীন সময়ে খারাপ কাজতো কম করি নাই । তুমিও করছো তবে অনেক অল্প । নরম সরম মানুষ বলে দুই দুইবার ডিসি পোষ্ট পাইয়াও যাও নাই । আর আমি চার জেলায় ডিসি হিসাবে চাকুরী করলাম সাত বছর । মনে আছে ? -খুব মনে আছে । জানোইতো আজকাল সব মনে পরে । চোখে দেখি না । কানের এই যন্ত্রটাও পরি শুধু শুক্রবার আর রবিবার । অথচ সারাটা দিন কত কিছু দেখি কত কিছু শুনি । আগের দিনের । তুমি কিন্তু দারুণ তেজী অফিসার ছিলা । -তা ছিলাম । যা বলতাম যা করতাম সরাসরি বলতাম-করতাম । পিরোজপুরে আমার নামই ছিলো সোজা ডিসি । ওহহো গতসপ্তাহে বিনোদিনী স্কুলের হেডমাস্টারের সাথে দেখা হয়েছে । সেও দেখি বুড়ো হয়ে গেছে । -কে ? -আরে তোমাকেতো এর কথা কয়েকবার বলেছি । একবার দেখেছোও । -ওহ বুঝেছি । যে স্কুলে গেলেই মনে হতো বিদেশের স্কুল… এতটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । পরে টের পাইছো আসলে স্কুলের অবস্থা খুবই খারাপ । শুধু তুমি যেদিন যাইতা তার আগে সব ছাত্র-ছাত্রীর ইউনিফর্ম, স্কুলের দেয়াল, বারান্দা ঝকঝক তকতকে করে রাখা হোতো । -হ্যা লোকটা কতবড় ধান্ধাবাজ, কিচ্ছু টের পাই নাই । কোনোরকম ঘুষ না নিয়াই স্কুলের নামে দুইবার বেশ কিছু টাকা ছাড় করিয়েছি । যেটা বেশীরভাগ এই হেডমাস্টার আর স্কুল কমিটির সভাপতি খেয়ে ফেলেছে । তাকেই দেখলাম । এখনো সেই অমায়িক ব্যবহার । বুড়ো হলেও স্বভাব আগের মতোই আছে । এতটকু বলার পরেই ছোট বউ শিলা আসে । পিছনে ট্রে হাতে করে কাজের লোক ।

