ছোট মেয়ে মাসখানেক ধরে ঘ্যান ঘ্যান করছে । তাই লিখতে বসলাম । নতুবা যে হাঙ্গামার মধ্যে থাকি ……

কোনোদিনতো এসব লিখি নাই । কিভাবে কোথা থেকে শুরু করি ? আচ্ছা আমার নামটাই বলি । আমার নাম জাহানারা বেগম । ডাকনাম ইতি । ডাকনাম দেখেইতো বুঝতে পারছেন আমি মা বাবার সবচাইতে ছোট সন্তান । ঐ যুগে সবচাইতে ছোট মেয়ের নাম ইতি রাখা খুব সাধারন ছিলো । আমার সাত বছরের বড় ছোট ভাইয়ের ডাকনাম ছিলো বাবু । এটাও বেশ সাধারন নাম ছিলো । আমার মামাতো চাচাতো ভাইদের মধ্যেই তিনজনের নাম ছিলো বাবু ।

যা বলছিলাম বাবা মায়ের বেশী বয়সের সন্তান আমি । আমার জন্মের আগেই বড় আপার বিয়ে হয়ে গেছে । আমার চাইতে বড় আপার বড় মেয়ে মাত্র দেড় বছরের ছোট । এযুগে কেমন কেমন শোনালেও সে যুগে এমন হরহামেশাই হোতো । বিশেষ করে পিরোজপুরের মত মফস্বল শহরে । বাবা মোটামুটি নামকরা উকিল ছিলেন । তাই অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালোই ছিলো । আমার জন্মের সময় থেকেই দাদা আর মেজভাই পড়াশুনার জন্য ঢাকা থাকেন । পরে পড়াশুনা শেষ হলেও সেভাবে আর তারা বাড়ি ফেরেন নাই । কর্মজীবনের ব্যস্ততা তাদেরকে একরকম পরবাসীই করে ফেলে । আমি একটু বড় হতে হতে বাবু ভাইও ঢাকা চলে যান পড়াশুনার জন্য ।

বাবা তখন আর কোর্ট কাচারি তেমন পছন্দ করেন না । কিছু অতি পুরোনো মক্কেলদের জন্য তারপরো কোর্টে প্রায়ই যান । তবে তার পরিমাণও ধীরে ধীরে কমতে লাগলো । বাবা মায়ের হাতে বেশ কিছুটা বাড়তি সময়…তার উপর তাদের শরীর স্বাস্থ্যও ভালো ছিলো অতএব আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম অপত্য স্নেহে । ঢাকা থেকে ভাই বোনরা এলেও আদর যোগই হোতো বিয়োগ হোতো না । অতি আদরে মানুষ একটু বাদর হয়ই । আমিও বাদ যাবো কেনো । মেট্রিক পরীক্ষায় তেমন বেশী ভালো করলাম না । অন্তত আমার বড় চার ভাইবোনের চাইতে বেশ খারাপই করলাম । আশ্চর্য ব্যাপার হলো সেই রেজাল্ট নিয়েও বাবা-মা, ভাই, বোনরা বেশ খুশী । বাবাতো খাশি জবাই করে লোক খাওয়ালো । বুঝতেই পারছেন পরিবারে আমার আদরটা কোন পর্যায়ে ছিলো ।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি । ছোট বেলা থেকেই শুনতাম আমি খুব সুন্দর । বাবাতো প্রায়ই ইতি না ডেকে ডাকতেন ‘পরী মা’ । এতবার বাবার কথা বলে ফেললাম । বুঝতেই পারছেন বাবাকে খুব ভালো বাসতাম । তবে বাবাকে অনেক বড় দুংখও দিয়েছি । সে কথা একটু পর বলছি । বাবা আসলে পরিবারে ছিলেন বটবৃক্ষের মত । সেই তুলনায় মা ছিলেন লবঙ্গ লতিকা । অথচ আমার জীবনের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মা হয়ে উঠেন মহীরুহ । সেই কথাও একটু পরে বলছি । মেট্রিক পরীক্ষার পরে বড় আপা আর দাদা দুজনেই আমাকে ঢাকা নিয়ে যেতে চাইলেন । আমি আর ছোট ভাই ছাড়া বাকি তিন ভাই বোনেরই ততদিনে বিয়ে হয়ে গেছে । যাই হোক বাবা মা একেবারেই রাজী হলেন না । বাবাতো বলেই দিলেন ‘ইতির পড়াশুনা এখান থেকেই হবে । আর যদি নাও হয় তাতেও অসুবিধা নাই । ইতির ব্যবস্থা আমি করে যাবো ।‘ বাবার বয়স হয়ে গেলেও বাবার মুখের উপর কথা বলার সাহস কারো ছিলো না । তাই আমি স্থানীয় কলেজে ভর্তি হলাম ।

