বইয়ের নাম: দ্য কম্পানি অফ ওম্যান
লেখকের নাম: খুশবন্ত সিং
অনুবাদক: আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশক: রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল
প্রকাশনী: নালন্দা ৩৮/৪ বাংলাবাজার ‌‌‌‌‌‌ মান্নান মার্কেট (৩য় তলা), ঢাকা
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৭

খুশবন্ত সিং উপমহাদেশের জনপ্রিয় লেখকদের একজন। অজ্ঞেয়বাদী খুশবন্ত সিং এর শেষ বয়সের দিকে লেখা উপন্যাস দ্যা কম্পানি অফ ওম্যান। বইটিকে বাংলায় চমৎকারভাবে অনুবাদ করে আমাদের পড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু।

এই উপন্যাসের ধরণ কিছুটা জীবনীর মত। উত্তমপুরুষে লেখা উপন্যাসটিকে একটি কল্পিত জীবনী বলা যায়। সেই অর্থে আত্মজীবনীও বলা যেতে পারে তবে কল্পিত চরিত্রের। প্রধান এই চরিত্রের নাম মোহনকুমার।

মোহনকুমারের জীবনের সাথে মিশে গেছে সমাজ ও পরিপার্শ্ব। লেখকের কৃতিত্ব এখানেই যে এক এক করে বিভিন্ন শাস্ত্রের নাম ধরে ধরে বলা যায় যে সংশ্লিষ্টতা আছে। যেমন অর্থনীতি, অর্থায়ন, বাণিজ্য, সমাজ, রাজনীতি,ধর্ম, ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান,প্রভৃতি।

একটা ভালো সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, তাতে সমাজ সময়ের প্রতিনিধিত্ব থাকে। স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে শিল্পায়নের বিকাশ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও উচ্চবিত্ত উদ্যোক্তা তৈরির দিকটিতে মূল দৃষ্টি থাকলেও আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের জীবনের সম্পর্কে ধারণা পাই।

আশা যাক কাহিনির দিকে, মোহনকুমার শৈশবে মাকে হারান। কোন ভাইবোন ছিল না তার। একমাত্র পিতার সান্নিধ্যে কেটে যায় তার শৈশব কৈশোর । ছাত্রজীবন ছিল উজ্জ্বল। সম্ভবত পারিবারিক জীবন না থাকায় জীবনের বিভিন্ন দিকে না তাকিয়ে মোহন সবচেয়ে বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে পারতেন পাঠের দিকে। আরেকটা বিষয় শৈশবে গৃহকর্মীর স্তন চোষা তার মাঝে কি এক ধরনের নারী সম্ভোগের তাড়না তৈরি করে? বা নারী সম্পর্কে একটা ধারণা অবচেতনে গঠিত হয়েছে কি সেখানেই?

মোহনকুমার পূর্ণবৃত্তি নিয়ে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। আর সেখানেই শুরু হয় তার যৌনজীবন। জেসিকা নামের কৃষ্ণাঙ্গী মহিলার সঙ্গে শুরু হওয়া সম্ভোগ শেষ হয় শেষ বয়সে নাম না জানা এক শৌখিন সৌন্দর্যপসারিণীর শয্যাসঙ্গী হওয়ার মাধ্যমে। এর মাঝে মোহনকুমারের বিয়ে হয়। তার স্ত্রী সনুকে ভারতীয় প্রচলিত সৌন্দর্যকাঠামো ও সাধারণত ভারতীয় পুরুষের কাম্য নারীর বৈশিষ্ট্য বিচারে উল্লেখিত নারীদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও যৌনাবেদনময়ী নারী বলে মনে হয়। অথচ এই যৌনাবেদনময়ী, সুন্দরী,সুশিক্ষিতা,সম্ভ্রান্ত,সতী নারী মোহনকুমারকে যৌনসুখ দিতে ব্যর্থ হন। এর দ্বারা সৌন্দর্য ও যৌনতা সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্তিকে চোখে আঙুল দিয়ে তুলে ধরেন লেখক। যৌনসুখের জন্য সৌন্দর্যের চেয়ে সমঝোতাটাই মুখ্য। সঙ্গীর সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়া যৌনজীবনে তৃপ্তি আসে না এ কথা ফুটে উঠেছে বিভিন্ন নারী সঙ্গমের দৃশ্যের ভেতর দিয়ে।

