কিন্তু আপা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বাসায় আসার পরেই কেমন যেনো হয়ে গেলাম । দাদাও তখন বাড়িতে । একরাতে দমবন্ধ হয়ে আসছিলো । মায়ের রুমে গিয়ে অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম । সবাই অবাক হয়ে গেলো । মা, বড় আপা অনেক জেরা করার পরে স্যারের নামটা বলেই ফেললাম । বাসায় যেনো বজ্রপাত হলো । স্যারের পারিবারিক অবস্থা কোনোভাবেই আমাদের সাথে যায় না । বড় ঝড়ের আগে যেমন সবকিছু নিথর হয়ে যায় সেরকম নিথর চুপচাপ হয়ে গেলো বাড়িটা । তবে সেটা কিছু সময়ের জন্য । একটু পরেই শুরু হয়ে গেলো কালবৈশাখী । যে বাবাকে আমি কোনোদিন উচ্চস্বরে আমার সাথে একটা কথা বলতে দেখি নাই সেও ভীষণ রেগে গেলো । ‘এতো আদর করে ইতিকে বড় করলাম । অন্য ছেলে মেয়েকে যা দেই নাই দিতে পারি নাই ইতিকে সব দিলাম । আর তার ফল এই । বিয়ে আমার পছন্দেই হবে । না হলে মেয়েকে কাইটা গাঙ্গে ভাসাইয়া দেবো ।‘ বাবা গর্জাতে লাগলেন । ভয়ে আমি আধমরা হয়ে গেলাম । আশ্চর্য তখন মা হয়ে গেলেন আমার সবচাইতে বড় আশ্র্য় । সবার বিরুদ্ধে গিয়ে উনি আমাকে আগলালেন । বললেন ইতির বিয়ে মাস্টারের সাথেই হবে । মাস্টারতো ছেলে ভালো । কপালে সুখ থাকলে ইতি মাস্টারের সাথেই সুখী হবে । মাকে এমন রুপে কেউ কখনো দেখে নাই । বাবা ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন ।

কয়েকদিন পরেই আমার বিয়ে হয়ে গেলো । আমাদের বাসায় যে এত কিছু হচ্ছে স্যার কিন্তু কিছুই জানতেন না । বিয়ের তিনদিন আগে যখন প্রথম শোনেন স্যার ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন । তাদের বাসায় যখন বাবা লোক পাঠায় স্যার নাকি ভয়ে বাড়ির পিছনের পুকুরে ডুব দিয়ে বসেছিলেন । এসবই পরে শোনা ।

বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই চারিদিক থেকে আঘাত আসা শুরু হলো । একটা জিনিষ খেয়াল করলাম সব চাইতে বড় আঘাত করে সব চাইতে কাছের মানুষরা । একদিন চাচী আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন ‘আগে শুনতাম উকিলের ছেলে মেয়েরা মানুষ হয় না । ইতিকে দেইখা বুঝতে পারি মানুষ আসলে ভুল কিছু বলে না ।‘ চাচীকে আমি খুব পছন্দ করতাম । কিযে কষ্ট লাগে । মানুষটাকে রাতে কষ্টের কথা বলতাম । কিন্তু মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া সে আর কিছুই করতো না ।

এসব আঘাতে আমি কেমন শক্ত হয়ে গেলাম । ভাই বোনেরা তখনো মুখ ফিরিয়ে । তবে মা খুব চেষ্টা করেন আমার সংসারে সাহায্য করতে । বুঝতে পারি বাবারও এতে সায় আছে । কিন্তু আমার কেমন জিদ চেপে যায় । প্রথম তিন চারবার কিছু টাকা নিলেও এরপরে মাকে পরিষ্কার না করে দেই । মানুষটা ততদিনে কলেজে চাকরি পেয়ে গেছে । আর টিউশনিতো আগে থেকেই করতো । মফশ্বল শহরে আমাদের তেমন অসুবিধা হয় না । এক বছর পরে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে আমিও একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পাই । দুই বছর পরে বড় খোকা হলো তার পরের বছর মেজো খোকা । সেবছরই বাবা মারা যান । এরপরেই ভাই বোনেরা আবার খুব দেখাশোনা শুরু করলেন ।