-চাচা কেমন আছেন ? মিষ্টি করে হেসে বলে শিলা । -আমাদের আর থাকা । বাতিল মাল, ভাঙ্গা বাসন কোসন । আগের দিনে কটকটিওয়ালা ছিলো বইলা তাও কিছু দাম ছিলো । এখনতো তাও নাই । শোনো তোমারে আমার চাকুরী জীবনের একটা গল্প বলি । একবার হইলো কি এক এস পিরে সবাইর সামনেই দিলাম এক চড় …বলে লম্বা একটা গল্প বলে ফেলেন । এই এক সমস্যা হয়েছে মতিন সাহেবের । আজকাল অনেক কথা বলে ফেলেন । বলতে খুব ভালো লাগে । সমস্যা হয়েছে আজকাল কেউ তার কথা শুনতে চায় না । শুধু এই বাসাটাই ব্যাতিক্রম । সিরাজতো শোনেই । এই যে কি সুন্দর হাসি হাসি মুখ করে শিলাও শুনছে । তাইতো মাঝে মাঝে মনে হয় শুধু শুক্রবার কেনো অন্যদিনওতো আসা যায় । নিজের বাসা থেকে বেশী দূরওতো না । একটু লজ্জা লজ্জা লাগে বলে আসতে পারছেন না । -আপনারা বাঘের মত ছিলেন । কি সাহস ? চাচা এই চায়ের কাপটা বাবার । বাবার বিস্কুটও কিন্তু আলাদা । এই যে এখানে । আমার ভিতরে একটু কাজ আছে । আপনারা গল্প করুন । বলে শিলা উঠে পরে । কি সুন্দর ব্যবহার ! অচল শ্বশুরের জন্য কি যত্ন ! আহা ! -আমি ভুলটা কোন জায়গায় করলাম সিরাজ ? ছোট একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করেন মতিন সাহেব । -কেনো এই কথা কেনো ? সিরাজ সাহেব জিজ্ঞেস করেন । -তোমার ছেলে মেয়ের চাইতেতো আমি আমার ছেলে মেয়ের জন্য বেশী পয়সা খরচ করছি । সব চাইতে ভালো স্কুল কলেজে পড়াইছি । সারা বছর ধইরা টিউটর দিছি । এখন ছেলেরা কেউ আমার কোনো খোজ রাখে না । বউ নাতি নাতনিরাতো অনেক দূরের । আর তুমি ? কি যত্নে আছো । -আসলেও জানো এই জীবনটাও অসহ্য খারাপ লাগছে না । কেমন জানি ভালোই লাগছে । বাদ দেওতো । তুমি এখন আছো কোন ছেলের সাথে । -ছোট ছেলে । -ছোট ছেলের সাথেই মনে হয় বেশী থাকো ? -হ্যা । কারণ ঐ বাসাতেই সামান্য একটু দাম এখনো আছে ? কারণ কি জানো ? -কি ? -কারণ ঐ বাসাতে আড়াই বছর বয়সী এক শিশু আছে । বৌমা শপিং, বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিতে বাইরে যেতে পারে নিশ্চিন্ত মনে । কাজের মেয়ের চাইতেও দাদাতো অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য তাই না ? -এসব কথা বাদ দেওতো ? -বাদতো আমিও দিতে চাই । কিন্তু তোমার এখানে আসলে আরো বেশী মনে পরে । আসলে জানো কি সব হচ্ছে ভাবীর অবদান । ভাবীকেতো দেখেছি কি সুন্দর সব কিছু ম্যানেজ করেছেন । -দেশের কি অবস্থা ? কথা ঘোরাবার জন্য সিরাজ সাহেব জিজ্ঞেস করেন । -দেশের অবস্থার কথা পরে বলি । ভুলে যাবার আগে আসল কথাটা বলি । তোমাকে এক আধ্যাত্মিক সাধকের কথা বলেছিলাম না । এই সোমবার তার সাথে দেখা হবে । তোমার কথা তাকে আগেই বলেছি । দেখি কিছু দেয় কিনা । এইবার বলি দেশের কথা .

কেমন আছো বাবা ? রবিবার দুপুর একটায় নিয়মমতো মেয়ে মিতু স্কাইপ করে । লন্ডনে এখন ছুটির দিনের সকাল । -ভালো আছিরে মা । তোরা সবাই কেমন আছিস । টিয়া, টগর কেমন আছে । জামাই কেমন আছে ? -সবাই ভালো আছে বাবা । তুমি খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করতে পারোতো ? -পারি মা । তোরা আসবিনা ? -আসবো বাবা । এই জুনেই আসবো । শিলা বাবার দাড়িতো মনে হয় বেশ বড় হয়ে গেছে । নাপিত আসে না । প্রশ্নটা পাশে দাঁড়ানো ছোট বৌকে করা । -আজকেই আসবে আপা । -শোনো তোমার একাউণ্টে চারশ পাউন্ড পাঠাইছি । বাবার যখন যা লাগে খরচ কইরো । সেলিমতো অনেক ব্যস্ত থাকে তাই তোমার একাউন্টেই পাঠাই । -ঠিক আছে আপা । বড়ো ভাইও আমার একাউন্টেই পাঠায় । -শোনো তোমার সাথে আমার আরো কথা আছে । বাবা আবার আগামী সপ্তাহে কথা বলবো । বলে বিদায় নেয় মিতু । ঘণ্টাদুয়েক পরে সবুজ ফোন করবে আমেরিকা থেকে । রবিবার দিনটা বেশ সুখকর ব্যস্ততায় কাটে সিরাজ সাহেবের । অথচ ছেলেমেয়ে নিয়ে কি সমস্যাই না গেছে ।

ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন সময়েই হঠাৎ একদিন মিতু ঘর ছেড়ে পালালো । খোজ নিয়ে জানা গেলো পাড়ার এক বখাটে ছেলের সাথে ভেগেছে মিতু । তিনদিন পর খোজ পাওয়া গেলো । মিতুর মামারা নিয়েও আসলেন মিতুকে । সেই থেকে বছর দেড়েক মিতু রাজশাহীর মামা বাড়িতেই থাকলো । মামা বাড়িতেই মিতুর বিয়ে হয় । ডাক্তার ছেলের সাথে । সব কিছু ম্যানেজ করেছে স্ত্রী যোবেদা । ইন্টারমিডিয়েটের পরে বড় ছেলে সবুজও প্রায় উচ্ছন্নে যাচ্ছিলো । তাকে আমেরিকা পাঠাবার বুদ্ধিও যোবেদার । মতিন ঠিকই বলেছে । যোবেদা না থাকলে কি হোতো ভাবা যায় না …মনে মনে আরো একবার প্রয়াত স্ত্রীর উপর কৃতজ্ঞতাবোধ করেন সিরাজ সাহেব ।

আসসালাতূ খাইরুম মিনান নাওম আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম আহ কতকাল পরে ফজরের আজান শুনছি । চোখ বন্ধ করেই মনে মনে ভাবেন সিরাজ সাহেব । কানের যন্ত্রটা মনে হয় কাল রাতে খোলা হয় নাই । পরক্ষনেই মনে হয় এটাতো সম্ভব না । কানে যন্ত্র নিয়ে তিনি কখনোই ঘুমাতে পারেন না । আসলে শুক্র ও রবিবার অল্প সময়ের জন্যই তিনি কানে যন্ত্র পরেন । তাহলে কি…? ইয়াল্লা, ইয়া মাবুদ …। অথচ পরশুদিন মতিন যখন গাছগাছড়াগুলো দিলো তখন তিনি একেবারেই বিশ্বাস করেন নাই । বন্ধু দুংখ পেতে পারে বলে মুখ ফুটে অবশ্য কিছু বলেন নাই । গতকাল সকালে বিল্টুর হাতে গাছগাছড়াগুলো দিয়ে যখন বলেছেন এগুলো এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে দে তখনো তেমন কিছু মনে করেন নাই । এর আগেও এরকম অনেক কিছু খেয়েছেন …কোনো কাজ হয় নাই …হওয়ার কথাও না । অথচ…চোখটাও কি খুলবো নাকি …ইয়াল্লা, ইয়া মাবুদ …

বড় এক মাকড়শা নিশ্চল ঝুলে আছে । এই কুৎসিত দৃশ্যটাই প্রথম দেখলেন সিরাজ সাহেব । সকালের আলো আগন্তকের মত সবে কিছুটা ঘরে ঢুকেছে । তার আলোতে সিলিঙয়ের কোনায় কোনায় আরো গোটা দশেক মাকড়শা দেখতে পেলেন সিরাজ সাহেব । ডানদিকের হাত পা নাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন একটু । তারপরও … আশ্চর্য এরকমও হয় । আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন সিরাজ সাহেব । একটু হয়তো ঘুমিয়েও পরেছিলেন । অতিরিক্ত উত্তেজনার ফলে হয়তো ।