বাদ যায়নি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকভারত দ্বৈরথের কথা, উঠে এসেছে হিন্দু মুসলিম , মুসলিম ইহুদি , হিন্দু বৌদ্ধ ও পৌত্তলিক একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর ভেতরের দ্বন্দ্বের দিকটি। ইয়াসমিনের সঙ্গে মোহনকুমারের সঙ্গম কষ্ট দিতে পারে কোটি কোটি মুসলিম পাঠককে। তবে এ সত্য অনস্বীকার্য ইসলাম ধর্মের ছদ্মবেশের আড়ালে অনৈতিক নিষিদ্ধ কাজের চর্চা যে একেবারে হয় না তা নয়। বরং এসবই সালামের ইসলাম বা শান্তি নষ্ট করে। ধর্মের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি শ্রেণীগত পার্থক্যের দৃষ্টান্ত হিশেবে ধান্নো,সরোজিনী চরিত্রের উল্লেখ করা যায়। একজন হতদরিদ্র অন্যজন বিশুদ্ধ মধ্যবিত্ত।

মোহনকুমারের পিতার চরিত্রটি লক্ষণীয়। তিনি নিজে মধ্যবিত্ত। অসম্ভব তার আত্মসম্মানবোধ। পুত্র শিক্ষামন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে বা মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হয়েছে। কিন্তু তার পেশাজীবন তখন শেষ, তিনি নতুন জীবনে মানিয়ে নিয়েছিলেন দারুণভাবে। কিন্তু বাড়িতে একজন অকর্মণ্য বৃদ্ধকে সনু সুনজরে দেখে নি। মোহনের পিতা জীবনযুদ্ধে কেবল জয়ীই হননি, পুত্রের গর্বে তিনি অসম্ভব গর্বিত। কী এক অদ্ভুত ভালোবাসার দৃশ্য দেখি মোহনের দেশে ফেরার পর আর হরিদ্বারযাত্রা থেকে শুরু করে ফেরার সময়ের একান্তে কাটানো সময়ে। জগতে পিতা-পুত্রের বন্ধনের কি তুলনা হতে পারে? গঙ্গাস্নানে একত্রে দু’জনে শুদ্ধ হলেন সব পাপ থেকে । সময়টাতে দু’জনেরই সুসময় এবং বলতে গেলে তাদের আপন বলতে আর কেউ নেই। সফল গর্বিত ও নিঃসঙ্গ দু’জন পিতাপুত্রের বাৎসল্য রস আমাদের মনে সুখ দেয়। ঠিক যেন হরিদ্বারের গঙ্গার জলে ভাসতে থাকা অগণিত প্রদীপ পাঠকের চোখে ভেসে ওঠে সেই সুখে । বস্তুত জীবনে মোহনের পিতার ছিল দুটো গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুত্র আর ধর্ম। কিন্তু শেষকালে পুত্রকে ছেড়ে ধর্মকে আঁকড়ে ধরতে হলো তাকে। একাকী মরে পড়ে থাকতে হলো হরিদ্বারের ভাড়া করা এক কক্ষে। পাঠের এ পর্যায়ে আমরা খুব কষ্ট পাই । মোহনকুমারের জন্য এর চেয়ে বেদনার কী হতে পারতো আর?

অবশ্য দায় কিন্তু তার পিতারই। তার পিতা অর্থলোলুপতার দরুন উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে ছেলেকে বিয়ে দেন। তিনি চাইলেই আর্থিকভাবে সমমানের অথবা অভাবী পরিবার থেকে পুত্রবধূ নির্বাচন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার মেধাবীপুত্রের কৃতিত্বের সাপেক্ষে অর্থমূল্যে বিচার করে পুত্রবধূ নির্বাচন করেন। এটি তাকে পরে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। সনু তাদের পরিবারে তাকে গলগ্রহ মনে করতে শুরু করেছে এই বোধ তাকে শেষ বয়সে এক মাত্র পুত্রের কাছ থেকে দূরে যেতে উৎসাহ জোগায়। সেখানে বিচ্ছেদ কেবল পিতা পুত্রের নয়, বিচ্ছেদ ঘটে পিতামহ ও পৌত্রেরও । এই বিচ্ছেদ চালিত করে পরবর্তীতে মোহন-সনুর বিচ্ছেদের দিকে।