কিন্তু সেটা হলো আমার জন্য নতুন অত্যাচার । সবাই কেমন অনুকম্পা, অনুগ্রহ করতো । একটা উদাহরন দেই । হঠাৎ দেখা যাবে ভ্যান ভর্তি বাজার আমার দরজার সামনে । পিছনে তাকিয়ে দেখি দাদা রিক্সা থেকে নামছেন । হেসে বলবেন তোর বাসায় দুইদিন বেড়াতে আসলাম । দুইদিন বেড়াতে এসে কেউ দুইমন চাল, দশ কেজি ডাল, একটা আস্ত খাশি, বিশটা মুরগি কিনে আনে না । আমি লজ্জায় মরে যেতাম । বাকি ভাই বোনেরাও একই কাজ করতো । মাঝে মাঝে ঈদে নগদ টাকা পয়সাও দিতেন । আমি নিষেধ করতাম । কিন্তু আমি সবার অনেক ছোট বলে কেউ গায়ে মাখতেন না ।
আমার ছোট ছেলে যেবছর জন্মালো সেবছরই মা মারা গেলো । মায়ের কারনেই বাকি ভাইবোনেরা খুব ঘন ঘন ঢাকা থেকে পিরোজপুর আসতো । মা মারা যাবার পরে ভাই বোনদের আশা যাওয়া একটু কমে । সত্যি কথা বলতে আমার একটু ভালোই লাগে । মানুষের – এমনকি সে নিজের ভাই বোন হলেও দয়া অনুগ্রহের মাঝে বাস করতে কারোরই ভালো লাগে না ।
কিন্তু দুই বছর পরে যখন ছোট মেয়ে মিলি জন্মালো তখন দাদা, মেঝো ভাই, ছোট ভাই আর সব শেষে বড় আপা আসলেন । সবার চোখে মুখেই দুশ্চিন্তা । সীমিত আয় এর মাঝে চার চারটা ছেলে মেয়ে । আমার অন্য ভাই বোনের কারোরই ছেলে মেয়ে দুইজনের বেশী না । দাদারতো মাত্র এক ছেলে । বড় আপা এক সপ্তাহ থাকার পরে যাবার সময় বলে – শোন মিলিকে আমাকে দিয়ে দে । আমারতো বয়স হয়েছে এই বয়সে একটা ছোট বাচ্চা পালতে খুব খুব ভালো লাগবে । আসলে কি কারনে বলেছেন সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারি ।
রাতে মানুষটাকে বড় আপার কথা বলি । মানুষটা সব সময়ই কম কথা বলে । আমার কথা শুনে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে । এমনিতেই আমার ভাইবোন আসলে মানুষটা কুকড়ে থাকে । আমার ভাইবোনরা ততদিনে কেউ জয়েন্ট সেক্রেটারি কেউ আর্মির কর্নেল, একজন বিরাট ইঞ্জিনিয়ার আর বড় আপা নিজে প্রফেসর আর দুলাভাই বিরাট ডাক্তার । এদের সামনে সামান্য একজন মফশ্বলের কলেজ শিক্ষক কুকড়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক । -মিলিকে কি আমি খাওয়াইতে পরাইতে পারবো না । বলার সময় মানুষটার মায়া মায়া চোখের কোনে কি যেন চিকচিক করে উঠে । কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যায় । আসলেতো মানুষটা বাচ্চা খুব পছন্দ করে । পরের সপ্তাহ থেকেই মানুষটা আরো দুইটা টিউশনি বাড়িয়ে দেয় । সকালে কলেজে বের হয় মাঝখানে দুপুরে ঘণ্টাখানেকের জন্য বাসায় ফেরে । তারপর আবার বেড়িয়ে রাত দশটার দিকে বাসায় ফেরে ।