প্রথম বর্ষটা বেশ ভালোই গেলো । কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে গিয়েই শুরু হলো সমস্যা । সরকারী দলের স্থানীয় এক নেতার বখাটে ছেলে উপদ্রব করা শুরু করলো । প্রথমে তেমন পাত্তা দেই নাই । কারণ আগেও এমন ছোট খাটো উপদ্রব হয়েছে । কিন্তু এই ছোট শহরে বাবার একটা প্রতিপত্তি ছিলো । তাই কেউ বেশী বাড়তো না । কিন্তু কিছুদিন পরেই বাসার সামনেই যখন মটর সাইকেলের আনাগোনা শুরু হয়ে গেলো তখন বাবাকেও একটু চিন্তিত দেখলাম । দেশে নষ্ট রাজনীতি আগেই শুরু হয়ে গেছে । তার সুবিধাভোগীরা নিজেদের অসীম ক্ষমতার মালিকও মনে করা শুরু করেছে । তাছাড়া তখন হঠাৎ করে এসিড সন্ত্রাসও বেড়ে গিয়েছিলো । তাই চিন্তা করার যথেষ্ট কারণও ছিলো । আমার কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো । বাবা বড় ভাই বোনদের জানালেন সব কিছু । আমি ভাবলাম এবার মনে হয় ঢাকা গিয়েই পড়াশুনা করতে হবে । কিন্তু বড় আপা বাড়ি আসলেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । এমনই প্রস্তাব না বলার কোনো কারণই নাই । কিন্তু ঠিক তখনই এক বিশাল অঘটন ঘটিয়ে ফেললাম । এখন যেটা লিখবো সেটা আসলে আগেই লেখা উচিৎ ছিলো । কিন্তু কিভাবে সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে হয় আমি জানি নাকি । যাই হোক মেট্রিকে রেজাল্ট ভালো না করলেও দাদার ইচ্ছায় ইন্টারমিডিয়েটেও সাইন্স নিতে হলো । প্রথম থেকেই অঙ্ক পড়াবার জন্য একজন মাস্টারও ঠিক করা হলো । মফশ্বলে তখন সাইন্সের তেমন ভালো শিক্ষক পাওয়া যেতো না । অঙ্কেরতো আরো কম । সেই হিসাবে সমস্ত পিরোজপুর শহরে তখন একজন অঙ্কের টিচারের খুব নাম ডাক ছিলো । অথচ সে নিজেও তখন ছাত্র । বি,এস,সি শেষ বর্ষের ছাত্র ।

স্যারকে প্রথম দিন দেখে আমি একটু অবাক হলাম । বড়ো বড়ো ভাসা ভাষা দুই চোখ, এক মাথা কোঁকড়া চুল লম্বা ঢ্যাঙ্গা শরীর । দেখে মনে হয় লোকটা ভুল করে বড় হয়ে গেছে । মানে বড় মানুষের শরীরে একজন বালক । আরো একটা জিনিষ প্রথম দিনেই মনকে কেমন করে দিলো । পড়াবার মাঝেই বাসার ভিতর থেকে চা নাস্তা আসতো । আমার অন্যসব স্যারদের কাছেও আসতো । তখন একটা নিয়ম ছিলো সব নাস্তা খেয়ে না ফেলা । ধরেন পাঁচটা পাইন আপেল বিস্কুট দেওয়া হলো আপনি তিনটা খেয়ে দুইটা পিরিচেই রেখে দেবেন । এটা একটা সাধারন ভদ্রতা ছিলো । কেনো ? তা জানি না । মনে হয় আপনি যে হাভাতে না সেটা প্রমান করার একটা চেষ্টা । জীবনে প্রথম চিকেন প্যাটিস খেতে গিয়ে আমি নিজেই কিছুটা ফেলে এসেছিলাম । এতটাই হেলাভরে যে মনে হবে বাসায় প্রতিদিন সকাল বিকাল চিকেন প্যাটিস খেতে খেতে আমি ক্লান্ত । অথচ আমার লোভী তরুন মন তখন পিরিচে রেখে আসা আর্ধেকটা চিকেন পেটিসের জন্য হা পিত্যেস করে মরে…ধ্যেত কি উল্টা পাল্টা লেখা শুরু করলাম । তো যা বলছিলাম … প্রথমদিন স্যারের জন্য এক পিরিচে পাইন আপেল বিস্কুট আর এক পিরিচে চানাচুর আর এক কাপ চা দিয়ে খোদেজার মা চলে গেলো । স্যার দেখি বড় বড় চোখে আগ্রহ নিয়ে সমস্ত বিস্কুট খেয়ে ফেললেন । তারপর শুরু করলেন চানাচুর খাওয়া । আমার আবার চানাচুরের গুড়া বেশ পছন্দ ছিলো । ঐযে পিরিচের শেষে নোনতা টক যে চানাচুরের গুড়াটুকু থাকে । মেহমান চলে গেলে আমি সব সময় খেতাম । স্যার সেদিন সবটুকু চানাচুর খাবার পরে ঠিক বাচ্চা ছেলের মত জিহ্বা দিয়ে আঙ্গুল ভিজিয়ে চানাচুরের গুড়াটুকুও খেয়ে ফেললেন । দেখে কিযে মায়া লাগলো । এরপরে প্রায়ই খোদেজার মাকে একটু বেশী নাস্তা দিতে বলতাম । মাঝে মাঝেই মায়ের অদ্ভুত দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রান্নাঘরে নুডলস কিংবা সেমাই রান্না করতাম । রান্না করতাম স্যারকে খাওয়াবার জন্য । কিন্তু স্যার এসব কিছুই জানতেন না । উনি মনোযোগ দিয়ে আমাকে পড়াতেন ।