মোহনকুমারের দেশে ফিরে আসা আর পাঠে অনাগ্রহের কারণ কী? আসলে এই উপমহাদেশের মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্ব । আবার ফাই বেটা কাপ্পা হয়েও শিক্ষকতার পরিবর্তে ব্যবসা বেছে নেয়ার কারণ হতে পারে জীবনবোধ বা জীবনদৃষ্টিই। এদিকে লক্ষণীয় বিষয় মোহনের বাবার সঙ্গে মোহনের দূরত্ব । সে দূরত্ব কেবল বয়সের নয় মানসিকতারও। মোহনকুমার কিন্তু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি পড়েও কুসংস্কারে আটকে থাকা একজন মানুষ। তা সত্ত্বেও তার বাবার তুলনায় সে কয়েকগুণ আধুনিক।

সংসারজীবন বিষয়ে মোহনকুমারের অনভ্যস্ততার একটি কারণ হতে পারে অকালে মাতৃবিয়োগ আর যৌনকর্মে বহুগামীতায় অভ্যস্ততা। মোহন পিতার আদরে বেড়ে ওঠা কৃতী শিক্ষার্থী। অন্যের খবরদারি সইতে সে অপারগ। তদুপরি বিদেশে থাকলেও পিতৃতান্ত্রিকতা বা ভারতীয় সংস্কার থেকে সে মুক্ত নয়। অন্যদিকে সনুও আদরে বেড়ে ওঠায় কথা শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না।

সনুর দিকটাই দেখুন । সে কী আদৌ কিছু লাভ করলো কি? ভারথেকে। নারী হিশেবে স্বামীর অখণ্ড মনোযোগ ও বিশ্বস্ততা তার কাম্য ছিল। স্বামী তার রূপে মাতাল না হয়ে মদে আসক্ত । কিন্তু মোহনের সরল স্বীকারোক্তিতে সে জেনে যায় মোহনকুমারের ইতোপূর্বে একাধিক শয্যাসঙ্গী ছিল। এই অস্বস্তিই মোহন আর তার মাঝে একটা বিকর্ষণ তৈরি করে।

মোহনকুমারের বর্ণাঢ্য যৌনজীবনের বর্ণনার পাশাপাশি জীবনাভিজ্ঞতার সুস্পষ্ট বয়ানে সমৃদ্ধ এ উপন্যাসটি কেবল সুখপাঠ্যই নয়, এটি শিল্পসম্মতও বটে। এর কাহিনিবিন্যাস বা বর্ণনাভঙ্গিতে কেবল বাহুল্যই বর্জিত হয়নি। বরং পরিপাট্য ও সুসামঞ্জস্য শেষাবধি পাঠককে ধরে রাখে। সামাজিক অসারতা ও সমাজ হতে প্রায়-বিচ্যূত মানুষের অসহায়ত্ব যুগপৎ ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে। শেষ কথা, আর্থিক প্রাচুর্য ও অবাধ যৌনাচার বা বহুগামিতার যৌনবৈচিত্র্যই যে মানুষকে সুখী করে তা নয়। জীবন অনেক বড়। মানুষ অসহায়। বেঁচে থাকতে কেবল ক্ষুণ্নিবৃত্তি আর যৌনাকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নই যথেষ্ট নয় বরং অন্য কোন প্রেরণা চাই সেটাই হয়তো তুলে ধরেছেন লেখক। তবে এত কিছুর পরই বইটি কেবল সঙ্গমসমাহার হিশেবে সমাদৃত হতে পারে সে আশঙ্কা থেকে যায়। তবু লেখকের কৃতিত্ব ম্লান হয় না। একটা অতিরঞ্জন কে অনুবাদক কমিক হিসেবে নিলেও তাও অর্থপূর্ণ কেননা ভারতে অর্থ ও লিঙ্গদৈর্ঘ্যকেই পুরুষের পৌরুষের প্রতীক ধরা হয়। লেখক এই ধারণাকে ব্যঙ্গ করেছেন, করেছেন মর্মমূলে কুঠারাঘাত।

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়