লেখক তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি,চিন্তাধারা, জীবন দর্শন, ক্ষেত্রে বিশেষে মতবাদ যে বর্ণনাত্মক সাহিত্যকর্মে ফুটিয়ে তোলেন, তাই হচ্ছে উপন্যাস।আর উপন্যাসের কাহিনী তৈরি হয় কিছু চরিত্র কে আশ্রয় করে; যাদের মধ্যে দেখা যায় লেখকের বহুমুখী চিন্তাধারার প্রতিফলন। বইয়ের কলেবর যখন ছোট হয় তখন লেখকের বক্তব্য প্রকাশের জন্য গল্পের চরিত্র তৈরি করার তেমন প্রয়োজন পরে না।অন্যভাবে দেখতে গেলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে চরিত্র চিত্রণের মত সেই সুযোগও থাকে না। কিন্তু বইয়ের কলেবর যখন উল্লেখযোগ্য রকমের বড় হয় তখন লেখক ধীরে ধীরে, বিভিন্ন ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে চরিত্র তৈরি করার একটা সুযোগ পান। বা তাঁকে সেটা করতেই হয়। আর এখানেই লেখকের আসল ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘পার্থিব’ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উপন্যাসগুলোর একটা। এখানে লেখক তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি, জীবন দর্শন ব্যক্ত করেছেন অনেকগুলি পরিবার আর অনেকগুলি মানুষের গল্পের মাধ্যমে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বেশ কয়েকটি পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারা,ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের চরিত্র লেখক তৈরি করেছেন অসাধারণ নৈপুণ্যে। আর এদের জীবনের আপাত সাদামাটা গল্পগুলো বর্ণনা করেছেন অতীব চমৎকারভাবে। যেখানে একই সাথে ফুটে উঠেছে মানুষের টিকে থাকা, বেঁচে থাকা, বিলাস ব্যসন আর ভালোবাসার গল্প। যা দৃশ্যমান হয় চয়ন,বিষ্ণুপদ,নয়নতারা, অপর্ণা, চারুশীলা আর আপা’র চরিত্রে।গল্পের আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা। প্রকৃতির সাথে, পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ক খুঁজে বের করার একটা চেষ্টা; যার প্রতিফলন দেখা যায় হেমাঙ্গ আর কৃষ্ণজীবনের চরিত্রে। যার জন্য এদের একেকজন একেক রকমের উপায় অবলম্বন করে।একজন বই লিখে,সভা, সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে দুনিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব,যন্ত্র সভ্যতা প্রসারের অপকারিতা। আরেকজন শহর ছেড়ে সন্ন্যাসীর আশ্রম কিংবা প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্যে গিয়ে চেষ্টা করে জীবনের স্বরূপ উপলব্ধি করার। তবে এদের উদ্দেশ্য থাকে একই–নিজের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক আবিষ্কার। সভ্যতার সাথে পৃথিবীর সম্পর্কের প্রকৃতি অনুধাবন করা।সভ্যতা কি পৃথিবীর কল্যাণ নাকি অকল্যাণ।কিংবা আমরা যাকে সভ্যতা বলি, সেটা আদৌ সভ্যতা কিনা, এসব প্রশ্নের দ্বন্দ্বে সব সময় জর্জরিত হয় এরা।

সংসারে সততা, অসততা দুটো বিষয়ই রেললাইনের মত পাশাপাশি সমান্তরালে বিরাজ করে। নিখাঁদ সচ্চরিত্রের মানুষেরা এর পার্থক্য করতে পারে সর্বাবস্থায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা খুব নিরীহ হয়। ঠিক ব্যক্তিত্ব বা প্রতিবাদ করার যে ক্ষমতা,তা সব সময় থাকে না এদের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা আর ভাগ্যের উপর সব ছেড়ে দিয়ে সবকিছু মেনে নেয়। স্ত্রী মুখাপেক্ষী, আপাত স্ত্রৈণ নিমাই এই দলের মানুষ। পক্ষান্তরে কারো কারো চরিত্র কিছুটা নাজুক হয়। জীবনের পথে চলতে চলতে পরিস্থিতির শিকার হয়ে কখন যে লাইন পাল্টে অসৎ হয়ে যায় নিজেও বোঝে না। অথবা বুঝলেও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করার মত নৈতিক দৃঢ়তা থাকে না। এরা খুব কষ্ট পায়। কারণ, এরা না পারে পুরোপুরি সৎ হতে, না পারে পুরোপুরি অসৎ হতে। একদিকে পরিস্থিতি উদ্ভুত সুযোগের লোভ। অন্যদিকে দুর্বল বিবেকের খচখচানো। ঠিক এই দৃশ্যগুলোই দেখা যায় ভাগ্যচক্রে যাত্রাপালার নটী বীণাপানির গল্পে।

এহেন বিপরীতমুখী দুই চরিত্র যখন স্বামী স্ত্রী হয়, তখন প্রীতিকর কিংবা অপ্রীতিকর কতকিছু হতে পারে তাই দেখা যায় এই গল্পে।

সাহিত্যকর্ম আর সিনেমা এক জিনিস নয়। সিনেমায় পুরো সিনেমা জুড়ে যাই হোক না কেন শেষে দর্শকের মনোতুষ্টির কথা মাথায় রেখেই ইতি টানতে হয়।আর সেটা করতে গিয়ে পরিচালককে অনেক সময় আশ্রয় নিতে হয় নানা রকম গোঁজামিলের । কিন্তু সাহিত্যে সেসবের বালাই নেই। কেননা প্রমথ চৌধুরী তো বলেই গেছেন, “কাব্য জগতে যার নাম আনন্দ, তার নাম বেদনা।” তবে বেশিরভাগ সহৃদয় লেখক পাঠকের চাহিদামত কাহিনী শেষ না করলেও অন্তত গল্পের ভালো মানুষগুলোর একটা শুভ পরিণতি দেখাতে চেষ্টা করেন। তবে কোন রকম গোঁজামিল ছাড়াই লেখক সেটা কতটা করতে পারেন,সেখানেই লেখকের আসল মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়৷ উল্লেখ্য শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও এই বইয়ে কিছু ছোটখাটো গোঁজামিল দিয়েছেন। তবে সেগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে শুধু পাঠকের মন নিয়ে পড়লে তা ধরতে পারা কঠিন। (পরোক্ষভাবে নিজেকে সমালোচক বলার ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী)

আপাত দৃষ্টিতে গল্পের কাহিনী এবং চরিত্রে বৈচিত্র্য থাকলেও সবার গল্প, সবগুলো চরিত্র যেন কোন এক বৃহৎ ঐকতান নির্দেশ করে। তাই চয়নের নির্মোহ টিকে থাকা, নিপাট সংসারী অপর্ণার পারিবারিক ভাবনা, সদ্য তরুণী আপার নীরব বিপ্লব-চেষ্টা, চারুশীলার বিলাসী, খেয়ালী জীবন যাপণ,বিষ্ণুপদের পূর্ব বঙ্গের আদি নিবাসের প্রতি টান, পিতৃভক্ত রামজীবন কিংবা লোভী বামাচরণ সবার টুকরো গল্প আর লেখকের সূক্ষ্ম জীবনবোধ মিলে ‘পার্থিব’ হয়ে ওঠেছে মানব জীবনের এক অনন্য চালচিত্র।

হুসাইন মুহাম্মদ সিদ্দিকিন
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়