ঘুমের কথা শুনলেই , কেমন অলসতার কথা মাথায় আসে । যারা বেশি ঘুমোন, তারাই কি কেবল অলস? কাজে অনিচ্ছুক বা বিলম্বিত দের কেই অলস বলা হয়। অলসতার মানে কেবল বেশি ঘুমোনো নয়। ঘুম বিষয় নিয়ে একবার একটা লেখা দিয়েছিলাম এক বন্ধুকে,(সম্ভবত পদ্যগোছের কিছু ছিল) । ভীষণ রুষ্ট হয় সে। ঘুম একটা বিষয়?!!! “ঘুমের কলকব্জা” নামে একটা প্রবন্ধ( অভিসন্দর্ভধর্মী) পড়েছিলাম মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা “একটুখানি বিজ্ঞান” বইয়ে। তখন তরুণ ছিলাম , জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতাম। কত জাত-বেজাতের বই যে পড়তাম! ঘুম বিষয়ে নিশ্চয়ই কিছু ভালো বই আছে । যাদের আগ্রহ আছে, গুগল অথবা পিপীলিকা বা যা হোক একটা কোন মাধ্যমে জেনে নেবেন। যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তারা জানেন যে , ঘুম কতটা উপকারি। ঘুম সম্পর্কে আমার অজ্ঞতাকেই আমি তুলে ধরবো।

একটা সময় দিনের আলো আর রাতের আলোর ব্যবধান ছিল। আজও‌‌ আছে। তবে ফ্লুরোসেন্ট বাতি আর LED সহ অপরাপর প্রযুক্তির বদৌলতে এখন রাতটাই হয়ে উঠেছে আলো ঝলমলে আকর্ষণীয়। রাতে এখন প্রায় সবই করা চলে যা দিনে করা যায়। এমনকি উদ্ভিদকে কৃত্রিম আলো দিয়ে দিনের আবহও দেয়া যায় রাতে। তারপরও যা করা যায় নি তা হচ্ছে ক্রোমোসোমের জিনের বৈশিষ্ট্য ভাঙা আর সত্যিই সূর্যের বিকল্প গড়ে তোলা! গবেষকেরা জানান , আমাদের ঘুমের প্রকৃষ্ট সময় ধরা হয় রাত দশটা থেকে ভোর চারটা! বলা বাহুল্য কেবল আমিই নয় শতকরা নব্বই ভাগ লোক এ প্রকৃষ্ট সময়ের পুরোটা ঘুমোন না। এমনকি যারা গবেষক তারাও এর যথাযথ ব্যবহার করেন কিনা সন্দেহ আছে। আগে মোম বা তৈল যে প্রদীপেই হোক লোকে রাতে বেশি কাজ করতো না। কেবল কিছু শৌখিন লোক করতো শখের চর্চা । তাদের মাঝে দার্শনিকের দর্শন চর্চা থেকে শুরু করে শখের জামা সেলাই ও ছিল। কাব্যচর্চা আবৃত্তি ও তার উপস্থাপন , নাট্যপ্রদর্শন ও যে রাতে হতো এমন নজিরও মেলে । কিন্তু বিজ্ঞান ও তাল রেখে প্রযুক্তির বৈপ্লবিক অগ্রযাত্রার সাথে সাথে রাতের বহুবিধ ব্যবহার বেড়ে গেল। আর শুরু হ’ল গণহারে রাত জাগা। আগে রাতে যে জায়গা জেগে উঠতো আর যারা জেগে উঠতেন তাদের সমাদর থাকলেও সম্মান কী ছিল তা নিয়ে আমি অজ্ঞতাকেই অগ্রবিবেচ্য মনে করি। তবে হ্যাঁ প্রমোদপল্লী বা প্রমোদবালা আর তাদের সেবাভোগী ছাড়া কিছু তস্কর ও লুটেরারা রাতের আঁধার কে পুঁজি করে পুঁজি গড়তেন।

আজকাল কেবল যে, প্রমোদপল্লী বা “আগার তাহার বিভীষিকাভরা জীবন মরণময় সমাজের বুকে অভিশাপ সে যে …..” এই কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র বা শিরোনামদের আবাসস্থলগুলো নিশীথে জমে ওঠে তা ই নয়। জমে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও। চর্যাগীতিকাতেও রাত বিরাতের কর্মকাণ্ড পাই। কিন্তু কিছু সাধকের সাধনাও হয় রাতে। সে সাধনা কেবল ধর্মের নয় জ্ঞান বা প্রেমেরও হতে পারে।