এরপরের বার যখন চোখ খুললেন তখন আলো আধারী একদম কেটে গেছে । প্রথমেই নিজের শরীরের দিকে চোখ যায় । গেঞ্জিটায় হলুদ, লাল আর ছাই রং মাখামাখি হয়ে আছে, কতদিন আগে ধোয়া হয়েছে কে জানে । মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে পাশের টেবিলের দিকে তাকালেন । একটা প্লেটে এক টুকরা রুটি । রূটিটার উপরে একটা তেলাপোকা বসে আছে । পাশেই পিরিচে একটা ডিম । সেখানেও দুইটা তেলাপোকা । সকালে কাজের লোক হয়তো রেখে গেছে । একটু দূরে ময়লা ফেলার ঝুড়িটা উপচে পরছে ময়লা । অল্প সময় পরেই বিল্টু এলো । ছেলেটার চেহারা আগে কখনো দেখা হয় নাই সিরাজ সাহেবের । আজই প্রথম দেখলেন । গোলগাল মুখ, কালো হলেও একটা লাবন্য আছে মুখে । ‘জানিস বিল্টু…’ কি মনে হতেই চুপ করে যান সিরাজ সাহেব । খবরটা প্রথমে বিল্টুকে দেয়া ঠিক হবে না । বিল্টু বেড প্যান আর বিছানার আশে পাশে পরিষ্কার করতে থাকে । একটু পরেই বিল্টু পাউরুটি আর ডিমটা নিয়ে আসে প্রতিদিনের মত । কিন্তু প্রতিদিনের মত খেতে পারেন না সিরাজ সাহেব । কেনো পারেন না সেটাও বলতে পারে না । ‘আপনেতো এমন করেন না । শরীর ঠিক আছেতো ?’ বিল্টু জিজ্ঞেস করে । শরীর আমার ঠিকই আছে । উত্তর দেন সিরাজ সাহেব । ‘আইচ্ছা আমি তাইলে এখন যাই । আজকেতো রবিবার । দুপুরেতো আবার আসতে হবে ।‘ বলে বিদায় নেয় বিল্টু । একটু পরেই নাকে মিষ্টি গন্ধ এসে লাগে । চোখ না খুলেও বুঝতে পারেন ছোট বৌ শিলা এসেছে । মনটা খুশী হয়ে যায় সিরাজ সাহেবের । ভাবেন খবরটা শিলাকেই প্রথম দেই । চোখ মেলে দেখেন ফোন হাতে মিলা দূরের একটা সোফায় বসে আছে । সেই একইরকম মিষ্টি চেহারা ছোট বৌমার । -আচ্ছা দিনে যে এরকম দশ-বারো বার ফোন করো এটা কি ঠিক ? সেলিম বাসায় আছে । তাও কপাল ভালো শ্বশুরের এই রুমটা আছে । শ্বশুর চোখেও দেখে না কানেও শুনে না তাই বারবার এই রুমে আসলেও সমস্যা হয় না । শিলার কথা শুনে অবাক হয়ে যায় সিরাজ সাহেব । -শোনো শ্বশুর সাহেবের জন্য আমার ভাসুর আর ননাস যে টাকা পাঠান সেখান থেকে ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় করা কোনো ব্যাপার না । তুমি চিন্তা কইরো না । আরে বাবা কালকেতো আসছিই ..বেশী দুস্টামি করবা না কিন্তু … ফোন শেষ করেই শিলা সোজা রুম থেকে বের হয়ে যায় । সিরাজ সাহেবের দিকে একবার তাকায় না পর্যন্ত ।

 

আর একটু পরেই ছোট ছেলে সেলিম ঢোকে রুমে । বাহ ছেলের স্বাস্থ্যতো বেশ ভালো হয়েছে । একটা ল্যাপটপ নিয়ে একটু আগে যেখানে শিলা বসেছিলো সেখানেই বসে সেলিম । -বাবার এই রুমটা বেশ নিরাপদ । তোমাকেতো হলুদ ড্রেসটায় দারুণ লাগছে …আরো কয়েকটা কিনে দিতে হবে …সেলিমও বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে । রুম থেকে যাওয়ার সময় অবশ্য সেলিম বাবার দিকে একবার তাকিয়ে ‘বাবা কেমন আছো?’ বলে । তবে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না ।

দুপুরে বিল্টু এসেই সিরাজ সাহেবের মুখের চর্চা করে । মুখ ধুয়ে, ক্রিম দিয়ে পরিপাটি করে ফেলে । শেষ হবার পরে নিত্যকার মতো জিজ্ঞেস করে ‘চাচা কোন পাঞ্জাবীটা পড়বেন ।‘ আজকে আর উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না সিরাজ সাহেবের । চকচকে ইস্ত্রি করা ঘিয়ে রঙয়ের এক পাঞ্জাবী পড়ায় বিল্টু । নিজেকে কেমন যেনো বিনোদিনী স্কুলের ছাত্রের মত মনে হয় সিরাজ সাহেবের…চকচকে ইউনিফর্ম পরা …একটু পরেই মেয়ে আর ছেলে দেখবে তাই । একটু পরেই হাসি হাসি মুখ করে শিলা আসবে । সেলিম মনে হয় আজকে বাসায় আছে …সেও হয়তো আসবে ।

কিন্তু সিরাজ সাহেব অধীর আগ্রহে পরের শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করেন । মতিনকে বলতে হবে পীর বাবার কাছ থেকে অন্ধ আর বধির হবার ওষুধ নিয়ে আসতে । এই অল্প কয়েক ঘণ্টাতেই বুঝে গেছেন এই বয়সে আর এই পোড়া সময়ে এর চাইতে আশীর্বাদ আর কিছু হতে পারে না !!!