আমিও শক্তহাতে সংসারের হাল ধরি । যেভাবেই হোক ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে হবে । সব মায়েরা যেমন একটু নরম থাকে আমি থাকি তার পুরো উল্টা । ছেলেমেয়েদের একটু এদিক সেদিক দেখলেই কড়া হাতে শাসন করতে থাকি । কিন্তু এত শাসনেও তেমন লাভ হয় না । বড় খোকা মেট্রিক পরীক্ষায় মাঝারী মানের এক রেজাল্ট করে । একই বছর মেঝো ভাইয়ের ছেলেও পরীক্ষা দেয় । সে আসাধারন রেজাল্ট করে । সেই ছেলে এখন আমেরিকায় বিরাট এক কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার । এর আগে পরেও আমার অন্য ভাইবোনের ছেলে মেয়েরা অসাধারণ সব রেজাল্ট করে । মনে আছে বড় খোকার যেদিন রেজাল্ট দিলো সেদিন বিকেলে হঠাৎ কেমন মাথা খারাপ হয়ে গেলো । হাতের কাছে ছিলো একটা পেয়ারা গাছের লাঠি । অতবড় ছেলেকে এই লাঠি দিয়েই বেদম মার শুরু করলাম । এতদিনের জমানো ক্ষোভ, হতাশা সব লাঠির বাড়ি দিয়েই যেন চুকিয়ে ফেলবো । হতবিহবল বড় খোকা অনেক কষ্টে একসময় কাদতে কাদতে বলে –আমিতো চেষ্টা করেছি মা । সেইরাতে বড় খোকার ভীষণ জ্বর এলো । সারা শরীর লাঠির আঘাতে ফুলে উঠেছে । আর আমি সারারাত জ্বেগে সেই ফুলে ওঠা ক্ষতগুলোতে হাত বুলাতে লাগলাম । হাতে কতটা চোখের জ্বল আর কতটা গরম তেল লেগে ছিলো সেটা এখন আর মনে নাই ।
দাদী আমার পায়েস নিশ্চয় তোমার আদরের বড় নাতি খেয়ে ফেলেছে । ক্লাস সেভেনে পড়া বড় নাতনি দিনা এসে মুখ কালো করে বলে । লেখা ছেড়ে আবার উঠতে হয় । এই নিয়ে সাতবার উঠতে হলো । প্রথমেই বললাম না হাঙ্গামার মাঝে থাকি । ফ্রিজ খুলে দেখি আসলেও দিনার পায়েসের বাটি হাওয়া । এটা নিশ্চয় বড় নাতি শান এর কাজ । আমি অবশ্য জানতাম এরকম হবে । তাই আমার নিজের রুমের ফ্রিজে বড় এক বাটি পায়েস উঠিয়ে রেখেছি । সেখান থেকেই দিনাকে এক বাটি দিলাম । -দাদী তুমি এত ভালো । বলে হাসিমুখে দিনা চলে যায় । আমার পাঁচ নাতি-নাতনিরই আমি খুব প্রিয় । ছেলে মেয়েরা এখনো আমাকে ভীষণ ভয় পায় । কিন্তু নাতি নাতনিরা একেবারে উল্টা । সেদিনও আড়াল থেকে বড় খোকাকে বলতে শুনলাম –দিনা তুই যে মার সাথে এভাবে কথা বলিস তোর ভয় করে না । আমি মনে মনে হাসি । ঐযে আর এক নাতি শিহাব চিৎকার করছে । সামনের দরজায় নাকি কে আসছে । নাহ এবার এসেই লেখাটা শেষ করে ফেলবো …
মাজেদ এসেছিলো । মাজেদ মাছের কারবারি । বাসায় দাদা আর বড় আপা আসছেন । বড়ভাবী আর দুলাভাই মারা গেছেন । কোরবানির ঈদ আরো দুই সপ্তাহ পরে । আগে ঈদের তিন চারদিন আগে ভাই বোনেরা আসতেন । আজকাল অনেক আগেই আশা শুরু করেছেন । হয়তো দেখা যাবে কাল সকালেই মেজো ভাই-ভাবী, ছোট ভাই-ভাবীও এসে হাজির হয়েছেন । নিজের তিন ছেলে ছেলেদের বউ নাতি-নাতনি আর মেয়ে আরো কয়েকজন পুষ্যি নিয়ে আমার হুলস্থূল সংসার । প্রতি বেলায় খাবার দিতে হয় প্রায় জনাকুড়ি মানুষকে । আমার ভাই বোনেরা আজকাল সুযোগ পেলেই আমার এখানে চলে আসে । মাজেদকে তাই খবর দিয়েছিলাম । বললাম আগামী কয়েকদিন বাজারের সব চাইতে ভালো মাছগুলো বাসায় পাঠাইয়া দিতে ।