তা যাই হোক আপনার ঘুম কেমন হবে তা নির্ভর করবে আপনার পরিশ্রমের উপর। আপনি কায়িক শ্রম করলে নিদ্রা গভীর হবে। আবার মগজের উপর চাপ পড়ে এমন কাজেও নিদ্রা ভালো হয়। আবার বয়স আকার ভর এসব ও নিদ্রার সময় গভীরতা নিয়ন্ত্রণ করে। আপনার ঘুমের চাহিদা ঠিক কত ঘন্টা তা আপনার কাজ, বয়স , ভর , কাজের সময় ও ধরণের উপর নির্ভর করবে। তবে গড়ে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চব্বিশঘন্টায় ছয়ঘন্টা ঘুম দরকার। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে কেননা গড় তো গড়ই।

কম ঘুমোলে দেহের সব তন্ত্রেরই সমস্যা হয়। তবে সেটা কিছুটা সময় নিয়ে আর সংকট তৈরি করে হলেও দেহ সামলাতে পারে। কেবল মস্তিষ্ক পড়ে বিপাকে। সচল মস্তিষ্ক চিন্তা করতে পারে। কিন্তু কম ঘুমোলে মস্তিষ্ক মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। মনোযোগ না থাকলে যা হয় , অন্যের কথা চিন্তাকে মনোযোগের সাথে গ্রহণ করা যায় না!আমার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল সারারাত জেগে বই পড়তো, সে কম ঘুমিয়ে বই পড়ে পাশাপাশি লেখাপড়া যথানিয়মে চালিয়ে নিতো। কিন্তু কাল বড় নির্মম । সে অনেক বইই পড়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ঐ পড়ামাত্রই। তার কতটুকু যে মাথায় রেখেছে আর তা থেকে কী লাভ করেছে তা আমার জানা নেই। অথচ প্রায় সমপরিমাণ বই পড়েও যারা ঘুমের ক্ষেত্রে আপস করে নি, তারা তা দিব্যি ধরে রেখেছে। মস্তিষ্কের তথ্যের পুনর্বিন্যাস , যাচাই বাছাই , সংরক্ষণের প্রক্রিয়ার কাজ চলে ঘুমের সময়। যেসব লোক নিয়মিত পরিমিত ঘুমোন তারা খুব সহজেই কোন কিছু বুঝতে আর ভাবতে পারেন। তাদের মগজের দক্ষতা বাড়ে।

ধারণা করা হয় , পৃথিবীতে এ যাবৎকালে মগজ ব্যবহারে দক্ষ ব্যক্তিদের একজন হলেন এলবার্ট আইনস্টাইন। ইনি ঘুমের ব্যাপারে পরিমিত ও নিয়মিত ছিলেন। তবে এলবার্ট আইনস্টাইন বলতেন যে, রাতে দশঘন্টা না ঘুমালে তার মগজ ঠিকমত কাজ করতো না।

ঘুম বেশি হলেও ক্ষতিকর। প্রচলিত একটা ধারণা বেশি ঘুমোলে মোটা হয়, তা পুরোপুরি ঠিক নয়। বরং ঘুমের অনিয়মের কারণে শারীরিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়। ঘুমকে তাচ্ছিল্য করার বা উপেক্ষা করার কিছু নেই । বরং যত্ন নিয়ে আয়োজন করে ঘুমোন আর সময়মতো উঠুন। ঘুমোনোর আগেই ওঠার সময় নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। যতটুকু দরকার ঘুমোবেন। অনিদ্রা বা ঘুম নিয়ে সমস্যা থাকলে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে নেবেন প্রতিকারে তৎপর হোন। অন্যথায় কর্মতৎপরতা ভয়াবহ হ্রাস পাবে।

আজকালকার অন্যতম রোগ হৃদরোগ,উচ্চরক্তচাপ, স্নায়বিক দুর্বলতা, মানসিক রোগ,উত্তেজনা, উদ্বিঘ্নতা, স্নায়ুবৈকল্য,স্থূলতা, প্রভৃতির কারণ হিশেবে ঘুমের অনিয়ম ভীষণভাবে দায়ী। সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনে পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

 

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়