বইয়ের নাম: একলব্য
ধরন: কথাসাহিত্য (উপন্যাস)
লেখক: হরিশঙ্কর জলদাস
প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ
প্রকাশকাল:ফেব্রুয়ারি ২০১৬
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ

একলব্য মহাকাব্য মহাভারতের প্রায় উপেক্ষিত একটি চরিত্র। বহুলোকের শ্রদ্ধাভাজন এ চরিত্রটি যখন শিরোনামে, আশা করেছিলাম মূলত একলব্য কে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হবে। কিন্তু মূলত মহাভারতের পুনর্পাঠ, যা একলব্যের প্রতি সুদৃষ্টি, সহানুভূতি ও খানিকটা পক্ষপাত নিয়ে করা হয়েছে এ উপন্যাসে। মূল মহাভারতের কাহিনিকে অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে এ কথা জোর দিয়ে নিশ্চিত করা দুরুহ, কেননা জাত মহাকাব্যের কাহিনি বহুলেখকের হাতে বহুভাবে বদলেছে, বদলাবে এই স্বাভাবিক, এমনকি একে আদি ও আসল মহাভারতে অনুমোদিত করা হয়েছে এই পরিবর্তনকে, জানানো হয়েছে যে, বহুকবির হাতে এটি বহুবার বহুভাবে পরিবেশিত হবে। একলব্য উপন্যাসে কবিতার সৌন্দর্য উপমায়ন থাকলেও কাব্যের কার্পণ্য বা দৈন্য নেই। ভেবেছিলাম এ কেবল একলব্যের জীবনকাহিনির আবেগপূর্ণ উপস্থাপন। অন্তত প্রচ্ছদ দেখে ভেবেছিলাম হয়তো দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধঙ্গুলি বিসর্জনেই শেষ হবে একলব্যের সাধনার আর সেখানেই সমাপ্ত হবে উপন্যাসটি। কিন্তু জলদাস বর্ণবৈষম্যকেই তার মূল উপজীব্য করে তুলেছেন এ উপন্যাসে , স্বভাবতই স্বজাত্যবোধে দৃপ্ত এ উপন্যাসে তাঁর পক্ষপাত নিষাদ একলব্য ও সুতপূত্র কর্ণের প্রতি। আমি নাম থেকে ঘুণাক্ষরেও আশা করিনি যে কর্ণকে এ উপন্যাসে পেয়ে যাবো।

হিরণ্যধনুপুত্র যুবরাজ একলব্য কে নিয়ে কাহিনির সূত্রপাত। অনোমদর্শীপুত্র নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর একমাত্র পুত্র যুবরাজ একলব্যের ধনুর্বিদ্যায় উচ্চতর প্রশিক্ষণলাভের বাসনাতেই সূচণা। এরপর তার গুরু দ্রোণাচার্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা। অনোমদর্শীর অনুপ্রেরণা ও অনুমোদনেই নিতান্ত অনিচ্ছায় প্রাণপ্রিয় পুত্রকে একা অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেন হিরণ্যধনু।

এরপর শুরু হ’ল দ্রোণাচার্যের আখ্যান , জন্ম থেকে আচার্য দ্রোণ হয়ে ওঠা এবং সতীর্থ অগ্নিবেশ্য’র শিষ্য দ্রুপদের কাছে প্রতারিত হওয়া। কুুরুরাজ্যে অস্ত্রগুরু হিশেবে প্রতিষ্ঠালাভ।

তারপর এলো শ্রেষ্ঠ শিষ্য হিশেবে অর্জুনকে প্রশ্রয়প্রদান ও প্রস্তুত করে তোলার ঘটনা। এর ঠিক পরপরই চলে এল মহাভারতের সবচে’ ভাগ্যবিড়ম্বিত ও পাঠকপ্রিয় চরিত্রসূর্যপুত্র কর্ণ । নাটকীয়তার ছোঁয়া আছে এ উপন্যাসে। কর্ণের আবির্ভাবকে climax begining হিশেবে ধরা যায়, চূড়ান্ত মুহূর্তের চূড়ারম্ভ ধরলে কুরুক্ষেত্রে রথের চাকা তোলার সময় অসহায় আত্মত্যাগে গিয়ে গ্রন্থিমোচন বলে ধরে নেয়া যায়। এরপর কেবল বর্ণভেদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ন’আঙুলে একলব্যের হারনা-মানা সংগ্রাম। আজও তো সে লড়াই চলছেই।

একলব্য না কর্ণ নায়ক কে এ দ্বন্দ্ব আসে ? নায়ক শ্রেণিভেদ বা বর্ণবৈষম্য । আর এই বর্ণবৈষম্যকে বৈধতা বা প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়েই যে উদ্ভব ভারতের গৌরব দু দুটো ঈর্ষণীয় মহাকাব্যের তা ফুটে উঠেছে সুনিপুণভাবে। জলদাসদের জীবনসংগ্রাম বা আজও চলতে থাকা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে যেন লেখক নিজেই দাঁড়িয়ে যান একলব্যের মতো নিষ্ঠায়। দ্রোণাচার্যের শিষ্যত্বের প্রতি কী প্রেম একলব্যের, গুরুর মৃত্যু নিশ্চিত তাঁর জীবনভর সাধনার শ্রেষ্ঠধন অর্জুন-যুধিষ্ঠির-ভীম যখন বৈরি , গুরুপ্রেমি একান্ত ভক্ত একলব্য তাঁর শেষচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গুরুকে বাঁচানোর। যার মূর্তিকে গদাঘাতে বিচূর্ণ করলেন ঘৃণায় তাঁকে বাঁচাতে এ কী প্রাণান্ত প্রয়াস! কী গুরুভক্তি ! অথচ যার জন্য দ্রোণাচার্যের এত উদ্যোগ আয়োজন , সেই পুত্রাধিকপ্রিয় অর্জুন কী নিষ্ঠুর!

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিরুদ্ধে একলব্যের উক্তি নির্মাণে কোন ছাড় দেন নি হরিশঙ্কর জলদাস। যেন হরির বিরুদ্ধে হরি! হর বা দেবাদিদেব শিবকেও এ উপন্যাসে আমরা পাই না! ব্রহ্মাও প্রায় নেই বললেই চলে , পালনকর্তা বিষ্ণুকেও রক্ষণের নামে অরক্ষণ বা ধ্বংসের দায় দিতে হরিশঙ্কর নির্ভীক।

কর্ণ ও একলব্যের কিছু উক্তি উদ্ধৃতি এত চমৎকার ও মূল্যবান যে তা দিব্যি বাঁধিয়ে রাখা যায়। এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করার মত এ উপন্যাসে যেমন আছে কুরুক্ষেত্রের উত্তাপ তেমনি আছে পর্ণকুটীরে একাকী রাজপুত্রের গুরুভক্তিতে অসহায়ভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি বিসর্জনের মর্মন্তুদ কাহিনি ও করুণ রস।

কোন প্রচলিত কিছুকে ভিন্নভাবে দেখার দুঃসাহস ও মানবধর্ম সবার ঊর্ধ্বে এ বাণীর উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত প্রদর্শনের জন্যে এর ঔপন্যাসিককে কৃতিত্ব দিতে হয় , কাহিনিবিন্যাস ও উপস্থাপনশৈলির প্রশংসা না করলে হবে ভীষণ অন্যায়।

সুপাঠ্য এ উপন্যাসের জন্য হরিশঙ্কর জলদাসের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অশেষ শুভকামনা।

মুবাশশির আলম
বাংলা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়