আমার ভাইবোনেরা সবাই অবসরপ্রাপ্ত এখন । আমি নিজেও স্কুলের চাকুরী ছেড়েছি ছয় বছর আগে । কিন্তু অবসর … এখনো ফজরের নামাজের সময় ঘুম থেকে উঠি আর ঘুমাতে যাই রাত দশটার পরে । তবে অন্য ভাইবোনদের মত ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেশার, কিডনির সমস্যা, আর্থারাইটিস কিছুই নাই আমার । আমার মানুষটাও সারাদিন ছোট ছেলের ব্যবসা নাহয় কোনো নাতিকে পড়ানো এসব নিয়ে মহাব্যস্ত । আল্লাহর রহমতে তারও কোনো রোগ বালাই নাই । ভাই বোনের ছেলে মেয়েরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং একজন ছাড়া সবাই দেশের বাইরে । ছোট ভাইয়ের যে ছেলে দেশে আছে সেও একরকম বিদেশেই আছে । এতই ব্যস্ত যে বাবা মায়ের সাথে দেখা হয় বছরে এক দুই দিন। তাই সবাই এখানে এসে খুব আনন্দে থাকে । কপালটা ভালো বাড়ীটা আমি অনেক বড় করে বানিয়েছিলাম । তিনতলা বাড়িতে জায়গার অভাব নাই । দাদা আবার ডাকছে …নাহ লেখাটা দেখি শেষ করতেই পারছি না ।
দাদা আজকাল অনেক অদ্ভুত কথা বলে । এখনই ডেকে কথায় কথায় বললো –মহানগরী কখনো মহান নগরী হয় নারে । সবাই আর একটু ভালো থাকার জন্য ছুটতে থাকে । ছুটতে ছুটতে কখন যে আপনজন থেকেই যোজন দূরে চলে যায় নিজেই জানে না । ছেলেকে অসুখের কথা বলেছিলাম । ছেলে এইমাত্র মেসেজ করেছে কত টাকা পাঠাইছে সেই খবর দিতে । যে খবরই দেই পরেরদিন টাকা পাঠায় । এই বয়সে টাকা কি আমি চাবাইয়া চাবাইয়া খাবো । আমার দরকার মানুষ । নিজের মানুষ । বড় আপা, মেজো সবারই একই অবস্থা । তোর এখানে আসলে খুব ভালো লাগেরে । একসময় তোকে নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তা করতাম । এখন তোর এই ঘরভরা সুখ দেখতে খুব ভালো লাগেরে ।
যাক আসলে যেজন্য এত কিছু লিখলাম সেটা তাড়াতাড়ি লিখি । ছোট মেয়ে খবর নিয়ে এসেছে কোন প্রতিষ্ঠান নাকি রত্নগর্ভা পুরষ্কার দেবে । পুরষ্কারের পরিমাণটা নাকি বেশ বড় এবং সেটা মরণোত্তরও হতে পারে । তবে একটা জীবনীর মত লিখতে হবে । তাই আমার মায়ের কথা লিখতে বলেছে । কিন্তু মাকে আমি কতটুকুই বা জানি । তার চাইতেও বড় কথা আমি আসলে নিজেকেই রত্নগর্ভা মনে করি । বড় খোকা বাবার মত উকিল মেঝ খোকা তার বাবার মত এখানেরই কলেজের শিক্ষক । ছোটটা লঞ্চের ব্যবসা করছে আর মেয়ে হাইস্কুলের শিক্ষক । আমার কোনো ছেলে মেয়েই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা জজ ব্যারিস্টার না । কিন্তু আমার সব ছেলেমেয়েই সৎ আর সুখী । আর কেউ যদি চার চারজন সৎ সুখী ছেলেমেয়ের মাকে রত্নগর্ভা না বলে তাতে আমার কিছু আসে যায় না । আমি নিজেকে সব সময়ই তাই মনে করি…করবো । -দাদী লিপি আসছে …নাতনি দিনা চিৎকার করছে । আর লেখা সম্ভব না । পিঠার জন্য চাল গুড়ি করতে হবে ……